ঢাকা সোমবার, সেপ্টেম্বর ২৪, ২০১৮

Mountain View



সখীপুরে বিএনপি নেতাসহ ৩০ জন ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাকে বাদ দেওয়ার সুপারিশ

Print Friendly, PDF & Email

মোঃ ইসমাইল হোসেন, সখীপুর (টাঙ্গাইল) সংবাদদাতা : সখীপুরে বর্তমান তালিকায় নাম থাকা ৩০ জন মুক্তিযোদ্ধাকে ভুয়া বলে দাবি করা হয়েছে। তাঁদের নাম তালিকা থেকে বাদ দিতে ইতিমধ্যে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে সুপারিশ পাঠিয়েছে স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড।

sakhipur

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাদের যে তালিকা তৈরি করেছে, সেখানে বিএনপি নেতা অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান, মো. নায়েব উদ্দিন ওরফে নাজিম উদ্দিন, কাজী আলী আজম, মোজাম্মেল হক, আজাহার হোসেন, আবদুস সবুর মিয়া ও দুই সহোদর মো. লুৎফর রহমান, মো. আবদুল আজিজসহ ৩০ জনের নাম রয়েছে।

স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড সূত্রে জানা যায়, উপজেলার কীর্ত্তনখোলা গ্রামের বাসিন্দা অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান গত জোট সরকারের সময় মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় নাম লেখান। তিনি তৎকালীন উপজেলা বিএনপির সভাপতি ও বর্তমান টাঙ্গাইল জেলা বিএনপির যুগ্ম সম্পাদক। তাঁর গেজেট নম্বর-৪৩৫০। মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড বলছে, অপ্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পরও রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে তিনি মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তাঁর নাম লিখিয়েছেন। তবে অধ্যাপক মোস্তাফিজ ওই অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘আমি যুদ্ধ করিনি সত্য। তবে মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগিতা করেছি। তাই আমি সহযোগী মুক্তিযোদ্ধা।’ বর্তমানে তিনি ভাতা তুলছেন না বলে জানান। হতেয়া গ্রামের মো. নায়েব উদ্দিন ওরফে নাজিম উদ্দিনের মুক্তিবার্তা (লাল বই) নম্বর-০১১৮০৭০৬৬৩। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি রাজাকার ছিলেন উল্লেখ করে তালিকা থেকে তাঁর নাম বাদ দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।

এ ব্যাপারে মো. নায়েব উদ্দিন বলেন, ‘প্রথমে আমি স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করি। পরে চাপের মুখে দুই মাস রাজাকারদের ক্যাম্পে ছিলাম। সেখান থেকে পালিয়ে এসে বাসাইলের তারুটিয়ায় কমান্ডার মোছাদ্দেক আলী খানের কম্পানির অধীনে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিই।’

তবে হতেয়া গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা মো. খলিলুর রহমান বলেন, ‘নাজিম উদ্দিন আমাদের সঙ্গে যুদ্ধ করেনি। কোথাও করেছে বলেও আমার জানা নেই।’ কৈয়ামধু গ্রামের আজগর আলীর ছেলে মোজাম্মেল হকের সেনা গেজেট নম্বর-২৭০৯। তিনি তখন স্বাধীনতাবিরোধী ছিলেন বলে সুপারিশে উল্লেখ করা হয়। তবে তিনি ওই অভিযোগ সঠিক নয় জানিয়ে নিজেকে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা বলে দাবি করেন। তিনি ঘাটাইলের মনির কমান্ডারের কোম্পানির অধীনে যুদ্ধে অংশ নেন বলে জানান। চাকদহ গ্রামের কাজী আলী আজমের গেজেট নম্বর-৩৯৮৫। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি পাকিস্তানি বাহিনী ও রাজাকারদের সহযোগী ছিলেন বলে তাঁর নামও বাদ দেওয়ার তালিকায় রাখা হয়েছে। মুক্তিবার্তায় তাঁর নাম নেই।

