ঢাকা সোমবার, ফেব্রুয়ারী ১৯, ২০১৮



কালিহাতীতে স্কুল ছাত্রীকে ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনায় অপমৃত্যু মামলা

Print Friendly, PDF & Email

নিজস্ব প্রতিনিধি, টাঙ্গাইল : টাঙ্গাইলের কালিহাতীর সুমী আক্তার (১৫) নামে দশম শ্রেণির এক ছাত্রীকে ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনায় থানায় একটি অপমৃত্যু মামলা হয়েছে। বৃহস্পতিবার দুপুরে ঘটনাটি ঘটে উপজেলার মহেলা রাবেয়া সিরাজ উচ্চ বিদ্যালয়ে।

এ ঘটনায় রাতেই থানায় একটি অপমৃত্যু মামলা দায়ের হয়েছে। তবে এ ঘটনায় জড়িত স্থানীয় আ. সামাদ মিয়ার বখাটে ছেলে রণি মিয়াকে গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ। এ ঘটনায় থানায় অপমৃত্যু মামলা দায়ের হওয়া নিয়ে বিভিন্ন মহলে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার ঝড় বইছে। দেখা দিয়েছে রহস্যের বেড়াজাল।

শুক্রবার সকালে ময়নাতদন্ত শেষে লাশ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করে পুলিশ। বিকালে তাকে স্থানীয় ঈদগা মাঠের কবরস্থানে দাফন করা হয়।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে অনেকেই জানান,  টাঙ্গাইলের কালিহাতী উপজেলার মহেলা রাবেয়া সিরাজ উচ্চ বিদ্যালয়ে দশম শ্রেণির ছাত্রী ও স্থানীয় মো. রফিক মিয়ার মেয়ে সুমী আক্তার (১৫)। বৃহস্পতিবার মহেলা রাবেয়া সিরাজ উচ্চ বিদ্যালয়ে স্কুল কেবিনেট কাউন্সিল নির্বাচন চলছিল। ভোটের কারণে স্কুলের অধিকাংশ কক্ষ খালি ছিল। সুমী স্কুলে গিয়ে ওই নির্বাচনে ভোট দিয়ে ফেরার সময় স্থানীয় বখাটে রণি মিয়া (২৬) তাকে ডেকে নিয়ে মুখ বেঁধে বেদম মারপিট ও ধর্ষণ করে। মুমুর্ষূ অবস্থায় স্থানীয়রা সুমীকে ভ্যানে উঠিয়ে হাসপাতালে নেয়ার পথে সুমী মারা যায়। পরে তাকে বাড়িতে এনে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেছে বলে প্রচার চালানো হয়। পুলিশ মরদেহ উদ্ধার করে ময়না তদন্তের জন্য টাঙ্গাইল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠায়।

কিন্তু প্রতিবেশী ও নিহত স্কুলছাত্রীর স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সুমী আক্তারের সঙ্গে পাশের বাড়ির আবদুস সামাদ মিয়ার ছেলে রনি মিয়ার প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। দু’জন মাঝেমধ্যে বিভিন্ন স্থানে বেড়াতে যেত। বেশকিছু দিন আগে হঠাৎ করেই রনি তাদের অন্তরঙ্গ মেলামেশার ভিডিও পাঠায় সুমীর মোবাইল ফোনে। একই সঙ্গে মেসেজ দিয়ে সুমীকে হুমকি দেয়, রনির সঙ্গে নিয়মিত মেলামেশা না করলে ভিডিও ইন্টারনেটে ছেড়ে দেবে।

সুমী আক্তারের বাবা মো. রফিক মিয়া বলেন, পাশের বাড়ির প্রভাবশালী আবদুস সামাদ মিয়ার বখাটে ছেলে রনি মিয়া দীর্ঘদিন ধরে আমাদের জিম্মি করে রেখেছে। রনি আমার মেয়েকে ধর্ষণ করে ওই ভিডিও ইন্টারনেটে ছেড়ে দেয়ার ভয় দেখিয়েছে। বৃহস্পতিবার রনির ডাকে সুমি না যাওয়ায় তাকে হুমকি দেয়। সুমী সকালে ভোট দিতে স্কুলে যায়। পরে ভ্যানচালক সুমীর মরদেহ বাড়িতে রেখে চলে যায়। পরে জানতে পারেন তার মেয়ে গলায় ফাঁসি দিয়ে আত্মহত্যা করার চেষ্টা করেছিল। রনির কারণেই আমার মেয়ে আত্মহত্যা করেছে।

