ঢাকা রবিবার, সেপ্টেম্বর ২৩, ২০১৮

Mountain View



আজ ভূঞাপুরে গণহত্যা দিবস; আজও শিউরে উঠে ভূঞাপুরের ছাব্বিশা গ্রামের মানুষ

Print Friendly, PDF & Email
বিশেষ প্রতিনিধি : আজ ভূঞাপুরের ছাব্বিশা গণহত্যা দিবস। ১৯৭১ সালের ১৭ নভেম্বর গণহত্যার কথা মনে হলে আজও শিউরে উঠে ভূঞাপুরের ছাব্বিশা গ্রামের স্বজন হারা মানুষেরা। এই দিনে শিশু বেলাল হোসেনের সামনে পাকিস্তানী হানাদাররা গুলি করে ও বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করে তার বাবা, মা, দু’চাচা ও ১০ দিন বয়সের শিশু বোনকে। স্বজনদের লাশের আড়ালে লুকিয়ে শিশু বেলাল সেদিন নিজে রক্ষা পেয়েছিল।

সে যন্ত্রনা আজও বেলালকে তাড়িয়ে বেড়ায়। শুধু বেলাল হোসেন নয়, ভূঞাপুর উপজেলার ছাব্বিশা গ্রামের কেউ ভুলতে পারেননি সেদিনের সেই বর্বরতার কথা। স্বজন হারানোর বেদনায় আজও তাদের বুকফেটে যায়। পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী ও তাদের এদেশীয় দোসর রাজাকার-আলবদররা ছাব্বিশা গ্রামে বর্বর আক্রমণ চালিয়ে ৩৮জন নারী পুরুষ ও শিশুকে হত্যা করে। এতে আহত হয় অর্ধ শতাধিক। প্রায় সাড়ে ৩শ ঘর বাড়ী পুড়িয়ে দিয়ে সেদিন ছাব্বিশা গ্রামকে পরিণত করেছিল বিরান ভুমিতে। ভুঞাপুর উপজেলা সদর থেকে প্রায় দেড় কিলোমিটার দক্ষিন পশ্চিমে এ ছাব্বিশা গ্রামের আক্রমনের প্রত্যক্ষদর্শী ও আহত বিভিন্নজনের সাথে কথা বলে জানাযায়, ৭১ সালের ১০ আগস্ট মুক্তিবাহিনীরা ভুঞাপুরের সিরাজকান্দিতে ধলেশ্বরীর মোহনায় যমুনা নদীতে পাকহানাদার বাহিনীর অস্ত্র বোঝাই ‘এস ইউ ইঞ্জিনির্য়াস এলসি-৩’ এবং ‘এলটি রাজন’ নামক ২টি জাহাজ দখল করে বিপুল পরিমান অস্ত্র গোলাবারুদ উদ্ধার শেষে জাহাজ ২টি ধ্বংস করে দেয়। তারপর থেকেই ভূঞাপুরের যমুনা তীরবর্তী গ্রামগুলো পাকহানাদার বাহিনীর নজরে আসে। তবে মুক্তিযোদ্ধাদের কঠোর প্রতিরোধের কারণে বিভিন্ন সময় তারা আক্রমনের সুযোগ করে উঠতে পারেনি। 
জানা যায়, ৭১ সালের ১৭নভেম্বর কমান্ডার আব্দুল হাকিম, হাবিবুল হক খান বেনু, আসাদুজ্জামান আরজু ও খন্দকার হাবিবুর রহমানের নেতৃত্বে কাদেরিয়া বাহিনীর ৪ কোম্পানির যোদ্ধারা ছাব্বিশার পার্শবর্তী গাবসারার কালীগঞ্জ গ্রামে অবস্থান করছিল। মুক্তিযোদ্ধাদের এই অবস্থানের খবর জানতে পেরে সেদিন সকাল ১১টার দিকে সিরাজগঞ্জ হতে যমুনা নদী পার হয়ে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীরা ছাব্বিশার পশ্চিমের গ্রাম শালদাইর