ঢাকা মঙ্গলবার, মার্চ ২৬, ২০১৯

Mountain View



গোলাপ কি কেবলই ফুল ?

Print Friendly, PDF & Email

আপনি জানেন কি এই মুহূর্তে সমগ্র পৃথিবীজুড়ে কোন ফুলটির চাহিদা সবচাইতে বেশি?
বলতে পারছেন না? আচ্ছা আপনার প্রিয়জনদের জিজ্ঞেস করুন তো তাদের প্রিয় ফুল কি?
এবারেও না? আরেকটু সোজা করে দেই! যে কোন শিশুকে তার প্রিয় পাঁচটি ফুলের নাম লিখতে বলুন তো!

saffo

গ্রীসের গীতিকবি সাফো

উপরের সবকটি ক্ষেত্রে যে ফুলটির কথা সবচাইতে বেশি আসবে, সে আর কেউ নয়, গোলাপ। গোলাপ কেবল একটি ফুলের নাম নয়, গোলাপ একটি ইতিহাস। ‘ফুলের রানী’ হিসেবে গোলাপের প্রথম অভিষেক ঘটেছিল গ্রীসের গীতিকবি সাফোর (খ্রিস্টপূর্ব ৬১০-৫৮০) বন্দনায়। সক্রেটিসেরও আগে বসবাস করে যাওয়া, লিরিকের জননী সাফো গোলাপকে বলেছিলেন ‘ইন্দ্রিয়বিমুগ্ধকারী সুধা’ শুধু সাফোর লিরিকেই নয়, গোলাপ গোটা মানবসভ্যতার ইতিহাসে এমনকি পৌরাণিক দুনিয়ায় সর্বাধিক উল্লেখিত ফুল হিসেবে জায়গা করে নিয়েছে।
কথিত আছে, গোলাপ প্রথম জন্মানো হয়েছিল খ্রিস্টপূর্ব ৫৭৫ অব্দে, ইউফ্রেটিসের তীরে ব্যাবিলনের ঝুলন্ত উদ্যানে। ব্যাবিলনের রাজা বাখত নাসর (Nebuchadnezzar) তার পর্বতনন্দিনী স্ত্রীকে উৎসর্গ করে এই ফুলের বাগান রচনা করেন। ফসিল পরীক্ষায় পাওয়া গেছে, মেসোপটেমিয়াতেও গোলাপ জন্মাতো এবং নানা কাজে ব্যবহৃত হত। এমনকি মানব সভ্যতার সবচাইতে প্রাচীন লিপি ‘কিউনিফর্ম’এও ‘amurdinnu’ শব্দটির উল্লেখ পাওয়া যায় যার অর্থ হচ্ছে বুনো গোলাপ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, গোলাপের সর্বাধিক ব্যবহার ছিল গ্রীক জগতে। হোমারের ইলিয়াডে বলা হয়েছে, ট্রয়ের যুদ্ধে আঘাতে আঘাতে জর্জরিত হেক্টরের সর্বাঙ্গে গোলাপের নির্যাস লাগিয়ে দিয়েছিলেন স্বয়ং দেবী আফ্রোদিতি। গোলাপের সঙ্গে সবচে বেশি সখ্যতা বোধ করি তারই। অবশ্য তার সৃষ্টি প্রক্রিয়ার মাঝেই গোলাপের জন্ম।

