ঢাকা সোমবার, সেপ্টেম্বর ২৪, ২০১৮

Mountain View



কালিহাতীতে কাবিটা ও টি.আর এর ১৪৫ টি প্রকল্পে হরিলুট! এলাকায় সমালোচনার ঝড়

Print Friendly, PDF & Email

নিজস্ব প্রতিনিধি : টিআর এবং কাবিটা কর্মসূচীর পৌনে দুই কোটি টাকার প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। জাতীয় সংসদ থেকে পদত্যাগকারী সাবেক মন্ত্রী আবদুল লতিফ সিদ্দিকীর নির্বাচনী এলাকা টাঙ্গাইল-৪ (কালিহাতী) এমপি কোটায় বিশেষ বরাদ্দকৃত (২য় পর্যায়) ২০১৫-১৬ অর্থবছরে টিআর ও কাবিটা খাতে ১৪৫টি প্রকল্পের বিপরীতে ১ কোটি ৭৫ লাখ ৭ হাজার ১৫৪ টাকা আত্মসাতের ঘটনা ঘটেছে। এ আসনে এমপি না থাকায় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আবু নাসার উদ্দিন ও উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মোজহারুল ইসলাম তালুকদার ঠাণ্ডা ওই প্রকল্পগুলো সমন্বয় করেছেন। বেশিরভাগ প্রকল্পের কোন কাজই হয়নি। আবার কিছু প্রকল্পের কোন অস্তিত্বই খুঁজে পাওয়া যায়নি। অভিযোগ রয়েছে উপজেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় আওয়ামী লীগের কতিপয় নেতা বরাদ্দ অর্থের বেশিরভাগ টাকাই পকেটস্থ করেছেন।

জানা গেছে, স্থানীয় এমপির অনুকূলে ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ২য় পর্যায়ে টাকার বিনিময়ে গ্রামীণ অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণখাতে ১১৫টি প্রকল্প এবং টাকার বিনিময়ে গ্রামীণ অবকাঠামো সংস্কার খাতে ৩০টি প্রকল্পসহ মোট ১৪৫টি প্রকল্পে দু’দফায় ৮৭ লাখ ৫৩ হাজার ৫৭৭ টাকা হারে মোট ১ কোটি ৭৫ লাখ ৭ হাজার ১৫৪ টাকা ত্রাণ মন্ত্রণালয় থেকে বরাদ্দ আসে। কিন্তু টাঙ্গাইল-৪ (কালিহাতী) আসনের এমপি আবদুল লতিফ সিদ্দিকী জাতীয় সংসদ থেকে পদত্যাগ করায় ওই বরাদ্দে কোন নিয়ন্ত্রণ নেই। ফলে বরাদ্দকৃত টাকা হরিলুট হয়েছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, উপজেলা চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মোজহারুল ইসলাম তালুকদার ঠাণ্ডু, উপজেলা নির্বাহী অফিসার আবু নাসার উদ্দিন ও উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা আল-আমিন যৌথভাবে বরাদ্দকৃত সমুদয় অর্থ আত্মসাত করেছেন। নামে-বেনামে প্রকল্পের বিপরীতে অর্থ বরাদ্দ দেখিয়ে সংশ্লিষ্ট প্রকল্প সভাপতিদের অজান্তে প্রকল্পের অর্থ উত্তোলন করা হয়েছে।

