ঢাকা বুধবার, নভেম্বর ২১, ২০১৮

Mountain View



রক্ত সংকটে হারাবে না কোনো প্রাণ

Print Friendly, PDF & Email

তিনি স্বপ্ন দেখেন- রক্ত সংকটে হারাবে না আর একটিও প্রাণ। ওজন সংকটে নিজে রক্ত দান করতে পারেন না। তবে পরোক্ষভাবে প্রতিদিন তিনি মুমূর্ষু রোগীদের সহযোগিতা করছেন রক্তের জোগান দিয়ে। গড়েছেন ‘ডোনেট ব্লাড বিডি ডটকম’ নামক একটি ওয়েবসাইট। একই নামে একটি কল সেন্টারও রয়েছে। যেখান থেকে বিনামূল্যে প্রতিদিন রক্তদাতা সংগ্রহ করে দেয়ার চেষ্টা করা হয়।

এই তরুণের নাম সুব্রত দেব শুভ। ১৯৮৫ সালে তিনি জন্মগ্রহণ করেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলায়। বেড়ে ওঠা তার সিলেট, চট্টগ্রাম এবং সব শেষে ঢাকায়। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে রক্ত দিতে গিয়ে ওজন সংকটে রক্ত দিতে পারেননি। তখন চিন্তা করেছিলেন প্রত্যক্ষভাবে কিছু করতে না পারলেও পরোক্ষভাবে মুমূর্ষু রোগীর উপকার কীভাবে করা যায়? সেই চিন্তা থেকেই গড়েছেন ওয়েবসাইট, ডোনেট ব্লাড বিডি কল সেন্টার এবং ‘রক্তদানের অপেক্ষায় বাংলাদেশ’ নামে ফেসবুক গ্রুপ।

সুব্রত দেব শুভর সঙ্গে রাইজিংবিডির কথা হলে তিনি জানান, ‘২০০৪-২০০৫ সালের ঘটনা। তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। বিশ্ববিদ্যালয়ে রক্তদানের এক ক্যাম্পেইনে গিয়েছিলাম। প্রথম রক্তদান, তাই আগ্রহের কমতি ছিল না। আমার রক্তে একজন মানুষের জীবন বাঁচবে- এই অনুভূতি প্রবল ছিল। কিন্তু দুঃখজনক ব্যাপার হলো, আমাকে ক্যাম্পেইনের দরজা দিয়ে ঢুকতেই দেয়া হলো না। আমার হালকা পাতলা শরীর থেকে রক্তদান সম্ভব নয় বলে জানিয়ে দিয়েছিল তারা। আমার রক্ত অন্য কাউকে সাহায্য করতে পারবে না- আমার অপরিপক্ক মন তা মেনে নিতে পারছিল না। পরে ভাবলাম, প্রত্যক্ষভাবে কিছু করতে না পারলেও পরোক্ষভাবে কিছু করতে পারি কিনা চেষ্টা করে দেখি। সে উদ্দেশ্যেই ২০১৩ সালের ২৪ জানুয়ারি উদ্বোধন করি বাংলাদেশের রক্তদাতাদের অনলাইন ডাটাবেস ডোনেট ব্লাড বিডি ডটকম (DonateBloodBD.com)।

বর্তমানে ওয়েবসাইটটিতে রয়েছে বিভিন্ন জেলার, বিভিন্ন রক্তের গ্রুপের রক্তদাতাদের তথ্য। রক্তদাতারা রক্তদানে ইচ্ছুক হলে এই ওয়েবসাইটে রেজিস্ট্রেশন করতে পারবেন। রক্তের প্রয়োজনে রোগীরা এই ওয়েবসাইট থেকে তথ্য নিয়ে রক্তদাতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারবেন। এভাবেই ২০১৩ সাল থেকে এই প্লাটফর্মটি হাজারো রোগীকে সাহায্য করছে এবং তৈরি করেছে রক্তদাতা সংগ্রহের নতুন নতুন স্বেচ্ছাসেবক।

