ঢাকা মঙ্গলবার, নভেম্বর ২০, ২০১৮

Mountain View



লৌহজং নদী উদ্ধার আন্দোলন : জেলা প্রশাসক মাহবুব হোসেনের কাছে ঋণি থাকবে টাঙ্গাইলবাসী

Print Friendly, PDF & Email

আব্দুল আলিম : নদীমাতৃক বাংলাদেশের অন্যতম জেলা শহর টাঙ্গাইল শহরের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া নদীটির নাম লৌহজং। এ নদীর জন্ম ও প্রবাহ টাঙ্গাইল জেলাতেই সীমাবদ্ধ। নদীটি পুর্ব দিকে প্রবাহিত হয়ে সরাসরি দক্ষিণে বাঁক নিয়েছে। তারপর আঁকাবাঁকা পথে দেলদুয়ারের এলংজানি নদীতে গিয়ে মিশেছে। লৌহজং নদীর দৈর্ঘ্য প্রায় ৭৬ কিমি, প্রস্থ ৪০ মিটার এবং নদী অববাহিকার আয়তন ১০৪ বর্গ কিমি। কিন্তু এ নদীর প্রবাহ ধারা এখন থেমে গেছে একেবারেই। দখল হয়ে ক্রমে ক্রমে তার অবয়ব হারিয়েছে। এককালের খরস্রোতা লৌহজং নদী এখন মৃতপ্রায় । বৃষ্টির পানিসহ নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বন্ধ হওয়ায় শহওে তৈরি হচ্ছে জলাবদ্ধতা। ফলে দেখা দিচ্ছে জনজীবনে চরম দূর্ভোগ এবং পরিবেশ বিপর্যয়। নদীর দু’পাশে মাটি ভরাট করে বাড়ীঘর, দালানকোঠা নির্মাণ করায় আগের লৌহজং নদীকে এখন আর চেনার উপায় নেই। এককালের খুব খরস্রোতা লৌহজং প্রায় পানিশুন্য হয়ে মুমূর্ষ্যূ অবস্থায় ধুঁকছে। দখল রোধ আর প্রয়োজনীয় সংস্কার না করায় কালের পরিক্রমায় লৌহজং তার নাব্যতা হারিয়ে মরা খালে পরিণত হয়েছে। বর্ষাকালের ২/৩ মাস সামান্য পানির দেখা মিললেও অবশিষ্ট সময়ে লৌহজং পানি শুন্যতায় খাঁ খাঁ করে। আর ভূমিদস্যুরা এই সুযোগেই দু’পাশের মাটি ভরাট করে গড়ে তুলে বাড়ীঘর, দালানকোঠা। এক সময় যে নদীতে সারাক্ষণ চলাচল করতো বড় বড় নৌকা, লঞ্চ, স্টীমার সেই লৌহজংই এখন ময়লা আবর্জনার স্তুপে পরিণত হয়েছে, অস্তিত্ব বিলীনের অপেক্ষায় দিন গুণছে টাঙ্গাইল শহরের অন্যতম প্রাকৃতিক সম্পদ। শৈশব-কৈশরে যে নদীতে সাতার কেটে, মাছ ধরে মিলতো মহানন্দ, সেই নদীর পাশ দিয়ে এখন হেঁটে যেতে হয় নাকে রুমাল দিয়ে। লৌহজং নদী যেনো পঁচা নর্দমায় পরিণত হয়েছে। ফলে শহর ও শহরতলীর পরিবেশের মারাত্মক প্রভাব পড়েছে।

15178307_1293235724062124_5411785685679535875_n

প্রভাবশালী ভূমিদস্যুদের হাত থেকে লৌহজং যেনো কিছুতেই রক্ষা পায়নি। অবৈধভাবে দখল হলেও এতে কোন মাথাব্যাথা ছিল না সরকারী কোনো কর্তাব্যক্তির। ফলে আরো বেপরোয়া হয়ে উঠে ছিল দখলে মত্ত লোকেরা। কিন্তু টাঙ্গাইলের বর্তমান জেলা প্রশাসক মাহবুব হোসেনের আত্মিক প্রচেষ্টায় এবার লৌহজং দখলের হাত থেকে মুক্তি পেতে যাচ্ছে। লৌহজং উদ্ধারে জেলা প্রশাসকের আহ্বানে সাড়া দিয়েছে টাঙ্গাইলের মুক্তিযোদ্ধা, ছাত্র-শিক্ষক, সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবি, রাজনীতিকসহ আপামর জনতা। লৌহজং কে দখলমুক্ত করে প্রয়োজনীয় সংস্কারের মাধ্যমে তার হারানো যৌবন ফিরিয়ে দেয়ার শপথে বলিয়ান সকলেই।

