ঢাকা বৃহস্পতিবার, নভেম্বর ১৫, ২০১৮

Mountain View



আ. লীগের সবুজ সংকেতের অপেক্ষায় লতিফ সিদ্দিকী, আগামীকাল সংসদ অধিবেশনে যোগ দেয়ার সম্ভাবনা

Print Friendly, PDF & Email

ডেস্ক রিপোর্ট : সংসদ অধিবেশনে যোগ দিতে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের সবুজ সংকেতের অপেক্ষায় রয়েছেন লতিফ সিদ্দিকী। সেখান থেকে সম্মতি পেলে টাঙ্গাইল-৪ আসন থেকে নির্বাচিত এ সংসদ সদস্য চলতি অধিবেশনেই সংসদে যোগ দিতে চান। তাঁর পারিবারিক একটি সূত্র কালের কণ্ঠকে এ তথ্য জানিয়েছে।

সূত্রটি জানায়, নিয়ম অনুযায়ী জাতীয় সংসদের চলতি অধিবেশন শুরুর আগে এতে যোগ দিতে লতিফ সিদ্দিকীকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। কিন্তু আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায়ের সংকেত ছাড়া হুট করে অধিবেশনে যোগ দিয়ে সরকারকে নতুন করে বিব্রতকর অবস্থায় ফেলতে চাইছেন না তিনি। এ জন্য তিনি ক্ষমতাসীন দলের উচ্চ পর্যায়ের সম্মতির অপেক্ষায় রয়েছেন। সম্মতি পেলে রবিবার অধিবেশনে যোগ দিতে পারেন। তবে সরকারের সংকেত না পেলে সংসদে যাবেন কি না, সে বিষয়ে তিনি এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নেননি। যেহেতু তাঁর সংসদ সদস্য পদ নিয়ে বির্তক আছে এবং আইনে এ বিষয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যা নেই, তাই তাঁর সংসদ সদস্য পদ থাকা না থাকা নিয়ে সরকারের মনোভাব গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। এ কারণে তিনি একটু ভেবেচিন্তে এগোচ্ছেন।

সাবেক আওয়ামী লীগ নেতা লতিফ সিদ্দিকী বর্তমান সরকারের ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলেন। গত ২৮ সেপ্টেম্বর নিউ ইয়র্কে এক অনুষ্ঠানে তিনি মহানবী (সা.), হজ, তাবলিগ জামাত ও প্রধানমন্ত্রীর ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়কে নিয়ে অশোভন মন্তব্য করেন। এ নিয়ে দেশে-বিদেশে ব্যাপক সমালোচনা ও বিক্ষোভের মুখে ১২ অক্টোবর মন্ত্রিপরিষদ থেকে এবং পরে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্যপদ থেকে তাঁকে অপসারণ করা হয়। ২৪ অক্টোবর দল থেকে তাঁর প্রাথমিক সদস্যপদও বাতিল করে আওয়ামী লীগ। কিন্তু গত আট মাসেও দলীয় এ সিদ্ধান্ত স্পিকার বা জাতীয় সংসদ সচিবালয়কে জানানো হয়নি। ফলে সংসদের দৃষ্টিতে তিনি এখনো আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য। ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেওয়ার অভিযোগে করা ১৭টি মামলায় উচ্চ আদালত জামিন দেওয়ায় গত ২৯ জুন তিনি মুক্তি পেয়েছেন।

তবে এ মুহূর্তে সংসদ অধিবেশনে যোগ দিলে লতিফ সিদ্দিকীকে নিয়ে আওয়ামী লীগ বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে পারে বলে মন্তব্য করেছেন দলের উপদেষ্টা পরিষদের এক সদস্য। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি বলেন, ‘দল থেকে তাঁকে (লতিফ সিদ্দিকী) বহিষ্কারের পর সাত মাস পেরিয়ে গেলেও এখনো বিষয়টি স্পিকারকে জানানো হয়নি। তিনি ছাড়া পেয়েছেন, এখন যেকোনো সময় সংসদে হাজির হতে পারেন। এতে ধর্মভিত্তিক দলগুলো আন্দোলনের ইস্যু পাবে। আর এতে সরকারও যে বিব্রতকর অবস্থায় পড়বে তাতে কোনো সন্দেহ নেই।’

