ঢাকা শনিবার, সেপ্টেম্বর ২২, ২০১৮

Mountain View



ভাষা ও সংস্কৃতি

Print Friendly, PDF & Email
969810_10152156267713312_1080353038_n

জাহিদ কবীর হিমন

 জাহিদ কবীর হিমন, জার্মানী থেকে : বলতে দ্বিধা থাকা উচিত নয় যে বঙ্গীয় ভূমিতে স্বাধীনতা দু’বার এসেছে। প্রথমবার প্রাপ্ত স্বাধীনতার ইতিহাস বিচার করে দেখা যায় তা এসেছিল মূলত দ্বিতীয় অর্থাৎ প্রকৃত স্বাধীনতাকে ত্বরান্বিত করতে। অনেকে বলে বাঙ্গালির আবেগানুভূতি আচার-সমাচার সবই ক্ষণস্থায়ী। অল্পে তুষ্ট হয়ে আমরা আকাশে উড়ি, সামান্য বেদনায় মাটিতে গড়াগড়ি দেই। গত শতাব্দীর মধ্যভাগে যে স্বাধীনতা পেয়ে আত্মশ্লাঘায় ভেসেছি কয়েকযুগ লাগেনি ধপাস করে সেখান হতে মাটিতে পড়তে। মোহভঙ্গ ঘটেছে বছরখানেকের মধ্যেই যখন বাঙালি দেখলো দুই হাজার বছর নিষ্ঠুর নিষ্পেষণে সবকূল হারানোর পর মুখের ভাষাখানি ছাড়া যাদের আর কিছু নাই সেই ভাষাটিও কেড়ে নেবার হুংকার। তবে ইতিহাসের কঠিন সত্য হল এই যে বাঙালি কারো হুংকারে ভীত হয়ে কাঁপতে কাঁপতে মাঠ ছেড়ে ভোঁ করে দৌড়ে পালানোর জাতি নয়। বরং বীরত্বগাঁথার চুড়ান্ত পরীক্ষায় অতিক্রান্ত হয়ে বুকের তাজা রক্ত ঢেলে অধিকার আদায় করাই তার কাজ। এ শুধু বাহান্নর একুশে ফেব্রুয়ারীর কাহিনী নয়, বাঙ্গালি সমরুপ কাহিনী রচিত করেছে যুগে যুগে কালে কালে।

যেকোন জনগোষ্ঠীর মাতৃভাষার প্রশ্নটি শুধু ভাষার ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয়। যেকোনো জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতি, আচার-আচরণ, জীবনধারণ থেকে শুরু করে তার অস্তিত্বের প্রশ্নের সাথে ভাষার বিষয়টি জড়িত। বাঙালি জাতীয়তাবাদের সূচনা তখনো ঘটেনি। ধর্মীয় জাতীয়তাবাদের তখন রমরমা বাজার। কিন্তু ধর্মীয় সঙ্কীর্ণতার উর্ধ্বে উঠে বাঙালি জন্ম দিয়েছে ধর্মনিরপেক্ষ বাঙালি জাতীয়তাবাদের যা এক অসম্ভব নৈপূণ্যতা। এ থেকেই প্রমাণিত হয় ধর্মনিরপেক্ষ লৌকিক জীবন ও সমাজ ব্যবস্থা বঙ্গীয় ভূমির মানুষের রক্তে প্রবাহমান হাজার হাজার বছর ধরে।