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা দেশের সকল নদী ও খাল-বিলের রক্ষণাবেক্ষণ করা ও দখলমুক্ত করতে দৃঢ়ভাবে নিদের্শ দিয়েছেন। তাঁরই নির্দেশনার বাস্তবায়ন করতে টাঙ্গাইলের সুযোগ জেলা প্রশাসক মো: মাহবুব হোসেন লৌহজং নদী উদ্ধার করার সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রথমে তিনি টাঙ্গাইলের সকল শ্রেণী পেশার মানুষদের সাথে মতবিনিময় করেন ও সমর্থন প্রত্যাশা করেন।

বিভিন্ন সময় পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো নানা ব্যানারে লৌহজং দখলমুক্ত করার চেষ্টা করে আসলেও প্রশাসনের সহযোগিতার অভাবে তেমন কোন সফলতা পায়নি। জনাব মাহবুব হোসেন জেলা প্রশাসক হিসেবে যোগদান করার পরপরই লৌহজং উদ্ধারের ঘোষণা ব্যাপক আশার সঞ্চার করে পরিবেশবাদীদের মাঝে। ১০ সেপ্টেম্বর জেলা প্রশাসকের নেতৃত্বে নৌকাযোগে লৌহজং পরিদর্শনের মাধ্যমে শুরু হয় লৌহজং নদী উদ্ধারের অভিযান। অভিযানে একাত্মতা ঘোষণা করে জেলা প্রশাসকের সাথে থাকেন সাংসদ মোঃ ছানোয়ার হোসেন। এ সময় টাঙ্গাইল এর পুলিশ সুপার জনাব মাহবুব আলমসহ এলাকার বিভিন্ন স্তরের মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ লক্ষ্য করা যায়।

অত্যন্ত চৌকস প্রশাসক জনাব মাহবুব হোসেন এতো বড় একটি অভিযান পরিচালনায় জনগনের সম্পৃক্ততা বাড়াতে এবার শুরু করেন ক্যাম্পেইন। যুব সম্প্রদায়কে এই আন্দোলনে সম্পৃক্ত করতে গঠিত হয় অনলাইন ভিত্তিক টাঙ্গাইল সিটিজেন জার্নালিস্ট গ্রুপ। ব্যাপক প্রচারনা শুরু হয় ফেসবুকসহ জনপ্রিয় সব সোশ্যাল মিডিয়াতে। টাঙ্গাইল শহরের বিভিন্ন স্থানে ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে লৌহজং দখলমুক্তকরণ টাঙ্গাইলের আপামর জনগনের একটি প্রাণের দাবিতে পরিণত হয়। টাঙ্গাইলের সচেতন মহলকে তিনি এমনভাবে উদ্বুদ্ধ করে চলেছেন যে তারা নাওয়া খাওয়া বাদ দিয়ে সোশ্যাল মিডিয়া সহ নানাভাবে প্রচারণা চালিয়ে জনগণের সম্পৃক্ততা বাড়িয়ে চলেছেন। এখন তাদেও যেন একটাই স্বপ্ন, লৌহজং কে দখলমুক্ত করে ঘওে ফেরা। জনগনের সম্পদ উদ্ধাওে প্রশাসন কিভাবে জনগণকে যুক্ত করা যায়, জনমতকে কিভাবে শক্তিতে পরিণত করে শান্তিপূর্ণভাবে জনগণের সম্পদকে দখলমুক্ত করা যায় তাই যেন আমাদের শিক্ষা দিয়ে যাচ্ছেন আমাদেও জেলা প্রশাসক জনাব মাহবুব হোসেন। এর আগেও তিনি করটিয়ার কাটাখালি খাল দখলমুক্ত করেছেন। তিনি তাঁর কর্মগুণে ইতিমধ্যেই ঢাকা বিভাগের সেরা জেলা প্রশাসক ও অতি সম্প্রতি যুগ্ম-সচিব পদে পদোন্নতি পেয়েছেন।
কর্মপাগল ডিসি মাহবুব হোসেন ইতিমধ্যে টাঙ্গাইলের মানুষের মন কেড়ে নিয়েছেন। ডিসি লেককে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করে টাঙ্গাইলের সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিনোদন কেন্দ্রে পরিণত করেছেন। উম্মুক্ত করে দিয়েছেন সাধারণ মানুষের জন্য। বিভিন্ন সময় টাঙ্গাইলের নানা অনুষ্ঠানে জনসাধারণের সাথে মিশে গিয়ে নিজে মঞ্চে গান পরিবেশন করে নিজের জন ও গণমুখিতার প্রমাণ রেখে চলেছেন সবসময়।