যদিও লতিফ সিদ্দিকীর বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের আর কোনো ব্যবস্থা নেওয়ার নেই বলে মনে করেন দলটির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের বেশ কয়েকজন নেতা। তাঁদের মতে, লতিফ সিদ্দিকীর বিরুদ্ধে দল বা সরকারের যা করণীয় ছিল তার সবই করা হয়েছে। মন্ত্রিসভার পাশাপাশি আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্যপদ থেকে তাঁকে বাদ দেওয়া হয়েছে। এমনকি দলের প্রাথমিক সদস্যপদ থেকেও তাঁকে বহিষ্কার করা হয়েছে। ফলে তাঁর বিষয়ে আওয়ামী লীগের অবস্থান ইতিমধ্যেই স্পষ্ট হয়ে গেছে।

মন্ত্রিসভার ও আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর একজন সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘লতিফ সিদ্দিকীর বিরুদ্ধে যতটা কঠোর মনোভাব দেখানোর দরকার ছিল দল তা দেখিয়েছে। ইসলাম সম্পর্কিত বিষয়ে মন্তব্যের কারণে দল তাঁকে চরম শাস্তি দিয়েছে। এখন নতুন করে তাঁর বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার নেই।’

লতিফ সিদ্দিকীর জামিনে মুক্তি ঘিরে ইসলামী দলগুলো আন্দোলনে নামতে পারে- এ আশঙ্কার বিষয়ে আওয়ামী লীগের ওই নেতা বলেন, ‘লতিফ সিদ্দিকীর বিরুদ্ধে যে মামলাগুলো হয়েছে সেগুলোতে দোষী সাব্যস্ত হলে সাধারণত এক বছরের সাজা হয়। তিনি বিচারের আগে ইতিমধ্যেই সাত মাসের মতো জেল খেটেছেন। সাজা পাওয়ার আর কতটুকুই বা বাকি আছে? এমন পরিস্থিতিতে ইসলামী দলগুলোর আন্দোলন মানুষের সমর্থন পাবে না। আর এ দেশের ধর্মপ্রাণ মানুষের আবেগের কথা ভেবেই সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের ঘনিষ্ঠ একজন নেতার বিরুদ্ধে কঠোরতম ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে যে সরকার কোনো ছাড় দেয় না, তা মানুষের কাছে স্পষ্ট।’

তবে দল থেকে বহিষ্কার হলেও লতিফ সিদ্দিকীর সংসদ সদস্য পদ থাকবে বলে মনে করেন আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের এক সদস্য। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আইন বিশেষজ্ঞ ওই নেতা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘যেহেতু তিনি দল থেকে পদত্যাগ করেননি কিংবা সংসদে দলের বিরুদ্ধে ভোট দেননি, তাই তাঁর সংসদ সদস্য পদ যাবে না। দল থেকে বহিষ্কার হওয়ার পর তিনি এখন স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য হিসেবে সংসদে থাকবেন। আইনে এতে কোনো বাধা নেই।’

আওয়ামী লীগের একজন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘লতিফ সিদ্দিকীর বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপের সব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল দল ও সরকারের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে। আরো যদি কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়, সে সিদ্ধান্তও আসবে ওই পর্যায় থেকেই। সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে লতিফ সিদ্দিকীর বিরুদ্ধে নতুন কোনো ব্যবস্থা নেওয়ার আভাস নেই।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই নেতা বলেন, ‘লতিফ সিদ্দিকীর বহিষ্কারের বিষয়টি আওয়ামী লীগ স্পিকারকে জানাতে পারে। তখন সংসদ সদস্য পদ থাকবে কি না, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য বিষয়টি নির্বাচন কমিশনে পাঠাবেন স্পিকার। নির্বাচন কমিশনই এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেবে।’

লতিফ সিদ্দিকীকে দল থেকে বহিষ্কারের বিষয়টি শিগগিরই স্পিকারকে জানানো হচ্ছে কি না, তা অবশ্য জানাতে পারেননি আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটি ও সংসদীয় দলের বেশ কয়েকজন নেতা। দলের উপদেষ্টা পরিষদের একজন সদস্য, সভাপতিমণ্ডলীর তিনজন সদস্য এবং একজন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও একজন সাংগঠনিক সম্পাদকের সঙ্গে কালের কণ্ঠের কথা হলেও কেউ গণমাধ্যমে উদ্ধৃত হয়ে এ বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি। তাঁদের সবারই একই কথা- ‘এ বিষয়ে আমার কিছু জানা নেই।’

আওয়ামী লীগ চিঠি না দেওয়ায় সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না সংসদ : মন্ত্রিসভা ও দল থেকে লতিফ সিদ্দিকীকে অপসারণ করা হলেও এখনো আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে বিষয়টি স্পিকারকে জানানো হয়নি। এ কারণে তাঁর বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি জাতীয় সংসদ। দলীয় সিদ্ধান্তের বিষয়টি লিখিতভাবে পাওয়ার পর পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী।

