ঢাকা মঙ্গলবার, নভেম্বর ১৩, ২০১৮

Mountain View



মধুপুরের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে ডা. শুধাংশু মোহন সাহা

Print Friendly, PDF & Email
হারুন রশিদ , অতিথি লেখক: কেউ ইতিহাস পড়ে, কেউ ইতিহাস লিখে, আবার কেউ ইতিহাস গড়ে। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে টাঙ্গাইলের মধুপুর বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ একটি এলাকায় পরিণত হয়েছিল। এর প্রধান কারণ ভৌগোলিক অবস্থান। মধুপুরের অকুতোভয় বীর মুক্তিযোদ্ধারা যখন তুমুল লড়াই করছিল পাকসেনা ও তাদের দোসর আলবদর ও রাজাকারদের সাথে তখন দেশপ্রেমের চেতনায় উদ্ধুদ্ধ হয়ে দেশমাতৃকার জন্য সব ধর্ম-বর্ণ-শ্রেণি-পেশার মানুষ এগিয়ে এসেছিল বীর মুক্তিযোদ্ধাদেরকে সাহায্য ও সহযোগিতা করার জন্য। পাক বাহিনী মধুপুরে নির্মম হত্যাযজ্ঞ চালায় । 

ডা. শুধাংশু মোহন সাহা
বিশেষ করে মুক্তিযোদ্ধাদেরকে ধরে এনে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে মেরে ফেলে দিত বংশাই নদীতে। মধুপুর চাপড়ী নিবাসী ডাঃ শুধাংশু মোহন সাহা নদীতে ভেসে থাকা মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে যারা জীবিত থাকতেন তাদেরকে রাতের আঁধারে পরিবারের সদস্যদের সহযোগিতায় তুলে নিয়ে চিকিৎসা করে ভাল করে তুলতেন। তাঁর এই জীবন বাজি রেখে মহান আত্মত্যাগের কথা জেনে যায় আলবদর ও রাজাকার বাহিনী। 
১৯৭১সালের ১৫ই আগস্ট রবিবার ডাঃ শুধাংশু মোহন সাহাকে তুলে নিয়ে যায় আলবদর ও রাজাকাররা। ঘোড়ার চাবুক দিয়ে প্রচন্ড মারধর করা হয় তাঁকে। মধুপুরের দায়িত্বপ্রাপ্ত পাকিস্তান আর্মির মেজরের সাথে এক নেগোসিয়েশনের মাধ্যমে চুক্তি হয় “ডাঃ শুধাংশু মোহন সাহার সমপরিমাণ ওজনের টাকা পয়সা দেওয়া হলে তাঁকে ছাড়া হবে।” কিন্তু অত্যান্ত দুঃখের বিষয় তাঁর পরিবার ও চাপড়ি এলাকাবাসী স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে চুক্তি মোতাবেক টাকা সংগ্রহ করে ঐ কুখ্যাত পাক আর্মির মেজরকে দেওয়ার পর টাকাগুলো রেখে বিদায় করে দেন এই বলে যে “ভাগ এখান থেকে তা না হলে গুলি করে মারব।” সেদিন টাকাগুলো বহন করে নিয়ে গিয়েছিলেন তাঁর বড় ছেলে সুনীল কুমার সাহা ও চাপড়ির গণেশ দত্ত ও বলাই সাহা। তাঁরপর আর ডাঃ শুধাংশু মোহন সাহার বাড়ী ফিরে আসা হয়নি। স্বাধীনতার আজ ৪২ বছর বংশাই নদীতে নদীতে অনেক পানি গড়িয়েছে পরিবর্তন ঘটেছে অনেক কিছুর কিন্তু ডাঃ শুধাংশু মোহন সাহার যেমন আজও খোঁজ পাওয়া যায়নি তেমনি বিচার হয়নি সেইসব কুখ্যাত আলবদর রাজাকারদের।
ডাঃ শুধাংশু মোহন সাহার দুই ছেলেই ইতিমধ্যে মারা গেছেন। প্রথম ছেলের দুই সন্তান। আর দ্বিতীয় ছেলে মারা যান নিঃসন্তান হিসাবে। একমাত্র কন্যা থাকেন ভারতের কুচবিহারে। 
বিশিষ্ট সমাজসেবক ও চিকিৎসক ডাঃ শুধাংশু মোহন সাহা পাকিস্তান আমলে আউশনাড়া ইউনিয়নের নির্বাচিত মেম্বার ছিলেন। ১৯৬৭ সালে তিনি চাপড়ী গন উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠিত করেন।
মধুপুরের অনেকেই আমরা তাঁর এই সীমাহীন ত্যাগ তিতিক্ষা ও বিরোচিত আত্মত্যাগের ইতিহাস জানিনা আলোচনা হয়না বলেই প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম গেপ পড়ে যাচ্ছে। আমরা আশা করবো তাঁর অবদানের কথা ভেবে এমন কিছু করা হোক যেন তিনি আজীবন মধুপুর মানুষের মাঝে বেঁচে থাকেন। কারন তিনি ইতিহাস গড়েছেন।

উদয়ের পথে শুনি কার বাণী , 
‘ ভয় নাই , ওরে ভয় নাই — 
নিঃশেষে প্রাণ যে করিবে দান 
ক্ষয় নাই তার ক্ষয় নাই ।
(বানান রীতি লেখকের নিজস্ব )
লেখক:
হারুন রশিদ :  জাপান প্রবাসী, প্রতিষ্ঠাতা, মধুপুরবাসী ফেসবুক গ্রুপ

ফেসবুক মন্তব্য