ঢাকা শুক্রবার, মে ২৪, ২০১৯

Mountain View



কালের আবর্তে হারিয়ে যাচ্ছে বাবুই পাখি

Print Friendly, PDF & Email
মাকসুদা রহমান স্বর্ণা : ‘বাবুই পাখিরে ডাকি বলিছে চড়াই, কুঁড়েঘরে থেকে কর শিল্পের বড়াই, আমি থাকি মহাসুখে অট্টালিকা পরে, তুমি কত কষ্ট পাও রোদ-বৃষ্টি ঝড়ে, বাবুই হাসিয়া কহে সন্দেহ কি তায় কষ্ট পাই তবু থাকি নিজের বাসায়।’ এটি রজনীকান্ত সেনের বিখ্যাত ‘স্বাধীনতার সুখ’ কবিতার চিরচেনা কয়েকটি লাইন। শহরের ইংরেজি মাধ্যমে পড়ুয়া শিশুদের কাছে কবিতাটি অপরিচিত লাগলেও বাংলা মাধ্যমে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের মুখে মুখে আজো ফেরে কবিতাটি। কিন্তু কবিতার চিরচেনা বাবুই পাখির স্বাধীনতা আর সুখ দুই-ই আজ হুমকির মুখে।

গ্রামবাংলায় এখন আর আগের মতো বাবুই পাখির দৃষ্টিনন্দন বাসা চোখে পড়ে না। আগে টাঙ্গাইল জেলার বিভিন্ন এলাকায় বেশ দেখা যেত বাবুই পাখির বাসা। শুধু টাঙ্গাইল নয়, দেশের প্রতিটা গ্রামেই দেখা মিলতো গ্রামবাংলার শৈল্পিক কারিগর এ বাবুই পাখির। এখন আর সারিবদ্ধ একহারা তালগাছের পাতায় ঝুলতে দেখা যায় না তাদের শৈল্পিক বাসা। কিচিরমিচির শব্দে মুখর হয় না গ্রামবাংলার জনপদ।
সময়ের বিবর্তনে ও পরিবেশ বিপর্যয়ের কারণে আজ এ পাখিটি আজ প্রায় বিলুপ্ত হতে চলেছে। সেই সাথে হারিয়ে যাচ্ছে শিল্পী, স্থপতি এবং সামাজিক বন্ধনের কারিগর বাবুই পাখি ও তার বাসা। খড়, তালগাছের কচিপাতা, ঝাউ ও কাশবনের লতাপাতা দিয়ে উঁচু তালগাছে চমৎকার বাসা তৈরি করত বাবুই পাখি। সেই বাসা দেখতে যেমন আকর্ষণীয় তেমনি মজবুত।
প্রবল ঝড়েও তাদের বাসা ভেঙ্গে পড়ে না। বাবুই পাখির শক্ত বুননের এ বাসা টেনেও ছেঁড়া যায় না। তালগাছের সঙ্গে যথার্থ সহবাস। -বাবুই পাখিকে অনেকে তাঁতিপাখিও বলেন। এ পাখির বাসা মানুষের মানবিক ও সৌন্দর্যবোধকে জাগ্রত করার পাশাপাশি দেয় স্বাবলম্বী হওয়ার অনুপ্রেরণা। বাসা বানানোর জন্য বাবুই খুব পরিশ্রম করে। ঠোঁট দিয়ে ঘাসের আস্তরণ ছড়ায়। পেট দিয়ে ঘষে গোল অবয়ব মৃসণ করে। শুরুতে দুটি নিম্নমুখী গর্ত থাকে। পরে একদিকে বন্ধ করে ডিম রাখার জায়গা হয়। অন্যদিকে লম্বা করে প্রবেশ ও প্রশস্ত পথ তৈরি করে।  বাসাগুলো বাতাসে দোলনার মত দোলে । তখন খুব সুন্দর দেখায় ।বাবুই পাখি এত সুন্দর করে বাসা তৈরী করলেও তারা বাসার ভিতরে বিশ্রাম কিংবা ঘুমায় না । তারা সব সময় বাসার দরজায় বসে থাকে । প্রবাদ রয়েছে ভিতরে ঘুমালে কেউ তাদের বাসা হয়তো ভেঙ্গে দিতে পারে ।এই কারনে বাসার মুখে পাহারায় বসে তারা ঘুমায় কিংবা বিশ্রাম নেয় ।প্রতি বাসায় স্ত্রী ও পুরুষ দুইজন পাখি থাকে । একজন ঘুমালে কিংবা বিশ্রাম করতে গেলে অন্যজন দরজার মুখে বসে পাহারায় থাকে ।বাবুই পাখি ও মানুষের মত দল ও সমাজবদ্ধভাবে বসবাস করে। এক গাছে কিংবা পাশাপাশি গাছে তারা বাসা তৈরী করে বাস করে । আবার দুইটি পাখি একসাখে বাসা ছেড়ে বের হয়ে যায় না । কেউ বাসার ক্ষতি করতে পারে এই ভয়ে ।