ব্রীজের কাছে অবস্থান নেয়। হানাদারদের অপর একটি দল অবস্থান নেয় ছাব্বিশা গ্রামের উত্তর পশ্চিম পাশে। শত্র“র বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়তে মুক্তিযোদ্ধারা গাবসারার কালিগঞ্জ থেকে ছাব্বিশা গ্রামের উত্তর পাশে অবস্থান নিয়ে আক্রমণ শুরু করে। এতে পাকবাহিনী আরও ক্ষিপ্ত হয়ে শুরু করে ভারি অন্ত্রের গোলাবর্ষণ। সারা দিন চলে গুলি বিনিময়। হানাদার বাহিনীর প্রচন্ড আক্রমনে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতিরোধ ব্যুহ ভেঙে যায়। মুক্তিযোদ্ধারা পিছু হটতে বাধ্য হয়। পাকবাহিনী ছব্বিশা গ্রামে প্রবেশ করে চালায় নারকীয় হত্যাযজ্ঞ। 
সেদিনের ছাব্বিশা গ্রামের পাক বাহিনীর গুলিতে আহত হয়ে বেঁচে যাওয়া সাহেব আলী জানান, বাড়ী বাড়ী ঢুকে রাজাকারদের সহযোগিতায় হানাদাররা ঘর থেকে টেনে হিচড়ে এনে নির্বিচারে হত্যা করে অনেককেই । তাদের হাত থেকে দুধের শিশুও রেহাই পায়নি। বাড়ীতে আগুন লাগিয়ে দিয়ে অনেকে নিরিহ মানুষকে হত্যা করে আগুনে নিক্ষেপ করেছে হানাদাররা। 
ছাব্বিশা গ্রামে গনহত্যায় শহীদ হয়েছিলেন ৩৮জন। তার মধ্যে ৩২ জনের নাম পাওয়া গেছে। এরা হচ্ছেন- বিশা মন্ডল, সমির উদ্দিন, ওমর আলী, সাজেদা বেগম, রাবেয়া খাতুন, খালেদা খাতুন, ইসমাইল হোসেন, মমতাজ উদ্দিন, সমশের আলী, ছমিরন নেছা, আয়নাল হক , হাফেজ উদ্দিন, দানেশ আলী, হাসেন আলী, তাসেন আলী, হায়দার আলী, সেকান্দর আলী, রমজান আলী, কুরবান আলী, মাহমুদ আলী, আবুল হোসেন, ইউসুফ আলী, শফিকুল ইসলাম, মোতালেব হোসেন, ইয়াকুব আলী, শুকুর মাহমুদ মন্ডল, বাহাজ উদ্দিন মন্ডল, আঃ গফুর, রাবেয়া খাতুন, জহির উদ্দিন, সোনাউল্লাহ, হোসনা খাতুন।
স্বাধীনতা বেদীতে এসব জীবন উৎসর্গকারী উজ্জ্বল নক্ষত্র শহীদদের স্মরণে ভূঞাপুর পৌরসভার উদ্যোগে ছাব্বিশা সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে একটি নাম ফলক উন্মোচণ করা হলেও শহীদদের কবরগুলো আজও পরে আছে আবহেলা-অযতেœ। যা এখন পর্যন্ত সরকারী ভাবে চিহ্নিত করা হয়নি। এ বিষয়ে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক মামুন তরফদার বলেন. ‘মহান স্বাধীনতায় জীবন উৎসর্গকারী শহীদদের কবরগুলো অবিলস্বে সরকারীভাবে সংরক্ষণ করা উচিত। এসব শহীদদের স্মৃতি ধরে রাখতে না পারলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম জানতে পারবে না স্বাধীনতার জন্য জাতি কতটুকু ত্যাগ স্বীকার করেছে।’

ফেসবুক মন্তব্য