ঢাকা বৃহস্পতিবার, এপ্রিল ২৬, ২০১৮

Mountain View



ভালোবাসার ভয়াল রূপ

Print Friendly, PDF & Email

যুবায়ের আহমাদ, অতিথি লেখক : মুসলিম বিশ্বকে বিপথগামী করতে ইহুদী খ্রিস্টান যেসব পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে এর অন্যতম হলো পশ্চিমা সংস্কৃতি ছড়িয়ে দেয়া। সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের অংশ হিসেবে থার্টি ফার্স্ট নাইট, এপ্রিল ফুল, ভ্যালেন্টাইন‘স ডের মতো বিভিন্ন দিবসের প্রচলন করেছে। আক্রমণের প্রধান টার্গেট মুসলিম যুবক-যুবতী। অন্যান্য দেশের ন্যায় বাংলাদেশও এর বিষাক্ত ছোবলে আক্রান্ত। একদিকে স্টার জলসার মতো বিভিন্ন চ্যানেলের মাধ্যমে ভারতীয় সংস্কৃতি প্রসারের অপচেষ্টা, অন্যদিকে বিভিন্ন দিবসের নামে পশ্চিমা সংস্কৃতির অনুপ্রবেশ। ভ্যালেন্টাইন ডের মাধ্যমে যুব সমাজের চরিত্র হননের মিশনকে সফল করতে এর সাথে ভালোবাসাকে জড়ানো হয়েছে।

ভালোবাসা মহান আল্লাহ তায়ালার বড়ো দান। ভালোবাসার মাধ্যমেই আল্লাহ তায়ালা সৃষ্টিকুলকে টিকিয়ে রেখেছেন। রেখেছেন সতেজ, প্রাণবন্ত। আল্লাহর দেয়া অকৃত্রিম ভালোবাসার মায়ার জালেই আটকে রয়েছে পৃথিবী। ভালোবাসা আছে বলেই পরিরার, সংসার ও সমাজ টিকে আছে। ভালোবাসার টানেই গর্ভবতী মা তার গর্ভের সন্তানকে কঠিন যন্ত্রণা ভোগ করে নিজের জীবনের বিনিময়ে হলেও দুনিয়ায় আসার সুযোগ করে দেন। পুরুষ রাত-দিন হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম করে জীবিকার তাগিতে ছুটে বেড়ায় দিক-দিগন্তে। স্ত্রী মনের মাধুরী দিয়ে ঘর সাজায়, রঙিন স্বপ্নে বিভোর হয়। পশু-পাখি ও বণ্যপ্রাণিরা তাদের সন্তানের মুখে খাবার তুলে দেয়; নিরাপত্তার চাদরে আগলে রাখে। ভালোবাসার যে বিশালতা তা কি কোনো দিবসের ফ্রেমে বন্দি করা যায়? না। মহান স্রষ্টার সঙ্গে বান্দার, রাসুলের সঙ্গে উম্মতের, পিতা-মাতার সঙ্গে সন্তানের, স্বামীর সঙ্গে স্ত্রীর, শিক্ষকের সঙ্গে ছাত্রের, দেশের সঙ্গে নাগরিকের, কবিতার সঙ্গে কবির যে ভালোবাসা তা কখনো দিন-তারিখের জন্য অপেক্ষা করে না; ধার ধারে না কোনো আনুষ্ঠানিকতার। প্রকৃতির আপন নিয়মেই তা যথাসময়ে পরিমাণ মতো সৃষ্টি হয়। কিন্তু এর পরও কেন কিছু অসুস্থ মানসিকতার মানুষ একে ১৪ ফেব্রুয়ারীর সাথে সীমাবদ্ধ করে দিতে চায়? আসলে কি তারা ভালোবাসার প্রসার ঘটাতে চায় নাকি অন্য কিছুর?

