ছোট্ট শিশু জিয়াদের চলে যাওয়া ও আমাদের মানবতা

Print Friendly, PDF & Email

abdul alim

আব্দুল আলীম : গতরাতে (২৬ ডিসেঃ, শুক্রবার) ঘুমাতে পারিনি । কোন ভাবেই ছোট্ট বাবু জিয়াদের সর্বশেষ অবস্থা না জেনে বিছানায় যেতে পারছিলাম না । লক্ষ্য করছিলাম জাতি হিসেবে আমরা কত হতভাগা যে ঠিকাদার সাড়ে ছয়শ ফুট গভীর এই পাইপটি খোলা অবস্থায় ফেলে রেখেছে । ছোট্ট শিশু জিয়াদ খেলতে গিয়ে পড়ে গিয়েছে গর্তে বা কুপে বা পাইপের ভিতরে। খবরে বলা হচ্ছে এমন ঘটনা পৃথিবী দেখেনি কখনও। আমি বলি, এমন ঘটনা আমার এই সোনার দেশ ছাড়া আর কোন দেশে ঘটবেও না কোনদিন । কারণ, কোন দেশে এভাবে পাইপ রেখে ঠিকাদার চলে যেতে পারেনা। ঘটনা ঘটার পরে কর্তৃপক্ষ পালাতেও পারে না।

সময় যত পার হতে থাকল, নিজের দমটি যেন বন্ধ হয়ে আসছিল । সন্তানদের দিকে তাকালেই ওই ছোট্ট শিশুটির জন্য কষ্ট লাগছিল। কেমন করছে ছেলেটি? ও কি বেঁচে আছে? কিভাবে ১২/১৫ ইঞ্চি ব্যাসার্ধের পাইপে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বেঁচে থাকবে? ওকি ওর মাকে খুঁজছে? ওর নিশ্চয় ক্ষুধা পেয়েছে? ওর বাবা মার কেমন লাগছে? অনেক প্রশ্ন জাগছিল মনে। মনে হচ্ছিল যে সে আমার অনেক আপন। আপনই তো। সে তো আমার মতই কোন বাবার সন্তান। জিয়াদ তো আমার ছোট্ট সোনা মনির মতই ফুটফুটে একটি শিশু । আমরা সবাই মানুষ তাই আপনই তো মনে হবার কথা।

aaaaaaa

উদ্ধার হওয়ার মৃত জিয়াদ। ছবি : চৌধুরী আকবর হোসাইন

যে কোন জাতীয় দুর্যোগ কিংবা দুর্ঘটনায় আমরা বাঙালীরা প্রমান করতে সক্ষম হই মানুষ মানুষের জন্য। আমরা কত মানবিক। আমরা কিভাবে বিনা পারিশ্রমিকে জীবনের ঝুকি নিয়ে বাচাতে আগিয়ে আসি আরেকজনকে । আমরা দেখেছি তাজরীন ফ্যাশনের অগ্নিকান্ডে কিভাবে এগিয়ে এসেছিল মানুষ। সবচেয়ে বড় দৃষ্টান্ত আমরা রেখেছি রানা প্লাজা ট্র্যাজেডিতে পুরো ঢাকা শহরের সাধারন মানুষ কিভাবে এগিয়ে এসেছিল। কেউ যন্ত্র দিয়ে, কেউ বা ব্লেড, এয়ার ফ্রেশ্নার, আবার কেউ খাবারের পসরা সাজিয়ে বসেছিলেন আটকে পরা শ্রমিক ও উদ্ধারকারিদের জন্য । এনাম মেডিক্যাল কলেজ সেদিন এক যুগান্তকারী ভুমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিল। বিরামহীন সেবা দিয়ে গেছেন তাদের সীমিত সমর্থের মধ্যে। জীবন বাজি রেখে দুঃসাহসী সেই উদ্ধারকারীরা দিনের পর দিন জীবিত ও মৃতদেহ উদ্ধার করে। আজও মনে আছে মানুষের বিপদে এগিয়ে আসা এক নির্ভীক কর্মী এজাজের কথা। যে এজাজ নিজ হাতে ৭০ ফুট সুড়ঙ্গ কেটেছিলেন রানা প্লাজার আটকে পরা শ্রমিকদের বের করে আনার জন্য, অনেক আহত আটকে পরা শ্রমিকের ভরসা হয়ে উঠা সেই এজাজ মৃত্যু যন্ত্রনায় কাতরাতে থাকা শাহিনাকে উদ্ধার করতে গিয়ে মারাত্মক ভাবে আহত হন। পরবর্তীতে দেশি বিদেশি হাসপাতালে চিকিৎসার চেষ্টা করেও বাঁচানো যায়নি মানবতার এই নির্ভীক সৈনিককে।

