ঢাকা বৃহস্পতিবার, নভেম্বর ১৫, ২০১৮

Mountain View



ভিক্ষায় নয় শ্রমে বিশ্বাসী; ভিক্ষাবৃত্তিকে এখন ঘৃণা করি

Print Friendly, PDF & Email

আমানত হোসাইন মাসুম, সখীপুর প্রতিনিধি: ৫ বছর আগেও ক্র্যাচে (ভরকরে চলার লাঠি) ভরকরা এক পায়ে দাঁড়ানো প্রতিবন্ধী রফিকের কাঁধে থাকতো ভিক্ষার ঝুঁলি আর মনের গভীরে দুশ্চিন্তার পাহাড়। কোথায় গেলে পেট পুরে খেতে পাবো আর পরিজনদেরই বা কি খাওয়াবো। নিজ গ্রাম কচুয়া ছেড়ে কখনো রাজধানী ঢাকা, ময়মনসিংহ, জামালপুর, গাজীপুর, কালিয়াকৈর কিংবা অন্য কোনো অজানা গন্তব্যে। জীবন জীবিকার তাগিদে তাইতো ইচ্ছার বিরুদ্ধে হলেও তাকে বেড়িয়ে পড়তে হত। এ বেড়িয়ে পড়া তার কোনো মহৎ পেশা নয়। এ পেশা হল ভিক্ষাবৃত্তি!

মানুষের কাছে দু’হাত পাতা। এ পেশায় কতইবা আয় রোজগার। এ বয়সে ভিক্ষা করছ কেন; কাজ করে খেতে পার না! অনেকের এমন গালমন্দও কম শুনতে হয়নি প্রতিবন্ধী রফিককে। অনেকে নিরাশ করলে তবুও নিয়তির কাছে দীর্ঘশ্বাস ফেলেও তাকে সে পেশার রোজগারেই পরিজন নিয়ে জীবন ধারণ করা ছাড়া আর কোনো গত্যন্তর ছিলো কী! নইলে বাড়িতে বৃদ্ধ বাবা-মা যে উপোস থাকবে। মনের ক্ষোভে দুঃখ নিয়েই তবুও তার সংগ্রামী পথ চলা।

টাঙ্গাইলের সখীপুর উপজেলার কচুয়া গ্রামের বৃদ্ধ আবুল হোসের ছেলে রফিকুল ইসলাম (৩৭)। রফিকের ডান পা জন্মগতভাবেই প্রতিবন্ধী। প্রতিবন্ধী হওয়ায় এক পা দিয়ে হাটা-চলা করতে পারে না। ক্র্যাচে ভর করে চলাচল করতে হয়। অনেকে তাকে ‘ল্যাংড়া’ বলে ডাকলেও তার এখন কষ্ট হয় না। তবে কেউ তাকে ভিক্ষুক বলে ডাকলে ভীষণ কষ্ট পায়। এ কষ্ট কিভাবে দুর করা যায় এ ভাবনা তার মনের গভীরে নিরন্তর থাকে। প্রতিবন্ধী হয়েছি তাতে কি! আমিও এগিয়ে যাবো ভালো কোনো পেশায় এটি মনের কোণে লালন করা প্রতিবন্ধী রফিক ‘ভিক্ষাভিত্তি’ কে ‘থোড়াই কেয়ার’ করে।

প্রথমে এক পায়ে তিন চাকার রিকশা চালানো শুরু করেন। কিন্তু এক পায়ে রিকশা চালানো তার কাছে একটু কষ্ট সাধ্য মনে হয়। এর পরের সংগ্রাম অনেক করুণ। ঝুঁকিপূর্ণ তিনচাকার সিএনজি চালিত অটো রিকশা চালিয়ে পাঁচ জনের সংসারের চাকা সচল রাখেন প্রতিবন্ধী রফিক। জীবন আর অটো রিকশার চাকা ঘুরাচ্ছেন প্রতিবন্ধী এক পায়ে এভাবেই চলছে অবিরাম ৫ বছর। রফিকরা ৫ ভাই-বোনের মধ্যে সে সবার বড়। বোন বিবাহিত আর অন্য ভাইয়েরা পৃথক।

প্রতিবন্ধী রফিকের সাথে টাঙ্গাইল বার্তার এ প্রতিবেদকের কথা হয় উপজেলার কচুয়া বাজারে। এক পা দিয়ে অটো রিকশা চালাতে অসুবিধা হয় কিনা এমন প্রশ্নের উত্তরে সে জানায়, অসুবিধা হলেও এক পা দিয়েই দু’পায়ের কাজ করতে হয় তার। নিত্য অভাবে তাড়া করা প্রতিবন্ধী রফিকের জমি-জমা বলতে বসতভিটা ছাড়া আর কিছু নেই। বৃদ্ধ বাবা-মা, স্ত্রী-সন্তান যেন অভুক্ত না থাকে তাই তাকে এক পা নিয়েই ঝুঁকিপূর্ণ অটো রিকশা চালাতে বেরোতে হয়। সে ভাড়া নিয়ে অটো রিকশা চালায়। প্রতিদিন তাকে ৫শ টাকা জমা দিয়ে যা আয় থাকে তা নিয়ে সংসারের চাহিদা মেটাতে হয়। অসুস্থ বাবাকে নিয়মিত ওষুধপত্র কিনে দিতে হয়। মেয়ে স্থানীয় লিটল ফাওয়ার প্রি-ক্যাডেট স্কুলে কাস ওয়ানে পড়ে। টানা পড়েন সংসারে তবুও সে ভিক্ষা বৃত্তি আর করবে না। সে জানায় ভিক্ষাবৃত্তিকে এখন ঘৃণা করি।

১০-১২ বছর আগে সে এক বিয়েও করেছিলো। ৩ বছরের সংসারে ওই স্ত্রী রফিক প্রতিবন্ধী হওয়ার কারণে তাকে ছেড়ে চলে যায়। জীবনের শেষ ইচ্ছা কোন দিন সংসারে সচ্ছলতা এলে নিজ টাকায় একটি সিএনজি চালিত অটো রিকশা কিনে তা ভাড়া খাটিয়ে সে আর ঝুঁকিপূর্ণ কোন পেশার কাজ করবে না। কিন্তু সে পথ যে আরও দীর্ঘ।

ফেসবুক মন্তব্য