বাবুই পাখির অপূর্ব শিল্পশৈলীতে বিষ্মিত হয়ে কবি রজনীকান্ত সেন তার কবিতায় লিখেছিলেন, ‘বাবুই পাখিরে ডাকি বলিছে চড়াই, কুঁড়েঘরে থেকে কর শিল্পের বড়াই।’ বাবুই পাখি বাসা তৈরির পর সঙ্গী খুঁজতে যায় অন্য বাসায়। সঙ্গী পছন্দ হলে স্ত্রী বাবুইকে সাথী বানানোর জন্য কতই কিছু না করে এরা। 


পুরুষ বাবুই নিজেকে আকর্ষন করার জন্য খাল- বিল ও ডোবায় ফুর্তিতে নেচে নেচে বেড়ায় গাছের ডালে ডালে। বাসা তৈরি কাজ অর্ধেক হলে কাংখিত স্ত্রী বাবুইকে সেই বাসা দেখায়। বাসা পছন্দ হলেই কেবল সম্পর্ক গড়ে। স্ত্রী বাবুই পাখির বাসা পছন্দ হলে বাকি কাজ শেষ করতে পুরুষ বাবুইয়ের সময় লাগে চারদিন। স্ত্রী বাবুই পাখির প্রেরণা পেয়ে পুরুষ বাবুই মনের আনন্দে শিল্পসম্মত ও নিপুণভাবে বিরামহীন কাজ করে বাসা তৈরি করে। অফুরন্ত যৌবনের অধিকারী প্রেমিক যত প্রেমই থাক প্রেমিকার জন্য, প্রেমিকার ডিম দেয়ার সাথে সাথেই প্রেমিক বাবুই খুঁজতে থাকে আরেক প্রেমিকা। পুরুষ বাবুই এক মৌসুমে ৬টি বাসা তৈরি করতে পারে।
ধান ঘরে উঠার মৌসুম হলো বাবুই পাখির প্রজনন সময়। দুধ ধান সংগ্রহ করে স্ত্রী বাবুই বাচ্চাদের খাওয়ায়। এরা তালগাছেই বাসা বাঁধে বেশি। সঙ্গত কারণেই বাবুই পাখি তালগাছ ছেড়ে ভিন্ন গাছে বাসা বাঁধছে। একসময় প্রায় সবখানেই দেখা যেত শত শত বাবুই পাখির বাসা। 
গ্রাম বাংলার মাঠের ধারে, পুকুর কিংবা মাঠের পাড়ে সৈনিকের মতো একপায়ে দাঁড়িয়ে থাকা তালগাছ হারিয়ে গেছে ইটভাটার আগ্রাসনে। তেমনি হারাতে বসেছে প্রকৃতির শিল্পী পাখির ভোরবেলার কিচিরমিচির সুমধুর ডাকাডাকি আর উড়াউড়ি। এছাড়া এক শ্রেণির মানুষ অর্থের লোভে বাবুই পাখির বাসা সংগ্রহ করে শহরে ধনীদের নিকট বিক্রি করছে। এই বাবুই পাখির বাসাগুলো শোভা পাচ্ছে ধনীদের ড্রইং রুমে।

লেখক: ফিচার লেখক, টাঙ্গাইল বার্তা।

ফেসবুক মন্তব্য