বেশ, বেশ বেশ, আহা বেশ ও আমার শ্রদ্ধেয় বাহাজ স্যার

0

আব্দুল আলিম : টাঙ্গাইলের জেলার ঘাটাইলের উপজেলার আনেহলা গ্রামের অতি সাধারণ একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ফার্স্টবয় হিসেবে পঞ্চম শ্রেনী উত্তীর্ণ হওয়ার পরে মাত্র ৯/১০ বছর বয়সের আমাকে নিয়ে বিরাট স্বপ্ন ছিল আমার মা-বাবা’র। মায়ের ইচ্ছানুযায়ী টাঙ্গাইলের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠ মধুপুর শহিদ স্মৃতি উচ্চ বিদ্যালয় হয় আমার নতুন ঠিকানা। ষষ্ঠ শ্রেনীর প্রথম ক্লাস। হালকা পাতলা গড়নের সাদা পাঞ্জাবি পড়া শান্ত মেজাজের এক শিক্ষক হাজিরা খাতা হাতে ঢুকলেন ক্লাসে। তিনিই ৩৮ বছরের শিক্ষকতা জীবনে একদিনও ছুটি না কাটানো আমাদের বাহাজ উদ্দিন ফকির স্যার।

শহীদ স্মৃতিতে আমার জীবনের অন্যতম সেরা স্মৃতি হল বাহাজ স্যার। আর সেই স্মৃতির অন্যতম বড় গল্প হল আমার হাতের লেখা। ছোট থেকেই আমার হাতের লেখা, বিশেষ করে বাংলা লেখা ছিল জঘন্য রকম খারাপ। হাই স্কুল জীবনের ২য় সপ্তাহ থেকেই বাহাজ স্যার সকলের জন্য হাতের লেখা বাধ্যতামূলক করলেন। প্রতিদিন ক্লাসের প্রথম ১০ মিনিট তিনি সকলের হাতের লেখার খাতা দেখতেন আর লেখার মূল্যায়ন করতেন “বেশ” “বেশ বেশ” “আহা বেশ” এই তিন ক্যাটাগরিতে।

প্রথম সপ্তাহে বললেন কমপক্ষে একদিন বেশ না পেলে সপ্তাহ শেষে বৃহস্পতিবার মাইর খেতে হবে। আমার হাতের লেখা স্যারের মন মত না হওয়ায় যা হবার তাই হল। এই ভাবে প্রথম মাস চলে গেলেও আমার আর “বেশ” পাওয়া হল না।

দ্বিতীয় মাসে স্যার বললেন, সপ্তাহে দুইটা “বেশ” পেতে হবে। এইবার অনেক চেষ্টা করে লিখতে লিখতে একটা “বেশ” বড়জোর যোগাড় করতে পারি। কিন্তু এখন আর একটা “বেশ” যথেষ্ট নয় তাই বৃহস্পতিবার মাইর খাওয়া আমার জন্য নিয়মে পরিণত ছিল।

তৃতীয় মাসে আমার অবস্থা আরও খারাপ। তখন সপ্তাহে দুইবার “বেশ” পাওয়া শুরু করেছি মাত্র। কিন্তু স্যার ঘোষণা দিলেন এই সপ্তাহে কমপক্ষে একবার “বেশ বেশ” পেতে হবে। ওই সপ্তাহে প্রথমবারের মত দুইবার “বেশ” পেলেও বৃহস্পতিবার কোন সুখবর বয়ে আনেনি।

প্রথম সাময়িক পরীক্ষার পর বললেন, কমপক্ষে দুইবার “বেশ বেশ” পেতে হবে মাইর থেকে বাঁচতে হলে। দিনরাত লিখেই যাচ্ছি,। বেশি বেশি লিখে মন গলানোর প্রাণান্তর চেষ্টা তার সূক্ষ্ম মূল্যায়ন পদ্ধতিতে চির ধরাতে পারেনি। আমার কপালে বৃহস্পতিবার মানেই বাহাজ স্যার গোলা বেতের মাইর।

পরবর্তীতে আমি “বেশ বেশ” পাওয়া শুরু করলেও ওই মাইর থেকে রক্ষা হয়নি কারন ততদিনে উনি ন্যূনতম ক্যাটাগরি ঠিক করেছেন “আহা বেশ”। আমার জীবনে “আহা বেশ” আর কোনদিন পাওয়া হয়নি আর স্যারের আশীর্বাদ এর গোলা বেত থেকেও কোনদিন বঞ্চিত হইনি আমি। আমি এখনও স্যার এর সেই আহা বেশ খুঁজে বেড়াই। কেউ আমার কাজের মূল্যায়ন করলেই স্যার এর মূল্যায়ন পদ্ধতির কথা মনে পড়ে।

সেই বাহাজ স্যার আজ ৩৮ বছর শিক্ষকতা জীবনের ইতি টানতে চলেছেন। স্যার এর এই যাবার বেলায় শ্রদ্ধা, কৃতজ্ঞতা জানানোর উপযুক্ত শব্দ বা ভাষা আমার জানা নেই। শুধু বুঝি, আপনার একজন ছাত্র হয়ে আমি গর্বিত। আপনার মত শিক্ষক সারা দেশের শিক্ষক জাতির মাথা উঁচু থেকে আরও উঁচুতর অবস্থানে নিয়ে যাবে। আপনি  নিয়মানুবর্তিতার ইতিহাস হয়ে আমাদের মাঝে বেঁচে থাকবেন যুগ থেকে যুগান্তর।

লেখক : সাধারণ সম্পাদক, মধুপুর শহীদ স্মৃতি উচ্চ বিদ্যালয় এলামনাই এসোসিয়েশন

Comments

comments

Share.

Leave A Reply