আত্মিক শুদ্ধতায় রমজান

Print Friendly, PDF & Email

যুবায়ের আহমাদ : প্রতীক্ষার অবসান ঘটলো। আনন্দের প্রতীক হয়ে উদিত হলো এক ফালি চাঁদ। বছর ঘুরে আবারো আমাদের মাঝে সমহিমায় হাজির হলো অবারিত রহমতের মাস রমজান। রমজান কুরআনের মাস। এরশাদ হয়েছে, ”রমযান তো সে মাস যাতে এ কুরআন নাজিল করা হয়েছে। আর এ কুরআন হচ্ছে মানব জাতির জন্য পথের দিশা। মানুষের জন্য (হক বাতিলের) পার্থক্যকারী।”(সুরা-বাকারা-১৮৫)

কুরআন নাজিলের মাসেই আমাদেরকে পালন করতে হয় রোজা। কেন? আল কুরআন ও রমযানের মধ্যে রয়েছে এক সূগভীর সম্পর্ক। রোজা লক্ষ্যই হলো মানুষের মধ্যে তাকওয়ার গুণ সৃষ্টি করা আর আল কুরআন এ ধরণের তাকওয়ার গুণ ও বৈশিষ্ট্যের অধিকারী লোকদের অন্ধকারে নিশ্চিন্তে পথ চলার শক্তি ও আলো যোগায়। আরো সহজে বুঝার জন্য এভাবে বলতে পারি যে, আল-কুরআন তাত্বিক এক জ্ঞানের নাম এবং সিয়াম বাস্তব এক ট্রেনিংয়ের নাম । কুরআন হলো আইন আর রমজান সেই আইন ব্যক্তিজীবনে বাস্তবায়নের প্রশিক্ষণ কেন্দ্র।

উদাহরণস্বরূপ বলা যায় যে, আল কুরআনের কাজ হলো প্রাথমিকভাবে সৈন্যবাহিনীতে লোক নিয়োগ দিয়ে রমযানের হাতে ছেড়ে দেয়া এবং রমজানের রোজা একে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে খাঁটি সোনা তথা দক্ষ সৈনিকে রূপান্তর করে আবার কুরআনের হাতে সোপর্দ করবে। এবার আল কুরআন তাকে সামনে পথ চলার কর্মসূচী বাতলে দেবে। আল্লাহ তা’আলা বলেন :“ আলিফ-লাম-মিম। (এই নাও) সেই কিতাব (আল-কুরআন) তাতে সন্দেহের কোন অবকাশ নাই, ইহা তাকওয়াধারী লোকদের পথ দেখাবে।” সুরা বাকারা-১-২।

তাকওয়া তো মানুষের মনে আল্লাহর ভয়ে হালাল-হারামের বিধানের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভীতি, যা মানুষের আচার-আচরণ নিয়ন্ত্রণ করে। যেমন:-কোনো মরুভুমি অথবা জনমানবহীন এলাকা যেখানে সন্ধা নেমে এলে বিপদের সম্ভবনা। কোনো ব্যক্তি তা জানার পর সে আপ্রাণ চেষ্টা করে সন্ধা নেমে আসার আগেই এলাকাটি দ্রুত অতিক্রম করার। এখানে তাকে একটি ভয় তাড়া করে এ মরুভুমিতে তার দেরি করাকে নিয়ন্ত্রণ করেছে। তাকে খুব দ্রুত এলাকা ত্যাগ করার জন্য সাহায্য করেছে। ভয়টি হলো:জীবন বা সর্বস্ব হারাবার। এমনি ভাবে জীবনের প্রতিটি কাজ সম্পাদনের সময় যদি আল্লাহর ভয় আমাদেরকে তাড়া করে এবং সেই তাড়না ভাল মন্দ বাছাই করে চলতে বাধ্য করে, সেটিই হবে তাকওয়া। যিনি তাকওয়ার পথ অবলম্বন করেন, তিনি একজন মুত্তাকী।

তাক্ওয়ার পথে চলতে হলে প্রথমেই জানতে হবে কোন কোন কাজ আমাদের জন্য ক্ষতিকর এবং কোন কাজ আমাদের জন্য উপকারী। কোন কর্মপদ্ধতি ভুল এবং কোনটি শুদ্ধ। এগুলোর পার্থক্য নিরুপণের জন্য দরকার জ্ঞান। সেই জ্ঞানের ভান্ডার হিসেবে, ক্ষতিকর ও উপকারী জিনিসের বর্ণনা দিতেই আল্লাহ তায়ালা অবতীর্ণ করলেন আল-কুরআন। কুরআন হলো আইনের বই। আর সেই আইনের প্রতি ভীত শ্রদ্ধ হওয়াই তাকওয়া। পৃথিবীর বাস্তবতা বলে, জনগণ আইনের প্রতি শ্রদ্ধশীল না হলে আইনের মাধ্যমে মানুষকে অপরাধ থেকে দূরে রাখা সম্ভব হয় না। বরং আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যরাই তখন ভয়ঙ্কর অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। সম্প্রতি নারায়নগঞ্জের সাত খুনের ঘটনায় র‌্যাবের সম্পৃক্ততাই আমাদেরকে তা বুঝিয়ে দেয়। পক্ষান্তরে জনগণ যদি আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয় তাহলে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ছাড়াই জনগণ অপরাধ থেকে বেঁচে থাকে।

রোজা হলো প্রশিক্ষণ। শুধু পানাহার থেকে বিরত থাকাকেই রোজা বলে না; বরং রোজা হলো আল্লাহ কর্তৃক নিষিদ্ধ সব বিষয় থেকে বিরত থাকা। হাদিসেও এমনটিই এসেছে। হজরত থেকে বর্ণিত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘শুধু পানাহার বর্জনই সিয়াম নয়; সিয়াম তো অনর্থক ও অশ্লীল কথা ও কাজ বর্জন করা’। (ইবনু হিব্বান)। আসলেই তো।এক মাস প্রশিক্ষণের মাধ্যমে নিজেদের অপরাধ প্রবণতাকে দমন করতে না পারলে কী লাভ হলো সেই প্রশিক্ষণে?

