ঢাকা শুক্রবার, মে ২৪, ২০১৯

Mountain View



ঈদের ছুটিতে ঘূরে আসুন জীববৈচিত্র্যে ভরপুর মধুপুর জাতীয় উদ্যান

Print Friendly, PDF & Email
ডেস্ক রিপোর্ট: জীববৈচিত্র্যে ভরপুর বাংলাদেশের অন্যতম একটি জাতীয় উদ্যান মধুপুর। রাজধানী থেকে প্রায় ১২৫ কিলোমিটার দূরে টাঙ্গাইল জেলার মধুপুর উপজেলায় জাতীয় এ উদ্যানটির অবস্থান। জেলা শহর টাঙ্গাইল থেকে এর দূরত্ব প্রায় ৪৭ কিলোমিটার। এ বনের প্রধান আকর্ষণ শালবন। খুব সহজেই ঢাকা থেকে দিনে দিনে ঘুরে আসতে পারেন এ বন থেকে। মধুপুর বনের প্রতিষ্ঠা কাল নিয়ে সঠিক কোনো তথ্য পাওয়া যায় না।

তবে ধারণা করা হয় কয়েক শ বছরের পুরোনো বন এটি। কখনও এটি ছিল রাজাদের আয়ত্তে, কখনোবা জমিদারদের দখলে। তবে এটি বন বিভাগের অধীনে আসে ১৯৬২ সালে। এরপরে ১৯৭৪ সালের বন্যপ্রাণী আইনের আওতায় মধুপুর বনকে জাতীয় উদ্যান হিসেবে ঘোষণা দেওয়া হয় ১৯৮২ সালে। এর আয়তন ৮৪৩৬৬ হেক্টর প্রায়। মধুপুর জাতীয় উদ্যানের দক্ষিণ পাশ দিয়ে বয়ে গেছে বংশী নদী। এ উদ্যানের ভেতরে ও আশপাশের প্রায় ১৮৭টি গ্রামে বসবাস করে গারো, কোচ, বামনসহ নানান আদিবাসী সম্প্রদায়ের মানুষের।

2013-02-13__nat01
মধুপুর জাতীয় উদ্যানে আছে ১১ প্রজাতির স্তন্যপায়ী, ৪ প্রজাতির উভচর, ৭ প্রজাতির সরীসৃপ, ৩৮ প্রজাতির পাখি ও কয়েক প্রজাতির উভচর প্রাণীর বসবাস। এ বনের বাসিন্দা স্তন্যপায়ী প্রাণীদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো মুখপোড়া হনুমান, চিত্রা হরিণ, মায়া হরিণ, লাল মুখ বানর, বন্য শুকর ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। বনে দেখতে পাওয়া পাখিদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো স্ট্রুর্ক বিলড কিংফিশার বা মেঘ হু মাছরাঙ্গা, খয়রা গেছো পেঁচা, কাঠ ময়ূর, বন মোরগ, মুরগি। এ বনের মধ্যখানে লহরিয়া বন বিট কার্যালয়ের কাছে হরিণ প্রজনন কেন্দ্রে আছে বেশ কিছু হরিণ। পাশেই সুউচ্চ একটি পর্যবেক্ষণ টাওয়ার আছে। এর চূড়ায় উঠলে বহুদূর পর্যন্ত বনের সৌন্দর্য উপভোগ করা যায়। এ জায়গাতেই সবচেয়ে বেশি হনুমানের দেখা মেলে। নানা গাছপালায় সমৃদ্ধ জাতীয় এ উদ্যান। এসবের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো শাল, বহেড়া, আমলকি, হলুদ, আমড়া, জিগা, ভাদি, অশ্বত্থ, বট, সর্পগন্ধা, শতমূলী, জায়না, বিধা, হারগোজা, বেহুলা ইত্যাদি। এ ছাড়া নানান প্রজাতির লতাগুল্ম আছে এ বনে।

মধুপুর উপজেলা সদর থেকে প্রায় ৫ কিলোমিটার দূরে রসুলপুর মাজার এলাকায় মহাসড়কের বাঁ পাশে মধুপুর জাতীয় উদ্যানের প্রধান প্রবেশ পথ। প্রবেশ পথেই আছে মধুপুর জাতীয় উদ্যান রেঞ্জ কার্যালয় ও সহকারী বন সংরক্ষকের কার্যালয়। বনে প্রবেশ করার অনুমতি নিতে হয় এ জায়গা থেকেই। জলই আর মহুয়া নামে দুটি বন বিশ্রামাগার আছে এখানে। উদ্যানের প্রবেশ পথ থেকে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার ভেতরে আছে দোখলা বন বিশ্রামাগার। এ পথে বনের সৌন্দর্যও চোখ ধাঁধানো। চারিদিকে শুধু সবুজ আর সবুজ। বনের ভেতরে এ পথে চলতে চলতে হঠাত্ দেখা হয়ে যেতে পারে কোনো বন্যপ্রাণীর সঙ্গে।