8e9jxfn

আফ্রোদিতির পদস্পর্শে জন্ম নিলো গোলাপ

16-War-of-the-Roses-450x225

‘ওয়ার অব রোজেস’ এর দুই প্রতীক

গ্রীক পুরাণ অনুযায়ী, প্রেমের দেবী আফ্রোদিতি যখন সমুদ্রের ফেনা থেকে উত্থিত হন,তখন মর্ত্যের মাটিতে তার পদচারণায় ফুটে ওঠে সাদা গোলাপ। আরেক কাহিনী বলে, তিনি যখন ছুটে গিয়েছিলেন প্রেমিক আডোনিসকে বাঁচাতে, গোলাপ কাঁটায় লেগে তার পা থেকে রক্ত ঝরতে থাকে। সেই রক্তবিন্দু ধারণ করে সাদা গোলাপ হয়ে ওঠে লাল। তাই গোলাপ ই একমাত্র ফুল যেটি একই সাথে পবিত্র, প্লেটোনিক এবং যৌন আবেগমথিত রিয়ালিস্টিক ভালবাসাকে ধারণ করে। ভালবাসার তীরন্দাজ কিউপিডের মাথায়ও দেখা যায় গোলাপের মুকুট।  এপিকিউরিয়ানিজমের জনক গ্রীক দার্শনিক এপিকিউরাস একটি নিজস্ব গোলাপ বাগান করেছিলেন,যেখানে তিনি তার শিষ্যদের দিতেন সর্বোচ্চ আনন্দলাভের পাঠ।
গ্রীসের মতই রোমান জগতেও ছিল গোলাপের জয়জয়কার। অতিথিদের পুষ্পবৃষ্টি দিয়ে বরণ করার রীতি প্রথম চালু করেছিলেন রোম সম্রাট নিরো। আর সেই বৃষ্টি ছিল শুধুই গোলাপের। শুধু আনন্দের উপলক্ষ্যেই নয়, রোমানরা গোলাপ ব্যবহার করত শবানুগমনে, এমনকি সমাধিতেও। রোমানদের কাছে গোলাপ তার সৌন্দর্য, ক্ষয়িষ্ণুতা এবং পবিত্রতার জন্য যথাক্রমে জীবন, মৃত্যু এবং অমরত্বের প্রতীক।
বলা হয়, মিশরে গোলাপের ব্যবহার শুরু হয়েছিল রোমানদেরও আগে। ইতিহাস বলে, মার্ক অ্যান্থনিকে স্বাগত জানাতে সুন্দরীশ্রেষ্ঠা রানী ক্লিওপেট্রা তার প্রাসাদের মেঝে দুই ফুট ঢেকে দিয়েছিলেন গোলাপে। রানীর এমন অভিবাদনে মার্ক বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গিয়েছিলেন। এছাড়াও দ্বিতীয় ও তৃতীয় শতাব্দীর মিশরীয় সমাধিগুলোতেও পাওয়া যায় গোলাপের উপস্থিতি।
নীলনদের তীরে আদ্যিকালের গোলাপের আরো অনেক অজানা ব্যবহার শুধু মানুষকে অবাকই করেনি, রহস্যেরও জন্ম দিয়েছে। এমন একটি রহস্যময় প্যাপিরাস পাওয়া গিয়েছিল যাতে আগুনের উপস্থিতিতে গোলাপের তৈরি এক বিশেষ মলমের কথা বলা হয়েছিল, যা দিয়ে একজন নারীকে পুরুষে রুপান্তরিত করা সম্ভব!
পারস্যে গোলাপ ছিল মরমীবাদের প্রতীক। সুফী সাধকরা তাদের কবিতায় ঈশ্বরের নৈকট্য লাভের আকাংক্ষাকে বিভিন্ন প্রতীকে প্রতীকায়িত করতেন,কারণ সমকালীন গোঁড়া সমাজব্যবস্থা তাদের বিশ্বাসকে স্বীকৃতি দিতে চাইতনা। তাদের কবিতায় গোলাপ ছিল ঈশ্বরের মাঝে ডুবে যাওয়া বা ‘ফানা ফিল্লাহ’এর প্রতীক।
ইংল্যান্ডের সমাজ ব্যবস্থায় গোলাপ তার ধর্মীয় খোলস ছেড়ে অনেকটা ধর্মনিরপেক্ষ প্রতীক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। কিন্তু ভালবাসার প্রতীক গোলাপ হয়ে ওঠে কদর্য রাজতন্ত্রের অংশ। সপ্তম হেনরীর রাজত্বকালে ইংল্যান্ডে ‘ওয়ার অভ রোজেস’ সংঘটিত হয়, যেখানে ‘হাউজ অভ ইয়র্ক’ ধারণ করে সাদা গোলাপের ব্যাজ,অন্যদিকে ‘হাউজ অভ ল্যাঙ্কাস্টার’ গ্রহন করে লাল। রক্তক্ষয়ী এই যুদ্ধ চলেছিল প্রায় ত্রিশ বছর ধরে। বলাবাহুল্য ক্ষমতার লড়াই শুভ কিছু বয়ে আনেনি।
এভাবে যুগ যুগ ধরে অগনিত মানুষের ভালবাসা এবং রক্তক্ষয়ের সাক্ষী হয়ে স্বমহিমায় টিকে আছে ফুলের রানী গোলাপ,তার সৌরভ বিলিয়ে চলেছে অকাতরে।

ফেসবুক মন্তব্য