আমার জীবনের প্রতিটি কথা ও কাজের হিসাব সংরক্ষণের জন্য সম্মানিত লেখক নিয়োজিত আছেন। পৃথিবীর কেউ না দেখলেও আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ঠিকই প্রত্যক্ষ করছেন। এই চেতনা বুকে ধারণ করে সব ধরণের অপরাধ ত্যাগের প্রশিক্ষণই প্রদান করবে রমজান। রোজা মানুষকে এই প্রশিক্ষণ দেয়। যখন কোনো রোজাদার রোজা রাখা অবস্থায় খেতে যাবে তখনই তাকে একটি ভয় তাড়া করবে। সে চিন্তা করবে কেউ না দেখলেউ আল্লাহ তো দেখছেন। তাই খাওয়া যাবে না। এই চেতনা শুধু খাওয়ার বেলায়ই নয়; বরং যখন নামাজ ত্যাগ করবে, সুদ কিংবা ঘুষ গ্রহণ করতে যাবে, অন্যের অনিষ্ট করবে তখনই তার মনের এ চেতনা তাকে বাধা দেবে এ প্রশিক্ষণই রোজা মানুষকে প্রদান করে।

তাকওয়া সম্পন্ন জনগোষ্টি নিয়ে যে সমাজ ব্যবস্থা গড়ে উঠবে, সেটিই হবে সুন্দর সমাজ। কারণ তাকওয়া সম্পন্ন একজন লোক যখন চুরি করতে যাবে তখনই তাকওয়া তাকে বাধা দেবে। ফলে চুরির গুনাহ থেকে সে বেচে যাবে। পাশাপাশি যার সম্পদ চুরি হয়নি সেও বেচে যাবে চোরের অনিষ্ট থেকে। তাই তো তাকওয়া সম্পন্ন মানুষই আল্লাহর কাছে সবচেয়ে সম্মানিত। আল্লাহ তায়ালা বলেনঃ- ”নিশ্চয়ই আল্লাহর নিকট তোমাদের মধ্যে সেই ব্যাক্তি অধিক সম্মানিত, তোমাদের মধ্যে যে আল্লাহকে সবচেয়ে বেশী ভয় করে। নিঃসন্দেহে আল্লাহ সব কিছু জানেন ও খবর রাখেন।”(সুরা আল হুজরাত-১৩) আসলে আল্লাহর কাছে সম্মানিত হওয়ায় পৃথিবীবাসীর কাছেও সে সম্মানিত হয় এমনটিই আমরা দেখছি। আমাদের সমাজের একজন অশিক্ষিত মানুষ যে কিনা কারো ক্ষতি করে না। মানুষের সাথে ভালো ব্যবহার করে অশিক্ষিত হওয়া সত্বেও সমাজের মানুষ তাকে সম্মান করে। পক্ষান্তরে একজন পিএইচডি ডিগ্রিধারী লোক যখন দূর্নীতিবাজ হয়, মানুষের ক্ষতি করে উচ্চশিক্ষিত হওয়া সত্বেও সমাজের মানুষ মন থেকে তাকে সম্মান করে না।সুতরাং মুত্তাকি মানুষই স্মানিত। আর সম্মানিত এ সমাজের উন্নয়নকল্পে আল্লাহ তায়ালা আসমান ও জমিনের দুয়ার সমুহ খুলে দেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন ”লোকালয়ের মানুষগুলো যদি ঈমান আনতো ও তাক্ওয়া বা ভয় করতো তাহলে আমি তাদের ওপর আসমান জমিনের যাবতীয় (রিজিকের) বরকতের দুয়ার খুলে দিতাম,কিন্তু ।”(সুরা আরাফ-৯৬)

রমজান মাস থেকে পুরো উপকৃত হতে প্রথমে রমযানের গুরুত্ব, বরকত এবং মর্যাদা সম্পর্কে আমাদেরকে জানতে হবে। এ পবিত্র মাসে আমরা যা কিছূ ইবাদাত এবং কর্মকান্ডে লিপ্ত হই, এ সব কিছুর মাধ্যমে আমাদের মধ্যে তাকওয়ার শক্তি অর্জন করতে হবে। জীবনের বদভ্যাসগুলো পরিবর্তনের এই মহান সুযোগ যেন অবহেলায় নষ্ট না হয়। নতুন নতুন ডিজাইনের পোষাক, জুতো ঈদ মার্কেট আর বন্ধু বান্ধবের ঈদ কার্ডই যেন আমাদের টার্গেট না হয়। শুধু দৈহিক রোজাই নয় বরং আমাদের আচরণকে নিয়ন্ত্রনের শপথ হোক রমজানে। তাকওয়া অর্জনের এ পশিক্ষণে নিজেদেরকে বদলে দিই। কুরআনের আদলে গড়ে উঠুক আমাদের দৈনিন্দন জীবন।

লেখক: শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া

Comments

comments