বাঙালি জাতীয়তাবাদ কদাচিৎ উগ্র জাতীয়তাবাদের আচরণ দেখিয়েছে তা অসত্য নয় তবে তা কখনোই উগ্র ধর্মীয় জাতীয়তাবাদের মত হামেশা নয়। চল্লিশের দশকের শুরু থেকে তাদের অপতৎপরতার কারণে বাংলাদেশ তো বটেই উপমহাদেশের সকল জাতিসত্ত্বার জাতিগত সাংস্কৃতিক পরিচয় নিয়ে দূর্যোগ দেখা দিয়েছে। ধর্ম আর জাতিগত বৈশিষ্ট্যকে মিশিয়ে ফেলার কদর্য ফলাফল আমরা বহু দেখেছি। সেকারণেই বলা হয় ধর্ম ব্যক্তিনির্ভর আর সংস্কৃতি দেশনির্ভর। আমাদের সমাজে নারীরা হাজার বছর শাড়ি আভিজাত্যের প্রতীক হিসেবে পরিধান করে আসছে। ধর্মীয় উগ্রবাদীরা তার বিরোধিতা করলেও এখন পর্যন্ত তা নিরোধ করতে পারেনি। বাঙ্গালির বিয়েতে গায়ে হলুদ, গান বাজনা বহু পুরনো রীতি। অধুনা গায়ে হলুদে গান বাজনা চটুল রুপলাভ করলেও গ্রামে গঞ্জে এখনও খালি সুরে মহিলাদের গান করতে দেখা যায়। হলুদের পর গোসলের সময় একে অন্যকে রঙ মাখামাখি বিয়ের আনন্দের অনবদ্য অংশ। বাঙালি মুসলমান সমাজে মেয়েদের কপালে লাল টিপ বহুকালের রীতি বিশেষ করে বিয়ের সময়। এখন অনেক মুসলমান পরিবার আছে যারা এসবকে নিজেদের সংস্কৃতির অংশ মানতে চায় না তারা এগুলো হিন্দুয়ানীর অংশ বলে। কিন্তু তাদের নিজেদের পরিবারেও বিয়েশাদি সহ অন্যান্য অনুষ্ঠানাদিতে মেয়েদের টিপ, টিকলি, নোলক, সীতাহার আর পুরুষদের পাঞ্জাবী পাগড়ী পরতে দেখা যায়। মূলত পুর্বপুরুষদের রীতি ধর্মীয় ব্যঞ্জনা দিয়ে ঢেকে রাখা যায় না। এসবই বাঙালি সংস্কৃতির অংশ। ভূ-প্রাকৃতিকভাবেই হিন্দুদের সাথে আমাদের সহবাস। তাই তাদের আর আমাদের আচারে অনুষ্ঠানে অর্থাৎ সাংস্কৃতিক অভিন্নতা লক্ষ্য করা যায়। একুশ আমাদের এই শিক্ষা দিয়ে গেছে যে ধর্মের দোহাই দিয়ে নিজ নিজ সংস্কৃতি তথা আত্মপরিচয় বিসর্জন আত্মহত্যার নামান্তর।

বিবিধ রাষ্ট্রীয় গোলযোগ আর উগ্র ফ্যাসিবাদী জাতীয়তাবাদের প্রচারের ডামাডোলে যে কথাটা প্রায় বিস্মৃত হতে চলেছে সেটা হলো ভাষা আন্দোলন বাংলা ভাষা রক্ষার্থে হলেও তার মৌল দাবি শুধুমাত্র বাংলা ভাষার মধ্যেই আবদ্ধ ছিল না। নতুন সেই চেতনার মূল ছিল সকল জাতিসত্তার নিজ নিজ মাতৃভাষার স্বীকৃতিদান। এখন একুশের চেতনার নামে উদ্ভট জাতীয়তাবাদী যে প্রচারণা চলছে তার আশু সমাপ্তি প্রয়োজন। মণিপুরী, মারমা, বিহারী, চাকমা, সাঁওতাল, খাসিয়া, মুরং, তঙচঙা সহ সকল অবাঙালি জাতিসত্তার জনগোষ্ঠী বাঙালির পাশাপাশি সমান মর্যাদা নিয়ে রাষ্ট্রে বসবাসের অধিকার অর্জন করুক, তাদের মাতৃভাষায় শিক্ষাগ্রহণের অধিকার স্বীকৃত এবং তা যথার্থরূপে বাস্তবায়িত হোক, মাতৃভাষার রাষ্ট্রীয় মর্যাদার দাবিতে আত্মত্যাগকারী সত্যিকারের মুক্তিকামী মানুষের স্বপ্ন বাস্তবে রুপলাভ করুক- একুশে ফেব্রুয়ারির এই ক্ষণে এটাই কামনা।

লেখক : শিক্ষার্থী, কন্সটাঞ্জ ইউনিভার্সিটি, জার্মানী।
উপদেষ্টা সম্পাদক, টাঙ্গাইল বার্তা।

লেখকের অন্যান্য লেখাসমূহ :

আনন্দ প্রদায়কঃ হুমায়ূন আহমেদ

জার্মানির প্রাচীন এক নগরী- কন্সটাঞ্জ

ফেসবুক মন্তব্য