লৌহজং নদী উদ্ধার আন্দোলন পূর্ণতা পেতে যাচ্ছে মঙ্গলবার সকাল নয়টা থেকে বেড়াডোমা খাল দখলমুক্ত ও সংস্কার কার্যক্রম শুরু করার মধ্য দিয়ে। জেলা প্রশাসক মাহবুব হোসেনের ডাকে একাত্মতা প্রকাশ করে টাঙ্গাইলের স্থানীয় এমপি, উপজেলা চেয়ারম্যান, পৌরসভা মেয়র, পুলিশ সুপার, বিভিন্ন দপ্তরের প্রশাসনিক কর্মকর্তা, বিভিন্ন দলের রাজনীতিক, ছাত্র শিক্ষক, কবি-সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবিসহ তরুণদল লৌহজং নদী উদ্ধারে অংশ নেবেন। টাঙ্গাইলবাসীর প্রাণের নদী লৌহজং এর নাব্যতা ফিরিয়ে আনার এমন প্রংসনীয় উদ্যোগের স্বাক্ষী হতে নদী উদ্ধারে অংশ নিয়েছেন বরিশাল, ময়মনসিংহ, জামালপুরসহ পাশ্ববর্তি বিভিন্ন জেলার উর্ধ্বতন প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও পরিবেশপ্রেমীগণ। আশা নয় দৃঢ় প্রত্যাশা করি, লৌহজং উদ্ধার কার্যক্রমে যে সামাজিক আন্দোলন সৃষ্টি হয়েছে, তা শতভাগ সফল হবে। লৌহজং ফিরে পাবে তার হারানো যৌবন।

সুস্থ নদী, সমৃদ্ধ দেশ। ছোট্ট এই কথাটির তাৎপর্য্য বুঝতে হয়তো টাঙ্গাইলবাসীর সময় লেগেছে অনেক। তবুও শেষমেষ স্বল্পমেয়াদী পরিকল্পনায় টাঙ্গাইলবাসীর প্রাণের নদী লৌহজং আবার তার নাব্যতা ফিরে পাবে। আবারও টাঙ্গাইলবাসী নদীর পাড়ে বসে বুকভরে বিশুদ্ধ শ্বাস নেবে। নতুন প্রজন্ম নদীর জলে জলকেলি খেলবে। কর্মসংস্থান হবে হাজারো দুস্থ মানুষের। জেলের জালে ধরা পড়বে টাটকা সুস্বাদু সব মাছ। ঘাটে ঘাটে নৌকা চলবে। লৌহজং হয়ে উঠবে টাঙ্গাইলবাসীর অন্যতম বিনোদনের স্থান। সারাদেশে প্রশংসনার হাওয়া বইবে। নদীকে উপলক্ষ্য করে কবি-সাহিত্যিকের খাতায় প্রাণ পাবে হাজারো কবিতা-গান। নদীপ্রেমি মানুষদের সাথে গড়ে উঠবে সখ্যতা।

লৌহজং নদী একজন জেলা প্রশাসক মাহবুব হোসেনের নয়। এ নদী আমাদের টাঙ্গাইলবাসীর। মাহবুব হোসেনের ডাকে সাড়া দিয়ে টাঙ্গাইলবাসী যে চেতনা ফিরে পেয়েছে আজ, সেই চেতনা যেনো জেগে থাকে সবসময়। সরকারী কর্মকর্তা মাহবুব হোসেন যেকোনো সময় চাকরীতে বদলি নিয়ে চলে যাবেন অন্য কোথাও, হয়তো অন্য কোনো মুমূর্ষ্যূ নদীকে প্রাণ ফিরিয়ে দিতে। কিন্তু আমাদের থাকতেই হবে। আমাদের জন্য, আমাদের ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য আমাদের জেগে থাকতে হবে। আমরা সামান্য ঝিমিয়ে গেলেই সুযোগ সন্ধানী নদীখেকো ভূমিদস্যূরা জেগে উঠবে পুণরায়। লৌহজং নদী উদ্ধারে যেসব স্লোগান, কবিতা, গান আমাদের অন্তরের জায়গা করে নিয়েছে, সেগুলো যেনো বাজতেই থাকে যুগ থেকে যুগান্তর। লৌহজং এর সাথে গড়ে উঠুক আমাদের সখ্যতা, সৃষ্টি হোক এক নতুন ইতিহাস, সুস্থ্য থাকুক লৌহজং, সমৃদ্ধ হোক আমাদের দেশ। লৌহজং এর পরশে বেড়ে উঠুক আমাদের নতুন প্রজন্ম। চেতনায়, মননে, স্মৃতিপটে, ভালোবাসায় টাঙ্গাইলবাসীর কাছে চিরভাস্মর হয়ে থাকুক প্রিয় জেলা প্রশাসক মাহবুব হোসেন।

লেখক :


প্রকাশক, টাঙ্গাইল বার্তা ২৪ ডটকম

প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, আলোকিত কালিহাতী

ফেসবুক মন্তব্য