ছোট্ট শিশু জিয়াদ যে কূপে পড়ে গিয়েছে সেই কূপটি মাত্র ১২/১৫ ইঞ্চি ব্যাসার্ধের। কোন প্রাপ্ত বয়স্ক মানুষকে পাঠাতে পারছে না ফায়ার সার্ভিস । এর মধ্যে ঘটনাস্থলে হাজির রানা প্লাজা ধসে উদ্ধারকাজে অংশ নেয়া আরেক নির্ভীক কর্মী বসির। লিক লিকে স্বাস্থ্যের অধিকারী অসীম সাহসী ও মানবতার এক জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত এই বসির মুহূর্তের মধ্যে প্রস্তুত হয়ে যায় নিচে নেমে শিশুটিকে উদ্ধারের জন্য। কিন্তু পাইপটি অনেক সরু হওয়ায় ফায়ার সার্ভিস সিদ্ধান্ত নিয়েছিল আগে শিশুটির অস্তিত্ব সম্পর্কে নিশ্চিত হয়ে তারপর বড় ধরনের ঝুঁকি নেওয়া যেতে পারে। কারণ বসিরের জন্য এত সরু পাইপের নিচে যাওয়া ছিল মারাত্মক ঝুঁকি । অবশেষে নামতে দেয়া হয়নি বসির কে। ঘটনার ২৪ ঘণ্টা পর আমরা জিয়াদ কে পেয়েছি কিন্তু যেভাবে চেয়েছিলাম তা না হয়ে নিথর মৃত দেহ হয়ে জিয়াদ ওঠে এসেছে ৬শ ফুট কুপ থেকে। আরও অবাক হবার মত এবারও আমাদের প্রশিক্ষিত বাহিনীর ২৩ ঘণ্টার চেষ্টাকে ব্যর্থ প্রমাণ করে কয়েকজন মোটর টেকনিশিয়ান তাদের নিজস্ব প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে শ্বাস রুদ্ধতার অবসান ঘটান। কিন্তু বাঁচাতে পারেনি জিহাদকে।

জিয়াদ তুমি ক্ষমা করোনা আমাদের কোনদিন। লজ্জায় ক্ষমা চাওয়ার ভাষা আমরা হারিয়ে ফেলেছি। যে দেশে এজাজ আছে, যে দেশে বসির আছে, যে দেশে ফারুক আছে সে দেশ তো মানবতার মডেল হবার কথা।

আজ ছোট্ট শিশু জিয়াদকে বাঁচাতে আমাদের এত আকুতি । আমার মত হাজার হাজার মানুষ সারা রাত শেষ খবরের অপেক্ষা করেছে। হাজার উৎসুক মানুষের ভিড় সামলাতে হিমশিম খেতে হয়েছে পুলিশকে। সবাই আল্লাহর কাছে দোয়া করেছেন যেন শিশু জিয়াদ জীবিত উদ্ধার হয়। জিয়াদের মৃত্যুর খবরে সারা দেশে নামে শোকের মাতম।

একটি মাত্র প্রানের জন্য যে জাতির এত আকুতি, সেই দেশে কিভাবে বাপের কোলে শিশু গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যায়? এই দেশে ওই সব ভয়ংকর সন্ত্রাসীর জন্ম হল কিভাবে যারা শিশুকে হত্যা করে টুকরো টুকরো করে রাস্তায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে ফেলে দেয়? আবার শিশুকে হত্যা করে নদীতে ভাসিয়ে দিচ্ছে? শিশু জিয়াদের ঘটনা অনেক মর্মান্তিক । জানিনা শিশু জিয়াদকে উদ্ধার করা সম্ভব হবে কিনা। কিন্তু ভাবনার বিষয় একটি জীবনকে বাচাতে হাজার হাজার মানুষের প্রচেষ্টা, লক্ষ লক্ষ মানুষের প্রার্থনা যে দেশে হয় সে দেশে কেন প্রতিদিন হত্যা, গুম, খুন বেড়ে যাচ্ছে? কেন প্রতিদিন খবরের শিরোনাম হচ্ছে ধর্ষণ, খুন, গুম জাতীয় খবর।

লেখক : সিইও, গ্লোবাল গ্রুপ বাংলাদেশ।

ই-মেইল : alim_aub@yahoo.com

Comments

comments