রক্তের যোগানে ফেসবুক প্লাটফর্ম চালুর গল্পটা প্রসঙ্গে তিনি জানান, ‘অনলাইনে ফেসবুকের মাধ্যমে বিভিন্ন পরিচিত এবং অপরিচিত মানুষদের রক্তদানে উৎসাহিত করতে শুরু করলাম। মানুষের মাঝে সচেতনতা তৈরি হতে লাগলো। এভাবে একসময় অনুভব করলাম, রক্তদানের জন্য প্রচুর রক্তদাতা উন্মুখ হয়ে থাকেন। প্রতি ৪ মাস পর পর আমাকে নক দিতে থাকে রোগী খুঁজে দেয়ার জন্য। এই নতুন আইডিয়া থেকেই তৈরি করলাম নতুন একটি প্লাটফর্ম ‘রক্তদানের অপেক্ষায় বাংলাদেশ’ নামক ফেসবুক গ্রুপ। যে রক্তদাতারা রক্তদানে ইচ্ছুক এবং প্রস্তুত, তারা ফেসবুকে এই গ্রুপের ওয়ালে তথ্য জানিয়ে পোস্ট করেন এবং ভলান্টিয়াররা সবাই মিলে সেই রক্তদাতার জন্য রোগী খুঁজে দেই। এভাবে রক্তদানে প্রস্তুত রক্তদাতাদের সহজে খুঁজে পাওয়া সম্ভব হয়। ফলে মুমূর্ষু রোগীর জন্য রক্তদাতা খুঁজে নেয়া অনেকটাই সহজ হয়ে যায়।’

২০১৬ সালের ১৪ এপ্রিলে সুব্রত দেব শুভ প্রতিষ্ঠা করেন বাংলাদেশের প্রথম রক্তদানের কল সেন্টার ‘ডোনেট ব্লাড বিডি কল সেন্টার’। এখানের কিছু ডেডিকেটেড মানুষ বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলার রোগীর জন্য রক্তদাতা খুঁজে দিতে দিন-রাত কাজ করে যাচ্ছেন। প্রতিষ্ঠাতা এবং স্পন্সরদের খরচে পরিচালিত হচ্ছে এই কল সেন্টারটি। সুব্রত দেব প্রতিনিয়ত চেষ্টা করে যাচ্ছেন মানুষকে রক্তদানে উৎসাহিতকরারজন্য।এ জন্য রক্তদান নিয়ে তিনি একটি গান লিখেছেন এবং গেয়েছেন ও  গানটি রক্তদাতাদের মাঝে বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছে। এছাড়া রক্তদাতাদের প্রথম রক্তদানের অভিজ্ঞতা নিয়ে তিনি দুইটি ই-বুক প্রকাশ করেছেন- ‘এক ব্যাগ মানবতা’ এবং ‘৪৫০ মিলিলিটার স্মৃতি’।

বাংলাদেশে রক্ত সংকটের মূল কারণ হিসেবে তিনি দেখেন, মানুষের অসচেতনতা। তিনি বলেন, ‘যথাসময়ে পর্যাপ্ত পরিমাণ রক্ত সংগৃহীত না হবার মূল কারণ হলো, মানুষের মাঝে রক্ত দানের সম্পর্কে এখনো রয়েছে অনেক ভুল ধারণা এবং ভয়। অনেকে মনে করেন রক্তদান করলে স্বাস্থ্য খারাপ হয়ে যাবে, শরীর দুর্বল হয়ে যাবে, আবার অনেকে সুইয়ের ভয়ে রক্তদান করতে চান না। এই ভুল ধারণা দূর করে রক্তদানের সঠিক তথ্য, উপকারিতাগুলো তুলে ধরে সবাইকে সচেতন করতে হবে।

রক্তদাতাদের উৎসাহিত করতে এবং জনসচেতনতায় সবাইকে এগিয়ে আসতে তিনি আরো বলেন, ‘আমাদের ১৬ কোটি মানুষের দেশে বছরে মাত্র ৯ লাখ ব্যাগ রক্তের প্রয়োজন। কিন্তু এখনও যথাসময়ে পর্যাপ্ত পরিমাণ রক্তের অভাবে মৃত্যুর কোলে ঝরে পরে অসংখ্য রোগী। রক্তদানের উপকারিতা, যোগ্যতা এবং ভুল ধারণাগুলো মানুষকে বুঝিয়ে সচেতন করতে হবে। শুধু সচেতনতা সৃষ্টির মাধ্যমেই বাংলাদেশে রক্তের সমস্যার সমধান সম্ভব। যে যার অবস্থান থেকে এগিয়ে আসুন, নিজের পরিবার, আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব, প্রতিবেশী, পরিচিত শত শত মানুষের রক্তের গ্রুপ জেনে রাখুন, নোট করে রাখুন, হয়তো একদিন আপনার প্রিয় মানুষের রক্তের প্রয়োজনে আপনিই হতে পারবেন সবচেয়ে বড় রিসোর্স। আমরা যদি এগিয়ে আসি এবং আমাদের মাঝে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে পারি তাহলে বাংলদেশে থাকবে না আর কোনো রক্তসংকট এবং হারাবে না একটি প্রাণও।’

তথ্য সমুহঃ রাইজিংবিডি

ফেসবুক মন্তব্য