ঢাকা শনিবার, নভেম্বর ১৭, ২০১৮

Mountain View



চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন ডা. বেকার

Print Friendly, PDF & Email

ডেস্ক রিপোর্ট : টাঙ্গাইলের মধুপুর বনে কালিয়াকুড়ি স্বাস্থ্য পরিচর্যা কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠ‍াতা নিউজিল্যাণ্ডের নাগরিক চিকিৎসক এড্রিক এস বেকারের মরদেহ সমাহিত করা হয়েছে।

বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) দুপুর সোয়া ১২টার দিকে স্বাস্থ্য পরিচর্যা কেন্দ্রের পাশে তাকে সমাহিত করা হয়। এর আগে সকাল ১০টায় প্রায় ঘণ্টাব্যাপী মিশা (প্রার্থনা) করা হয়।

11895189_893657170727911_960966539316350072_o

এ সময় উপস্থিত ছিলেন-সাভার গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক জাফরউল্লাহ চৌধুরী, টাঙ্গাইলের জেলা প্রশাসক মাহাবুব হোসেন, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মুক্তাদির আজিজ, জেলা তথ্য কর্মকর্তা কাজী গোলাম আহাদ, উন্নয়ন কর্মী শিরীন হক, স্থানীয় সচেতন নাগরিক কমিটির সভাপতি ড. মীর ফরহাদুল আলম মনি, উপজেলা চেয়ারম্যান সরোয়ার আলম খান, উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান হেলাল উদ্দিন, ভাইস চেয়ারম্যান নারী নাজমা সরকার ও স্থানীয়রা।

এছাড়া স্থানীয় সামাজিক, রাজনৈতিক ও বিভিন্ন সংগঠন তার কবরে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে।

রোববার (৩০ আগস্ট) এড্রিক এস বেকার হৃদরোগে আক্রান্ত হন। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) দুপুর পৌনে ২টার দিকে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

হাসপাতালে কর্মরত বেকারের সহকারী অনিমেষ রেমা বেকার জানান, নিউজিল্যান্ডের এ নাগরিক ১৯৮৩ সালে বাংলাদেশে বেড়াতে এসে মধুপুরের গভীর বনের থানার বাইদ এলাকায় দুঃখী বনবাসীদের চিকিৎসা সেবা দিতে ক্লিনিকটি গড়ে তোলেন। এর পর থেকে এই এলাকার মানুষকে বিনা পয়সায় চিকিৎসা সেবা দিতে থাকেন।

11893872_893657220727906_4700563969052389498_o

একজন বিদেশি চিকিৎসকের বিনামূল্যে চিকিৎসা সেবার খবর অল্প দিনে এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। মধুপুর ও তার আশপাশের উপজেলা থেকে রোগী আসা শুরু করে। বেকারও পরম মমতা আর স্নেহে রোগীর সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করেন। এই এলাকার জনগণের ভালোবাসা আর রোগীর সেবা করতে গিয়ে আটকে যান তিনি। আর ফিরে যাননি নিজ দেশে। তবে নিজের দেশসহ বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ করে তিনি হাসপাতাল ও রোগীদের জন্য অর্থ সংগ্রহ করেছেন।

পরে ২০০৬ সালে থানার বাইদ থেকে কালিয়াকুড়িতে গিয়ে প্রাকৃতিক পরিবেশে গড়ে তোলেন কালিয়াকুড়ি স্বাস্থ্য পরিচর্যা কেন্দ্র নামের এই হাসপাতাল। হাসপাতালে বেকারের সহযোগী হিসেবে স্থানীয় অনেকে কাজ করেন। প্রতিদিন ১২০ জন রোগীকে আউটডোরে চিকিৎসা সেবা দেওয়ার কথা থাকলেও দেড় শতাধিক রোগীকে সেবা দেওয়া হতো। সর্বক্ষণ এ হাসপাতালে ৪০ জন রোগী ভর্তি থেকে চিকিৎসা সেবা গ্রহণ করে।

মানব সেবায় বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপনকারী বিদেশি এ চিকিৎসককে নিয়ে গণমাধ্যমে সচিত্র প্রতিবেদন প্রকাশ হয়েছে বহুবার। বিটিভিতে গতবার হানিফ সংকেতের জনপ্রিয় অনুষ্ঠান “ইত্যাদি”তে বেকারকে নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশে বিশ্বে সাড়া পড়ে গিয়েছিল।

সাবেক মন্ত্রী ও স্থানীয় এমপি ড. আব্দুর রাজ্জাক, উপজেলা চেয়ারম্যান সরোয়ার আলম খান, ভাইস চেয়ারম্যান হেলাল উদ্দিন, আওয়ামী লীগ নেতা খ. শফিউদ্দিন মনি, উপজেলা বিএনপির সভাপতি জাকির হোসেন সরকার, মধুপুর সচেতন নাগরিক কমিটি-সনাক সভাপতি ডা. মীর ফরহাদুল আলম মনিসহ গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ তার মৃত্যুতে শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন।

তারা বেকারের জীবন থেকে শিক্ষা নিয়ে দেশ প্রেমে উদ্বুদ্ধ হওয়ার জন্য সবার প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।

জয়েনশাহী আদিবাসী উন্নয়ন পরিষদের সভাপতি গারো নেতা ইউজিন নকরেক বলেন, আমাদের জন্য এ খবর দুঃখজনক। তবে তার থেকে শিক্ষা নিয়ে আমাদের দেশের চিকিৎসকসহ সবার সেবার মানসিকতায় উদ্দিপ্ত হওয়া উচিত।

বেকারের জীবন, ১৯৪১ সালে নিউজিল্যান্ডের রাজধানী ওয়েলিন্টনে এড্রিক বেকারের জন্ম। তার বাবা ছিলেন পরিসংখ্যানবিদ। মা বেট্রি বেকার শিক্ষক। চার ভাই, দুই বোনের মধ্যে এড্রিক দ্বিতীয়। তিনি ১৯৬৫ সালে ডুনিডেন শহরের ওটাগো মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস ডিগ্রি লাভ করেন। পরে ওয়েলিন্টনে ইন্টার্নি শেষে নিউজিল্যান্ড সরকারের সার্জিক্যাল টিমে যোগ দিয়ে চলে যান যুদ্ধবিধ্বস্ত ভিয়েতনামে। সেখানে কাজ করেন ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত। মাঝে অষ্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ডে পোস্ট গ্রাজুয়েশন কোর্স করেন ট্রপিক্যাল মেডিসিন, গাইনি ও শিশু স্বাস্থ্য বিষয়ে।

১৯৭৬ সালে পাপুয়া নিউগিনি ও জাম্বিয়ায় যান। কিন্তু কোথাও মন টেকেনি তার। এরই মধ্যে জন্ডিসে আক্রান্ত হয়ে চলে যান যুক্তরাজ্যে। এক বছর পর সুস্থ হয়ে ১৯৭৯ সালে চলে আসেন বাংলাদেশে।

এদেশে এসে এড্রিক বেকার প্রথমে মেহেরপুর মিশন হাসপাতালে প্রায় দু’বছর ও পরে টাঙ্গাইলের মির্জাপুর কুমুদিনী হাসপাতালে আট মাস কাজ করেন। পরে চলে আসেন মধুপুরে।

আমৃত্যু তিনি মধুপুরের গভীর বনে তার হাতে গড়া হাসপাতালেই ছিলেন। সেই হাসপাতালেই তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

সৌজন্যে : বাংলানিউজ২৪ডটকম

ফেসবুক মন্তব্য