ঢাকা বৃহস্পতিবার, নভেম্বর ১৫, ২০১৮

Mountain View



একরোখা প্রতিবাদী মেয়েটি এবার এস.এস.সি পরীক্ষার্থী

Print Friendly, PDF & Email

 সোহানুর রহমানঃ রিংকু রানী সরকার (১৫) , এক অপরাজিতা কিশোরী কন্যার নাম । ঝালকাঠি সদর উপজেলার নথুল্লাবাদ ইউনিয়নের বাড়ৈয়ারা গ্রামে মেয়েটির বাস । এবার এসএসসি পরীক্ষা দিচ্ছে নথুল্লাবাদ উচ্চ বিদ্যালয় থেকে । এর আগে তার উপর থেকে বয়ে গেছে বহু ঘাত প্রতিঘাতের ঝড় । সোনালী শৈশব ও লেখাপড়া জলাঞ্জলী দিয়ে কিশোরী কন্যাটির অল্প বয়সে বসতে হয়েছিল বিয়ের পিড়িতে ।

1898964_513368608784712_1369116488_n

রিংকু রাণী সরকার

রিংকুর পরিবারও অন্য আট-দশটা পরিবারের মতোই ভাবে মেয়েদের। তা দেখে দেখে ও ভাবত, মেয়েরা হয়তো তেমন কিছুই করতে পারে না। ধীরে ধীরে মীনাই শিখিয়েছে যে মেয়েরাও সুযোগ পেলে অনেক ভালো কাজ করতে পারে। মেয়েদেরও অধিকার আছে সমাজে ভালোভাবে বেঁচে থাকার।

মা স্বন্ধ্যা রানী ও ছোট ভাই শাওন সরকারকে রেখে তাদের পরিবারকে অকূল দরিয়া ফেলে বাবা স্বপন সরকার গত হয়েছেন দশ বছর আগে । নবম শ্রেনী প্রযন্ত পড়িয়েছেন, কাঁথা সেলাই ও অন্যের বাসায় কাজ করে সন্তানদের মুখে খাবার জুটিয়েছেন রিংকুর মা । চালিয়েছেন তাদের ২ ভাইবোনের পড়ালেখা । তাদের এ দুঃসময়ে এগিয়ে আসেনি কেউ । ইতিমধ্যে প্রাথমিকের পাঠ চুকানোর আগেই রিংকুর ভাই শাওন সরকার শিশু শ্রমিক হিসেবে নাম লিখিয়েছে জুয়েলার্সের দোকানে । আর্থিক অনটনের কারনে বন্ধ হয়ে যায় রিংকুর পড়াশোনা । রিংকুর কন্যাদায়গ্রস্থ মা রিংকুকে বিয়ে দেয়ার জন্য উঠে পড়ে লাগলে বিয়ের প্রতিবাদ জানায় একরোখা রিংকু । দায় দেনা করে নতূন বউ সাজিয়ে রিংকুকে পাঠানো হয় শশ্বুর বাড়ি । বিয়েতে রাজি হওয়া নিয়ে বহু গড়িমসি করলেও একপর্যপায়ে পরিবারের দিকে তাকিয়ে বিয়েতে বাধ্য হলো মেয়েটি। ওর মতামতের কেবা ধার ধারে। কথাগুলো বলছিলেন রিংকু।

বিয়ে হলেও লেখাপড়া চালিয়ে যেতে মেয়েটি একেবারেই একরোখা । যেভাবেই হোক তার লেখাপড়া চালিয়ে যেতেই হবে অকর্মা স্বামীর পরিবারতো লেখাপড়াতো চালাবেই না উল্টো যৌতুকের টাকা নিয়ে দিতে লাগলো জোড় তাগিদ ।

এমন বৈপরীত্য পরিস্থিতে মেয়েটির উপর নেমে আসল লাঞ্চনার সাথে শারীরিক নির্যাতন। হলোনা বনিবনা । এরপর অলিখিত ইস্তফা দিয়ে যে স্বামীর বাড়ি ছাড়লো আর ওমুখো হয়নি একটি বারের জন্যও । হয়েছে বিচার শালিস । স্বামী বিবাহ বিচ্ছেদ চায় তবুও চায়না বউ শিক্ষিত হোক । কি আর করা ? সালিশী পরিষদে সকল যৌতুক সামগ্রী ফেরত দিয়ে বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটালো স্বামী। রিংকু স্থানীয় নারী ইউপি সদস্যা ও বিকশিত নারীনেত্রী নাছিমা বেগমের সহযোগিতা আর অনুপ্রেরনায় আবারো স্কুলে ভর্তি হয়। নথুল্লাবাদ উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক আঃ ছালাম মিয়া এবং সুলতান হোসেন মাস্টার এক্ষেত্রে সহযোগিতা করেন । নিয়মিত পড়াশুনা করে বাছনিক পরীক্ষায় উর্তীণ হয়ে সে এবার এসএসসি পরীক্ষা দিচ্ছে।