কালের কণ্ঠকে স্পিকার বলেন, ‘সংসদের দৃষ্টিতে তিনি (লতিফ সিদ্দিকী) এখনো আগের মতো আছেন। আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে তাঁর বিষয়ে কিছুই জানানো হয়নি। সংসদে কোনো চিঠিও আসেনি। তাই বিষয়টি নিয়ে আলোচনা বা সিদ্ধান্ত নেওয়ার কিছু নেই। দলীয় সিদ্ধান্তের কথা জানিয়ে চিঠি দেওয়া হলে আমি তা নির্বাচন কমিশনে পাঠাব। কমিশন তাঁর বিষয়ে করণীয় ঠিক করবে। কমিশনের নির্দেশনা পেলে তা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেবে সংসদ।

সংসদ সচিবালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, সংসদের অধিবেশন কক্ষের ট্রেজারি বেঞ্চে (সামনের সারিতে সরকারি দলের মধ্যে) ১৪ নম্বর আসনটি লতিফ সিদ্দিকীর নামে বহাল আছে। এ মুহূর্তে অধিবেশনে যোগ দিলে তিনি ওই আসনেই বসবেন। সরকারি দলের জ্যেষ্ঠ সদস্য হিসেবে তিনি ওই আসনটি বরাদ্দ পেয়েছিলেন। তবে দল থেকে বহিষ্কারের চিঠি পেলে আসনটি বরাদ্দ রাখার কোনো সুযোগ নেই। তখন তাঁর আসনটি চলে যাবে বিরোধী দলের দিকে।

যদিও লতিফ সিদ্দিকীর সংসদ সদস্য পদ থাকবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন আছে সংসদসংশ্লিষ্ট অনেকের মনেও। এ বিষয়ে স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী বলেন, ‘দল থেকে মনোনয়ন পেয়ে দলীয় প্রতীক নিয়ে তিনি নির্বাচিত হয়েছেন। এরপর দল বহিষ্কার করলে কি কেউ সদস্য থাকতে পারবেন? আর থাকলে কিভাবে থাকবেন? স্বতন্ত্র সদস্য হতে হলে কিছু শর্ত পূরণ করতে হয়। তিনি তো সেই শর্ত পূরণ করে আসেননি। সে ক্ষেত্রে কী হবে? তবে এখানে সংসদের কিছু করণীয় নেই। দলীয় সিদ্ধান্তের চিঠি পেলে সংসদ সচিবালয় তা নির্বাচন কমিশনে পাঠিয়ে দেবে। এরপর তারা চাইলে শুনানি করতে পারে। তবে সিদ্ধান্ত তাদেরই নিতে হবে। সংসদ শুধু তাদের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করবে।’

তবে ডেপুটি স্পিকার অ্যাডভোকেট মো. ফজলে রাব্বী মিয়া কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বিষয়টি নিয়ে বিতর্ক হতে পারে; কিন্তু দল থেকে বহিষ্কার হলে কারো সংসদ সদস্য পদ যাবে না। এ ক্ষেত্রে সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ প্রযোজ্য হবে না। অতীতে তেমন রেকর্ড নেই।’ লতিফ সিদ্দিকীর সংসদ সদস্য পদের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘তিনি (লতিফ সিদ্দিকী) স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য হিসেবে থাকবেন।’ তবে এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশন চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

গ্রেপ্তারে হেফাজতের আলটিমেটাম : লতিফ সিদ্দিকীকে গ্রেপ্তারের দাবিতে আলটিমেটাম দিয়েছে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ। আজ বৃহস্পতিবারের মধ্যে তাঁকে গ্রেপ্তার করা না হলে কাল শুক্রবার বাদ জুমা রাজধানীর বায়তুল মোকাররমে বিক্ষোভ করার ঘোষণা দিয়েছ সংগঠনটি।

গত বুধবার সকালে রাজধানীর বারিধারার জামিয়া মাদানিয়া মাদ্রাসায় ঢাকা মহানগর হেফাজত আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনের নগর আহ্বায়ক মাওলানা নূর হোসাইন কাসেমি এ কর্মসূচি ঘোষণা করেন। এ সময় উপস্থিত ছিলেন সংগঠনের ঢাকা মাহনগরীর সদস্যসচিব জুনায়েদ আল হাবিব, নায়েবে আমির ওবায়দুল্লাহ ফারুক প্রমুখ।

সৌজন্যে : দৈনিক কালের কণ্ঠ

ফেসবুক মন্তব্য