বলা হচ্ছে ভ্যালেন্টাইন ডে অর্থ হলো বিশ্ব ভালোবাসা দিবস। আসলেই কি তাই? সংসদ অভিধানের ১২৫৪ পৃষ্ঠায় ভ্যালেন্টাইন শব্দের অর্থ লেখা হয়েছে দ্যা নেইম অব টু সেইন্টস) দুজন খ্রিস্টান ধর্মযাজকের নাম। সেখানে আরো উল্লেখ আছে, ভ্যালেন্টাই অর্থ- “এক বছর ধরিয়া বর কনে হিসেবে খেলিবার জন্য নির্বাচিত বর বা কনে”। ইতিহাস বলে, যিশু খ্রিস্টের জন্মের আগে চতুর্থ শতকে পৌত্তলিক, মূর্তিপূজারীরা তাদের পশুর দেবতা ও জমির উর্বরতার দেবতা লুপারকালিয়ার সম্মানে ১৪ ফেব্রুয়ারি এক অনুষ্ঠানের আয়োজন করতো। অনুষ্ঠানে যুবতীদের নামে লটারি ইস্যু করা হতো। লটারিতে যে যুবতী যে যুবকের ভাগে পড়তো পরবর্তি এক বছর ওই যুবক সে যুবতীকে ভোগ করতো। এভাবেই শুরু হয় দিবসটির উদযাপন। পরবর্তিতে ৪৯৬ সালে ভ্যালেন্টাইন নামক এক খ্রিস্টান পাদ্রির নামে ভ্যালেন্টাইন‘স ডে নামে তা রূপান্তরিত হয়। কই? এখানে তো কোথাও ভালোবাসার কথাই নেই। তাহলে এখানে ভালোবাসা আসলো কোত্থেকে? আসলে প্রথমেই অশ্লীলতার কথা বললে অনেকেই হয়তো আসবে না; তাই, এখানে ভালোবাসার মোড়ক লাগানো হয়েছে। প্রস্রাবের বোতলের ওপর “আতর”  লিখে দিলেই যেমন তা পাক হয়ে যায় না তেমনি অবাধ যৌনতায় উদ্বুদ্ধকারী ভ্যালেন্টাইনের সাথে ভালোবাসার মোড়ক লাগালেই তা শুদ্ধ হয়ে যায় না।

অন্যদিকে আভিধানিকভাবেই এর অর্থ- “এক বছর ধরিয়া বর কনে হিসেবে খেলিবার জন্য নির্বাচিত বর বা কনে”। প্রশ্ন হলো, এই নির্বাচিত তরুণ তরুণী ১ বছর ধরে যে খেলাটি খেলবে তা কী? এক্কাদোক্কা, লুডু, কাবাডি, ফুটবল, ক্রিকেট বা কম্পিউটারের গেম খেলা? না। বরং এ হলো সেই খেলা যার ফলে পৃথিবীতে একটি জারজ সন্তানের জন্ম আমাদের দেশের অতি উৎসাহী কিছু প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়া বেশ আগে থেকেই দিনটিকে সামনে রেখে পরিকল্পনা করে থাকে। তাদের একটি বড়ো উদ্দেশ্য থাকে বিজ্ঞাপন প্রাপ্তি ও আর্থিকভাবে লাভবান হওয়া। হোটেল, বিনোদন কেন্দ্রগুলো অধীর আগ্রহে থাকে দিনটির জন্য। মূলত শুধু একালে নয়; শুরু থেকেই বাণিজ্যিকীকরণের হাত ধরেই ভ্যালেন্টাইন ডে ছড়িযে যায় বিশ্বজুড়ে। ১৮৪০ সালে সর্ব প্রথম ভ্যালেন্টাইন কার্ড বের করে পশ্চিমারা। ব্যাপক প্রচারের কারণে প্রায় পাঁচ হাজার ডলারের কার্ড বিক্রি হয় ওই বছর।পরবর্তিতে এ দিবসে বিভিন্ন ধরণের ভ্যালেন্টাইন কার্ড ও গোলাপ ফুল আসল মূল্যের তিন-চারগুণ হারে বিক্রি হয়। তখন থেকেই ধান্দাবাজ পশ্চিমা ব্যবসায়ীরা ব্যবসায়িক ও পুঁজিবাদী চিন্তা নিয়ে এ দিবসটিকে বিশ্বজুড়ে ছড়ানোর চেষ্টা করে। এভাবেই শুরু হয় ভালোবাসা নিয়ে রমরমা বাণিজ্য।

বাণিজ্যিক ভালোবাসার দিবসটিতে কী করা হয়? কী ভালোবাসা! ভ্যালেন্টাইনডে অর্থ যদি বিশ্ব ভালোবাসা দিবস হয় তাহলে ঘটা করে দিনটি পালনকারীরা গরিব-দুখী অনাহারিদের জন্য সাহায্যের হাত প্রসারিত করে না কেন? মূলত বিভিন্ন দিবসের প্রচলনের মাধ্যমে যুবক-যুবতীদের চরিত্র নষ্ট করে দিতেই তাদের এহেন প্রয়াস। যে কারণে তারা সেদিন ছুটে যায় না হাসপাতালের বেডে পড়ে থাকা একজন রোগীর সেবায়, রেল লাইন কিম্বা ফুটপাতে শুয়ে থাকা শীতার্থ মানুষের শীতবস্ত্রের ব্যবস্থা করে দিতে উদ্যোগ গ্রহণ করে না। তারা শুধু শেখায় কিভাবে অশ্লীলতার চর্চা করতে হবে। যুগলবন্দী হয়ে একে অন্যকে জড়িয়ে ধরা, অবাধ মেলামেশাই যে ভালোবাসার সাধারণ দৃশ্য। এর মাধ্যমে আমাদেরকে ফ্রি সেক্স, লিভিং টুগেদারে উৎসাহিত করাই টার্গেট। তাদের ভালোবাসার টার্গেট একমাত্র তরুণ তরুণী। সরকার যদি ঘোষনা করে যে, এবারের ভ্যালেন্টইন ডে তে ১০ থেকে ৪০ বছর বয়সী কোনো মহিলা ভ্যালেন্টাইন ডে পালন করতে পারবে না তাহলেই তাদের কথিত ভালোবাসা উধাও হয়ে যাবে।