রিংকু জানায়, বাংলাদেশ টেলিভিশনে মীনার কার্টুন দেখেছি । দেখে বুঝেছি শিশু বয়সে বিয়ের ফল ভাল নয় ।

জিজ্ঞেস করলাম, মীনা কার্টুনটি দেখা শুরু করলেন কবে থেকে ? চটপট উত্তর দিলেন, ‘২০০১সাল থেকে। এর আগেও হয়তো দেখেছি। কিন্তু সেসব মনে নেই। নিয়মিত দেখতে শুরু করি তখন থেকেই। সে সময় বাংলাদেশ টেলিভিশনে প্রতিদিন বিকেলে দেখাত মীনা কার্টুন। মনে পড়ে, স্কুল থেকে বাড়ি ফিরেই অপেক্ষা করতাম, কখন বিকেল হবে, কখন শুরু হবে মীনা!’ তারপর খানিকটা ভেবে বলেন, ‘জানেন, মীনার প্রতিটা পর্ব একটা সময় পর্যন্ত আমার মুখস্থ ছিল।’
মীনার আর কোন বিষয়গুলো আপনার ভালো লাগত?

মীনা খুব বুদ্ধিমতী। যেকোনো অন্যায়ের প্রতিবাদ করে। নিজের মতামতটা অন্যকে বোঝাতে পারে। সমাজের সবার বিপদে এগিয়ে যায়—মীনা চরিত্রের এই বৈশিষ্ট্যগুলো বেশ আকৃষ্ট করেছিল আমাকে। ভালো কাজ করার উৎসাহ পেয়েছি মীনার কাছ থেকে। আমার কাজের প্রেরণা মীনার কাছ থেকে পাওয়া।’ যখনই যে পর্ব দেখতেন রিংকু, তার পরই সেটি নিয়ে ভাবতেন সারাক্ষণ।

মীনার মধ্যে আমি অনুসরণ করার মতো এত কিছু পেয়েছি যে, আমি এখনো মীনার প্রতি আকর্ষণ বোধ করি। এখনো যদি কখনো মীনা কার্টুন শুরু হয়, আমি দৌড়ে যাই টিভি দেখতে।’ ক্লাশের বইতে বহুবার পড়েছি বাল্যবিবাহের কুফল। আরো পড়েছি শিক্ষা জাতির মেরুদন্ড। একজন শিক্ষিত মা ই পারে একটি শিক্ষিত জাতি উপহার দিতে । আমি এক সময় শিশু সংগঠন জাতীয় শিশু টাস্কফোর্স এনসিটিফ ঝালকাঠি জেলা শাখার সদস্য হিসেবে কয়েকটি অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে জানতে পেরেছি কন্যা মানেই বিয়ে নয় করবে তারা বিশ্বজয় । যেভাবেই হোক আমার দুভাগ্যবশত আমার বিয়ে হয়ে গেছে ।পড়াশোনা করতে আমার অনেক সংগ্রাম চালিয়ে যেতে হয়েছে। এখন আমি শুধূই পড়াশোনা করতে চাই । লেখাপড়া করে এগিয়ে যেতে চাই বহুদূর।

রিংকুর চোখেও এখন মীনার মতোই হাজার স্বপ্ন। তিনি বলেন, ‘আমি হয়তো পাস করে একটা চাকরি করব। কিন্তু আমার স্বপ্ন শুধু এতটুকুই না। আমিও মীনার মতো সমাজের জন্য কিছু করতে চাই। আমি মনে করি, মীনা আমার সমাজেরই একটা সত্যিকারের চরিত্র, যে মেয়েশিশুর অধিকার ও সমাজের আর দশটা অসংগতি নিয়ে ভাবে।’ মীনা তিনটি ইচ্ছাপূরণের সুযোগ পেয়েছিল। আপনি তো মীনার অনুসারী। আপনার মনে কি এমন কোনো ইচ্ছা আছে ? প্রশ্ন শুনেই শিশুসুলভ হাসি হাসেন রিংকু। তারপর বেণি দুলিয়ে জবাব দেন, ‘আমার যদি মীনার মতো একটা দৈত্য থাকত, তাহলে আমিও আমার তিনটি ইচ্ছা পূরণ করে নিতাম। এক. আর যেন কোনো মেয়ে বাল্যবিবাহের শিকার না হয়। দুই. দেশ থেকে ইভ টিজিংয়ের দূর হয়ে যাক আর তিন নম্বর হচ্ছে, সবাই যেন সুখে জীবনযাপন করে।’

ইচ্ছাপূরণের দৈত্য নিয়ে রিংকুর মনে সংশয় থাকলেও স্বপ্নগুলো নিয়ে কোনো সংশয় নেই। যত কঠিনই হোক, স্বপ্নগুলো পূরণ করবেনই, নিজের অভিব্যক্তি দিয়ে সে কথাই জানিয়ে দেন তিনি।

ফেসবুক মন্তব্য