টাঙ্গাইল-৪ (কালিহাতী) আসনের এমপি পদ দীর্ঘদিন যাবত শূন্য থাকায় উপজেলার সকল কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে যাচ্ছেতাইভাবে। অনিয়ম, দুর্নীতি ও সরকারী অর্থ আত্মসাতের মহোৎসব চলছে প্রকাশ্যে-অবাধে। উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার কার্যালয়ের নিয়ন্ত্রণে উল্লেখিত প্রকল্পের কাজ হওয়ার কথা থাকলেও চলছে রাজনীতির ছত্রছায়ায়। কোন নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ ৫১টি প্রকল্প তৈরি করে ‘সোলার প্যানেল’ স্থাপনের নামে সরকারী অর্থ অপচয় করেছে। গ্রামীণ অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণ ও সংস্কারের জন্য সরকারের গৃহীত কর্মসূচীকে ব্যক্তি স্বার্থে ব্যবহার করা হচ্ছে। ব্যক্তি পর্যায়ের প্রকল্পগুলোতে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের কতিপয় প্রভাবশালী বিত্তবান নেতাকর্মী, কালিহাতী উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার কার্যালয়ের কর্মচারীসহ সরকারী কর্মকর্তা, উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যানের ভাইয়ের নামেও বরাদ্দ দিয়ে অর্থ লোপাট করা হয়েছে। টিআর খাতের ১১৫টি প্রকল্পের মধ্যে ৮০নং প্রকল্পটি নাগবাড়ী ইউনিয়নের জনৈক ব্যক্তির বাড়িতে সোলার প্যানেল স্থাপনের জন্য ৫৪ হাজার ৭৫০ টাকা, একই ইউনিয়নের আওয়ামী লীগের বহিষ্কৃত ইউনিয়ন সাধারণ সম্পাদকের বাড়িতে সোলার প্যানেল স্থাপনের জন্য ৭৭নং প্রকল্পে ৫০ হাজার টাকা, একইভাবে ৭৬নং প্রকল্পটি উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান আব্দুল মজিদ তোতার ভাই জয়নাল আবেদীনের নামে ৫০ হাজার টাকা বরাদ্দ দিয়ে উত্তোলন করা হয়েছে। ৯২নং প্রকল্পে ৩৬ হাজার ৫শ’ টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। যিনি কালিহাতী উপজেলা আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদক আবু মোহাম্মদ জিন্নাহ্র বাবা। ১০৫নং প্রকল্পের বঙ্গবন্ধু স্মৃতি পাঠাগারের ঘর উন্নয়ন (শহীদ শফি সিদ্দিকী চত্বর) ২ লাখ ৬২ হাজার ৫শ’ টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। অথচ শহীদ শফি সিদ্দিকী চত্বরে বঙ্গবন্ধু স্মৃতি পাঠাগারের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। পরে অবশ্য রাস্তার পাশে জায়গা দখল করে গত ১৮ অক্টোবর ছোট দোচালা ঘর তোলা হয়েছে। সেখানে উপজেলা আওয়ামী লীগ লেখা সাইনবোর্ড টাঙ্গিয়ে দেয়া হয়েছে। ১০৭নং প্রকল্পের বেতডোবা মেঘাখালী নদীর পাড় প্যালাসাইটিং ও মাটি ভরাটের জন্য ২ লাখ ৬২ হাজার ৫শ’ টাকা বরাদ্দ দেখানো হলেও ওই প্রকল্পের কোন অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়নি। ২২নং প্রকল্পটিতে কালিহাতী স্কাউট ভবন এর মাঠ ভরাট-সম্প্রসারণ ও সংস্কারের জন্য ৩ লাখ ২১ হাজার ২৮৯ টাকা বরাদ্দ দেখানো হলেও প্রকৃতপক্ষে স্কাউট ভবন সংলগ্ন কোন মাঠই নেই। একই প্রকল্পের ২৫নং প্রকল্পটিতে কালিহাতী দৈনিক কাঁচাবাজার সংলগ্ন গণশৌচাগার ও সাতুটিয়া গোরস্থানে মাটি ভরাটের জন্য ৩ লাখ টাকা বরাদ্দ করা হলেও কালিহাতী কাঁচাবাজারে কোন গণশৌচাগার নির্মাণ করা হয়নি। এছাড়া ইউএনও আবু নাসার উদ্দিন প্রতিষ্ঠিত ‘ভোরেরপাখি’ শরীর চর্চা ক্লাবের নামে রেজিস্টেশন বিহীন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনকে নিয়ম বহির্ভূতভাবে ৮৬ হাজার ৫শ’ টাকা প্রদান করেছেন।

এ বিষয়ে কালিহাতী উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা আল-আমিন জানান, তিনি এ উপজেলায় নতুন যোগদান করেছেন। গত অর্থবছরের বিষয়াদি সম্পর্কে তিনি অবগত নন। তবে কোন অভিযোগ থাকলে তিনি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিবেন।

কালিহাতী উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মোজহারুল ইসলাম তালুকদার ঠান্ডু জানান, এমপি না থাকায় ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের বিশেষ বরাদ্দের দেখভাল করছেন উপজেলা নির্বাহী অফিসারসহ সংশ্লিষ্টরা। এখানে উপজেলা চেয়ারম্যান হিসেবে পরামর্শ ছাড়া কোন ভূমিকা রাখার সুযোগ নেই।

কালিহাতী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আবু নাসার উদ্দিন জানান, টিআর ও কাবিটা খাতে ১৪৫টি প্রকল্পে অনিয়ম হয়েছে- এমন তথ্য তাঁর জানা নেই। প্রতিটি প্রকল্পের কাজ সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করা হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন। যদি কোথাও অনিয়ম হয়ে থাকে তাহলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

এ ব্যাপারে টাঙ্গাইলের জেলা প্রশাসক মাহবুব হোসেন বলেন, শুনেছি কালিহাতীতে টিআর-কাবিটা প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়ম হয়েছে। তবে আমার কাছে এ পর্যন্ত কেউ লিখিত অভিযোগ দেয়নি। তারপরও জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তাকে তদন্ত করে রিপোর্ট দিতে বলেছি। অনিয়ম হলে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে।

ফেসবুক মন্তব্য