তিনি কান্নাজড়িত কণ্ঠে জানান, প্রতিবেশী প্রভাবশালী আ. সামাদ মিয়ার বখাটে ছেলে সন্ত্রাসী রণি মিয়া তাদেরকে জিম্মি করে রেখেছিল। সুমীকে জিম্মি করে ইতোপূর্বে কয়েকবার ধর্ষণ করে এবং সে দৃশ্য ভিডিও করে রাখে। ওই ভিডিও ইন্টারনেটে ছেড়ে দেয়ার ভয় দেখিয়ে বারবার ধর্ষণ করেছে। রণির ডাকে না যাওয়ায় একাধিকবার সুমীকে মারধর করেছে।মেয়েকে তো আর ফিরে পাবো না। এলাকার মাতব্বররা আছেন, তারা যেটা করবেন আমার পরিবারের ভালোর জন্যই করবেন।

একাধিক এলাকাবাসী জানান, বখাটে রনি দীর্ঘদিন ধরেই মেয়েদের স্কুলে যাওয়া-আসার পথে উত্ত্যক্ত করত। এর প্রতিবাদ করলে তাদের বিভিন্নভাবে হুমকিও দিত। এ কারণে বখাটে রনির বিরুদ্ধে একাধিকবার সালিশ বৈঠকও হয়েছে। কিন্তু তাতে কোনো লাভ হয়নি। এলাকার কয়েকজন প্রভাবশালী বারবার রনির পক্ষ নেয়ায় সে বেঁচে গেছে। মেয়ে হারানোর শোকে বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন মা পিয়ারা বেগম। যখনই জ্ঞান ফিরছে, তার মুখে একটাই কথা- রনির জন্যই আমার সুমী মারা গেছে। আমরা রনির শাস্তি চাই। এরই মধ্যে কথা হয় পিয়ারা বেগমের সঙ্গে। তিনি বলেন, বুধবার রাতে সুমি ঘরের বাইরে বের হয়ে অনেকক্ষণ পর ঘরে আসে। সুমিকে জিজ্ঞেস করলে সে ঘটনা খুলে বলে। আমার মেয়ের মৃত্যুর জন্য রনিই দায়ী।

স্থানীয় মাতব্বর ও মহেলা রাবেয়া সিরাজ উচ্চ বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি জমির উদ্দিন আমেরি  জানান, ওই ঘটনায় অহেতুক তার বিদ্যালয়কে জড়িয়ে বিভিন্ন মিডিয়ায় সংবাদ প্রকাশ করা হয়েছে। মরদেহের ময়না তদন্তেই প্রমাণ হবে কিভাবে তার মৃত্যু হয়েছে। তখন অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা নেওয়া যাবে। আগেই মিডিয়ায় বিষয়টি নিয়ে অতিরঞ্জিতভাবে সংবাদ প্রচার করা হয়েছে- হচ্ছে, যা কোন ভাবেই কাম্য নয়।

কালিহাতী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খন্দকার মো. আখেরুজ্জামান  বলেন, আখেরুজ্জামান জানান, প্রেম ঘটিত বিষয়ে মেয়েটি আত্মহত্যা করেছে বলে পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। এ কারণেই থানায় অপমৃত্যু মামলা দায়ের করা হয়েছে। এ সত্ত্বেও এটি ধর্ষণের পর হত্যা নাকি আত্মহত্যা এটি প্রমাণের জন্য ময়নাতদন্ত রিপোর্টের আপেক্ষা করা হচ্ছে। তদন্ত রিপোর্টে যদি ধর্ষণ বা হত্যার কোন আলামত পাওয়া যায় তাহলে পুলিশ বাদী হয়ে এ ঘটনায় অবশ্যই হত্যা মামলা দায়ের করবে বলেও জানান তিনি।

 

ফেসবুক মন্তব্য