দোখলা বন বিশ্রামাগার ছাড়াও এখানে চুনিয়া আর বকুল নামে দুটি কটেজ আছে। এ ছাড়া আছে জুঁই আর চামেলি নামে বনবিভাগের দুটি পিকনিক স্পট। এখান থেকে কাছাকাছি দূরত্বে আছে আদিবাসীদের কয়েকটি গ্রাম।

রসুলপুর থেকে আরও প্রায় ৯ কিলোমিটার সামনে বনের আরেকটি প্রবেশপথ আছে। জায়গাটির নাম পঁচিশ মাইল। এখানে আছে দোখলা বন রেঞ্জ কার্যালয়। দোখলা বন বিশ্রামাগারটি এখানেই অবস্থিত। এখান থেকেও অনুমতি নিয়ে বনে প্রবেশ করা যায়। তবে দোখলা এলাকায় যেতে রসুলপুর থেকে বনের ভেতরের সড়ক ব্যবহার করাই উত্তম। কেননা এ পথে বনের সৌন্দর্য পুরোপুরি উপভোগ করা সম্ভব।

কীভাবে যাবেন : ঢাকা থেকে মধুপুর যাওয়ার একমাত্র মাধ্যম সড়কপথ। ঢাকার মহাখালি বাস স্টেশন থেকে বিনিময় ও শুভেচ্ছা পরিবহনের বাস চলে এ পথে। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত এ দুটি পরিবহন সংস্থার বাস চলাচল করে। ভাড়া ২৫০-৩০০ টাকা। শুভেচ্ছা পরিবহনের আরামদায়ক গাড়ি মহাখালি থেকে বিকাল ৫টায় ছেড়ে আসে। মোবাইল নাম্বার ০১৭২৯৭০২১৪০।
কোথায় থাকবেন : মধুপুর উপজেলা সদরে আদিত্য, সৈকত এবং ড্রিমটাচ নামের তিনটি আবাসিক হোটেল রয়েছে। হোটেল আদিত্যের এসি রুম ভাড়া প্রতিদিন এক হাজার টাকা। সিঙ্গেল ১৫০, ডাবল ২৫০ টাকা। মোবাইল-০১৯২৯১০৬৩৫০। সৈকতে সিঙ্গেল ১০০ টাকা, ডাবল ২০০ টাকা। মোবাইল-০১৭২০৯৫০২৯৯। ড্রিম টাচে সিঙ্গেল ১০০ টাকা, ডাবল ১৫০ টাকা। মোবাইল-০১৭১৭১৮৭৯৯। এখানেই আছে মৌচাক এবং সুনীল হোটেলে রুচিসম্মত খাবার হোটেল। অগ্রীম বুকিং দিয়ে জেলা পরিষদের ডাকবাংলো ফোন ০৯২১-৬২৮৮৪, ধনবাড়ি নবাব প্যালেস বাংলো (এসি/ ননএসি) মোবাইল-০১৭৬৮৭৩৭২১৪, কাকরাইদ বিএডিসির বাংলো (এসি/ ননএসি) মোবাইল- ০১৭১৩০২৭৮৮৯ নাম্বারে যোগাযোগ করে আসতে পারেন। জঙ্গলে রাত যাপন করতে হলে টাঙ্গাইল বিভাগীয় বন অফিসের ০৯২১-৬৩৫২৪ নাম্বারে বুকিং দিতে হবে। ভিআইপি দোখলা বাংলো নভেম্বর হতে মার্চ পিক সিজনে তিন হাজার ৩শ। অফসিজনে ১ হাজার ৬৫০ টাকা। চুনিয়া কটেজ পিক সিজনে ২ হাজার ২শ। অফসিজনে ১ হাজার ১শ টাকা। জলই, মহুয়া, জুই ও চামেলি কটেজ পিক সিজনে ৬শ, অফসিজনে ৩শ টাকা।