কাজী আলী আজম বলেন, ‘আমি কমান্ডার খোরশেদ আলমের কম্পানিতে যুদ্ধে অংশ নিই। আমার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সঠিক নয়।’ কচুয়া গ্রামের মো. আজাহার হোসেনের মুক্তিবার্তা নম্বর-০১১৮০৭০৭১৪। তিনি ভাতা তুলছেন। তিনি মুক্তিযুদ্ধের সময় অপ্রাপ্তবয়স্ক থাকায় তাঁর নামও বাদের তালিকায় রয়েছে। কালিয়াপাড়া গ্রামের আবদুস সবুরের মুক্তিবার্তা নম্বর-০১১৮০৭০৯৬৫। যুদ্ধের সময় গুলিবিদ্ধ একজন আহত মুক্তিযোদ্ধাকে পানি খাওয়ানোর জন্য তাঁর বাড়িতে নিয়ে গেলে তিনি পানি না দিয়ে তাড়িয়ে দেন বলে সুপারিশপত্রে উল্লেখ করা হয়। তবে আবদুস সবুর বলেন, এমন কোনো ঘটনার কথা তাঁর জানা নেই। যে বাড়ির কথা উল্লেখ করা হয়েছে, সেটি তাঁর বাড়ি নয়। তিনি স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীর কমান্ডার মাঈন উদ্দিনের অধীনে কাজ করেছেন। শত্রুতামূলকভাবে একজন কম্পানি কমান্ডার তাঁর বিরুদ্ধে এমন অপপ্রচার করছেন বলে তিনি দাবি করেন। গোহাইলবাড়ী গ্রামের মো. আবদুল আজিজের মুক্তিবার্তা নম্বর-০১১৮০৭০৮৬২। তিনি মুক্তিযুদ্ধের সময় সেনা সদস্য হিসেবে পাকিস্তানে কর্মরত ছিলেন উল্লেখ করে মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড।

আবদুল আজিজ বলেন, ‘যুদ্ধ শুরুর দুই মাস পর আমি পালিয়ে দেশে এসে কমান্ডার আবদুস সবুর গোপালের কোম্পানিতে যোগ দিয়ে যুদ্ধে অংশ নিই।’ তাঁর সহোদর মো. লুৎফর রহমানের মুক্তিবার্তা নম্বর-০১১৮০৭০৫৮৬। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি অপ্রাপ্তবয়স্ক থাকার অভিযোগ করা হলেও তিনি ওই একই কম্পানির অধীনে যুদ্ধ করেছেন বলে দাবি করেন। উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার এম ও গণি বলেন, মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকায় রাজাকার, স্বাধীনতাবিরোধী, অপ্রাপ্তবয়স্কসহ ৩০ জন ভুয়া মুক্তিযোদ্ধার নাম ছিল। এটি খুবই দুঃখজনক। মুক্তিবার্তায় নাম থাকার পরও তাঁদের নাম মুক্তিযোদ্ধা তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার সুপারিশের কারণ জানতে চাইলে এম ও গণি বলেন, মুক্তিবার্তাকে মুক্তিযোদ্ধা নির্ণয়ে প্রমাণ হিসেবে গণ্য করা হলেও স্বাধীনতার পর অনেকেই বিভিন্নভাবে মুক্তিবার্তায় নাম লিখিয়েছেন। নিরপেক্ষ তদন্ত করে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে যাঁদের নাম পাওয়া গেছে, তাঁদের বাদ দিতে সুপারিশ করা হয়েছে।

উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা ফরহাদ হোসেন ভূইয়া বলেন, সরকারি নিয়ম মেনেই মুক্তিযোদ্ধাদের ভাতা দেওয়া হয়। যাচাই-বাছাই করে সরকার সর্বশেষ যে তালিকা তৈরি করবে, সে অনুযায়ী ভাতা দেওয়া হবে। এ ক্ষেত্রে কেউ বাদ পড়লে তাঁর ভাতা বন্ধ করে দেওয়া হবে।

ফেসবুক মন্তব্য