বাণিজ্যিক ভালোবাসার দিবসটির কোনো ভিত্তি কি আমাদের সংস্কৃতিতে আছে? না। সংস্কৃতির উৎস হচ্ছে তিনটি ১. ধর্ম, ২. দেশ, ৩. মাতৃভাষা। ইসলাম নামক শান্তির একমাত্র জীবন বিধানে কি এর কোনো ভিত্তি আছে? আজকে যে সব মিডিয়াকর্মী বিজ্ঞাপন পাওয়া কিংবা অন্য কোনো বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে এ দিবসটিকে ছড়াতে উঠেপড়ে লেগেছেন তারাও কি প্রমাণ করতে পারবেন যে, ভ্যালেন্টাইন ডে আমাদের বাংলাদেশীয় সংস্কৃতির অন্তর্ভূক্ত? তাদেরকে অবশ্যই স্বীকার করতে হবে, ভালোবাসা দিবসকে তারা পশ্চিমা দেশগুলো থেকে আমদানি করেছেন। আমাদের মাতৃভাষা বাংলার সাথেও এর কোনো সম্পর্ক নেই। তাই , এ ভালোবাসা দিবস আমাদের সংস্কৃতি নয়; বরং তাদের সংস্কৃতি, যাদের সমাজে কুমারী মাতা হওয়াকে স্বাভাবিক মনে করা হয়।

যে জাতি তাদের কৃষ্টি-কালচার ও ধর্মীয় চেতনাকে বাদ দিয়ে বিজাতীয় সংস্কৃতিকে লালন করে তারা কখনো স্বকীয়তা নিয়ে বিশ্বের দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে না। ভ্যালেন্টাইনস ডের প্রেমিকরা কি একবারো তা চিন্তা করেছেন যে, এর মাধ্যমে আমাদের জাতীয় স্বকীয়তা তার অস্তিত্ব হারাতে চলেছে। হারাবো অনেক কিছু; পাবো না আমাদের ছ্ট্টো বাংলাদেশে হত্যা, গুম, ধর্ষন, ছিনতাই যেখানে বেড়েই চলেছে; ইয়াবার মতো মারাত্মক মাদকের লাগাম টেনে রাখা যাচ্ছে না; এইডসের মতো মহামারি ছড়াচ্ছে দ্রুত; সেখানে কেন এই অপরাধ উস্কে দেয়ার এ কর্মসূচি বাস্তবায়ন? নিজেদের ফাইভস্টার হোটেল, নাইট ক্লাব কিম্বা বিনোদন কেন্দ্রগুলোর রমরমা ব্যবসা জমাতে কেন বছরের কিছু দিনে অশ্লীলতার অবৈধতাকে বৈধ করে দেয়ার অপচেষ্টা?

অনেকেই হয়তো ভাবছেন, বিজাতীয় সংস্কৃতি হোক না, আমাদের সন্তানরা একটু আনন্দ করবে এতে সমস্যা কোথায়? আপনাকে মনে রাখতে হবে আপনার সন্তান প্রথম মাদক গ্রহণের পূর্বে কিন্তু আপনার অনুমতি নেবে না। আপনার কলিজার টুকরা সন্তান হয়তো ভ্যালেন্টাইন ডে উদযাপন করতে যেয়েই জীবনের প্রথম মাদকের বিষাক্ত ছোবলে অক্রান্ত হবে। আপনার সব স্বপ্ন মিশে যাবে মাটির সাথে। একটি রাত কিম্বা দিনই হবে আপনার পুরো জীবনের কান্নার কারণ। তাই, এখনই সতর্ক হতে হবে। নিজেদের সন্তানকে বিরত রাখতে হবে কথিত ভালোবাসার চর্চা থেকে। ভালোবাসার কোনো দিন-ক্ষণ নেই। ভালোবাসা বিশেষ কোনো দিনের ফ্রেমে বন্দি না হয়ে উন্মুক্ত থাকুক। পবিত্র থাকুক, অবারিত হোক এর চিরন্তন ধারা। আমাদের মধ্যে চর্চা হোক শুদ্ধ সংস্কৃতির; বিলুপ্ত হোক ভ্যালেন্টাইন‘স ডে অপসংস্কৃতি।

লেখক: শিক্ষর্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়

ফেসবুক মন্তব্য