কোথায় কি দেখবেনঃমধুপুর সদর থেকে নিজস্ব গাড়িতে কিংবা সিএনজি, ইজিবাইক বা রেন্ট এ কার ভাড়া করে ভ্রমণে যেতে পারেন। মধুপুর থেকে গহীন জঙ্গলে ইট বিছানো সর্পিল পথ ধরে যেতে হবে রসুলপুর। সেখান থেকে পাঁচ কি.মি দূরেই দোখলা পিকনিক স্পট। জলে ঢাকা বাইদের (দুই পাহাড়ের মাঝখানের নিচু জলাভূমি) এপারে দোখলা রেস্ট হাউজ। ওপারে চুনিয়া কটেজ। এই দোখলা রেস্ট হাউজে বসেই বাংলাদেশের সংবিধান তৈরি করা হয়েছিল। এই রেস্ট হাউজের পূর্বপাশ জুড়ে তেঁতুল আর আমলকির বন। দখিনের সড়ক গেছে রাবার বাগান অবধি। পিকনিক স্পটের খোলা চত্বরে সাইডভিউ টাওয়ার। একটু এগুলেই গারো পল্লী। এই পল্লীর ঘরবাড়ি একেবারে ঝকঝকে তকতকে। আঙ্গিনায় হরেক প্রজাতির ফুলফলের বাগান। কাছেই পীরগাছা ক্রাইস্ট মিশন ও গীর্জা। গারো কালচারাল সেন্টার ও আদিবাসি পোশাক বিক্রয় কেন্দ্র। পাশেই মিশন স্কুল। জলজ উদ্ভিদে ভরা সুদৃশ্য বাইদ, আকাশ ছোঁয়া গজারির সারি, সুমিষ্ট আনারস ও কাঁঠাল বাগান, সবুজ অরণ্যানির আড়ালে ছিমছাম গারো বাড়ি। মিশন থেকে আরো ৫ কি.মি পাহাড়ি আঁকাবাঁকা রাস্তা পেরুলে শোলাকুড়ি গ্রামের সুলতানী আমলের সামন্ত রাজা ভগবত্ দত্তের বিশাল দীঘি। দেড় হাজার একরের বিশাল দীঘির পাড়ে সনাতন ধর্মাবলম্বিদের প্রাচীন মন্দির। বৈশাখের পূর্ণিমায় সেখানে শিব পূজা ও রাসমেলা বসে।এখানে আছে সাত হাজার একরের সরকারি রাবার বাগান। খুব ভোর থেকেই শ্রমিকরা গাছের বাকল কেটে সংগ্রহ করে কাঁচা রাবার। সংগৃহিত কাঁচা রাবার কারখানায় জমিয়ে ধুঁম ঘরে নিয়ে প্রসেস করা হয়। সন্তোষপুর রাবার বাগানে যেতে পড়বে বিএডিসির সুদৃশ্য কাকরাইদ ক্যাম্পাস। একশ’ গজ সামনেই জয়তেঁতুল গ্রামের পাহাড়ি ঝরনা। কয়েক কি.মি সামনেই ইতিহাস প্রসিদ্ধ সাগরদীঘি। শতাব্দী প্রাচীন হিজলতলা মন্দির। কাকরাইদ থেকে ময়মনসিংহ সড়ক ধরে এগুলে বন গবেষণা কেন্দ্রের ভেষজ উদ্যান, বৈষ্ণবদের আড়াইশ বছরের ঐতিহ্যবাহী সনাতন মন্দির, জলছত্র ক্রাইস্ট মিশন, বেলজিয়ামের অনুদানে নির্মিত বৃহত্তম কুষ্ঠ ব্যাধি হাসপাতাল, কারিতাস সিল্ক ফ্যাক্টরি ও শোরুম। আরো সামনে রসুলপুর বিমান বাহিনীর ফায়ারিং রেঞ্জের সুদৃশ্য চত্বর ও হযরত জয়েনশাহী পীরের মাজার। মধুপুরে এলে ধনবাড়ি নওয়াব প্রাসাদ দেখতে ভুলবেন না। নবাবদের ব্যবহূত পোশাক, তৈজশপত্র, কুশন, খাটপালঙ্ক ও যুদ্ধাস্ত্র নিয়ে গড়ে উঠেছে যাদুঘর। আছে পারস্য স্থাপত্য রীতির চারশ বছরের ঐতিহ্যবাহী বাদশাহী মসজিদ।
বন ভ্রমণে কী করবেন : জঙ্গলে ভ্রমণে সবসময় হালকা কাপড় ও জুতা এবং কেমোফ্লাজ রঙের কাপড় পরিধান করবেন। রোদ চশমা, রোদ টুপি, ছাতা, পানির বোতল সঙ্গে নেবেন। বর্ষায় ভ্রমণে গেলে অবশ্যই রেইনকোট কিংবা পঞ্চ সঙ্গে নিন। পোকা মাকড় ও মশার হাত থেকে বাঁচতে পতঙ্গনাশক ক্রিম সঙ্গে নিন। জোঁকের হাত থেকে বাঁচতে মোজার মধ্যে প্যান্ট গুঁজে নিন। দূরের বন্যপ্রাণী ও পাখি দেখতে দূরবিন নিতে পারেন। জঙ্গলে ভ্রমণকালীন সর্বোচ্চ নীরবতা অবলম্বন কক্ষন করুন। প্লাস্টিক জাতীয় প্যাকেট, বোতল, ক্যান সঙ্গে এনে বাইরো কোথাও ফেলুন।
কী করবেন না : পিকনিক করতে জঙ্গলে যাবেন না। ভ্রমণে উচ্চ শব্দে মাইকে গান কিংবা কোনো কিছু বাজাবেন না। বন্যপ্রাণীরা বিরক্ত হয় এমন কোনো শব্দ কিংবা আওয়াজ করবেন না। ময়লা, প্লাস্টিক জাতীয় কোনো কিছু জঙ্গলে ফেলবেন না। বনে ধূমপান করবেন না। লেখা সুত্র: ভালো খবর ও দৈনিক ইত্তেফাক, ছবি সুত্র: মধুপুর বাংলাদেশ ব্লগস্পট.ডকম

ফেসবুক মন্তব্য