ঢাকা বৃহস্পতিবার, নভেম্বর ১৫, ২০১৮

Mountain View



ভূঞাপুরে ৭০ বছরের বৃদ্ধ’র লালসার শিকার ১৩ বছর বয়সী হাজেরা

Print Friendly, PDF & Email

1922506_620938191313059_392009169_n

মো:কামাল হোসেন ও সোহেল তালুকদার, ভূঞাপুর থেকে : ভূঞাপুর উপজেলার অর্জুনা ইউনিয়নের বলরামপুর গ্রামের যমুনা তীরবর্তী দো-চালা একটি ছোট্র ঘরে মা-বাবা ও ৫ বছরের বোনের সঙ্গে বসবাস করতো ১৩ বছর বয়সের হাজেরা। দিনমজুর বাবা হাছেন আলী বর্গা জমি চাষ করে এবং মা নাসিমা বেগম অন্যের বাড়িতে কাজ করে সংসার চালাতো। পাশের গ্রাম ফলদা পাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তৃতীয় শ্রেণিতে পড়াশোনা করতো হাজেরা। যমুনা তীরবর্তী গ্রামের সন্তান হওয়ায় আট-দশ জন কিশোর কিশোরীর মত নদীতে ঝাঁপিয়ে গোসল করতো সে। মা-বাবার কাজের সহযোগীতা করে চঞ্চল মনে সহপাঠিদের সঙ্গে নিয়মিত বিদ্যালয়ে যেতো হাজেরা। স্কুল থেকে ফিরে ছাগল চড়াতে বের হতো যমুনার চরে। সন্ধ্যার আগে বাড়ি ফিরে আসতো। নানা বলে ডাকতো ওই গ্রামেরই ৫ সন্তানের জনক ৭০ বছর বয়সের বৃদ্ধ এছা বুড়াকে। স্কুলে যাতায়াত ও ছাগল চড়াতে যাওয়ার সময় নানা ধরনের কথাবার্তা ও বিভিন্ন ধরনের খাবার জিনিস কিনে দিতো এছা। এভাবে চলতে থাকে কয়েক মাস।

হঠাৎ করেই হাজেরা উপর কুনজর পড়ে এছার। লোভ দেখিয়ে খারাপ প্রস্তাব দিতে থাকে সে। নানার দেয়া জিনিসপত্রের লোভে রাজি হয়ে যায় হাজেরা। গড়ে উঠে অবৈধ সম্পর্ক। চলতে থাকে বেশ কয়েক মাস। একদিন স্কুলে যাওয়ার পথে অবৈধ সম্পর্ক করতে গিয়ে গ্রামের লোকজনের হাতে ধরা পড়ে এছা। তোলপাড় হয় এলাকায়। শরীরের অবস্থা খারাপ হওয়ায় চেকআপ করা হয় হাজেরার। চেকআপে ৫ মাসের অন্ত:স্বত্তা ধরা পড়ে তার। মাতব্বররা বিষয়টি ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা চালালেও নানা আলোচনা সমালোচনার মুখে মাস খানেক পড়ে আয়োজন করা হয় গ্রাম্য সালিশের।

অর্জুনা ইউপি চেয়ারম্যান আইয়ুব মোল্লা, ইব্রাহীম খাঁ সরকারি কলেজের মার্কেটিং বিভাগের সহকারি অধ্যাপক নুরে আলম উজ্জ্বল, গ্রাম্য মাতব্বর লোটন ডাক্তার, অবসর প্রাপ্ত বিডিআর সদস্য বাদল মিঞা, শরিফুল ইসলাম শরিফসহ এলাকার গ্রাম্য মাতব্বররা সালিশে বসেন। সালিশে নিজের দোষ স্বীকার করেন এছা। মাতব্বররা ৭০বছর বয়সের বৃদ্ধা এছার সঙ্গে ২ লাখ টাকার কাবিননামার শর্তে ১৩ বছরের হাজেরার বিয়ের সিদ্ধান্ত নেন। তাদের বিয়ে পড়ান গাবসারা ইউনিয়নের কাজী ইয়াদ আলী। এছাড়াও ওই সালিশে এছা বুড়াকে দেড় লাখ টাকা জরিমানা ও হাজেরার সন্তান প্রসবের সময় আরো ২০ হাজার টাকা দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এছার পক্ষ থেকে মাতব্বরদের কাছে ১ লাখ টাকা দেয়ার কথা হলেও এখন পর্যন্ত কোন টাকা-পয়সা পাননি হাজেরার পরিবার।

সরেজমিনে জানা যায়, এবছরের ৩০ শে জানুয়ারি ভূঞাপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে একটি কণ্যা সন্তানের জন্ম দেয় হাজেরা। বিয়ে হলেও স্বামীর বাড়িত ঠাঁই হয়নি তার। ৪০দিন বয়সি শিশু সন্তান নিয়ে বর্তমানে দরিদ্র পিতার বাড়িতে বসবাস করছে। ছনের বেড়া দেয়া ১০ হাত একটি দো-চালা টিনের ঘরে মা-বা,ছোট বোন ও শিশু সন্তান নিয়ে একই কক্ষে থাকতে হচ্ছে। যা কবি জসিম উদ্দিনের আসমানী কবিতাকেও হার মানায়। যে বয়সে হাজেরার বই খাতা-নিয়ে স্কুলে যাওয়ার কথা ছিল সেই বয়সে ব্যস্ত থাকতে হচ্ছে সন্তান লালন পালনের কাজে। তারপরও কপালে জুটছেনা স্বামীর আদর সোহাগ। সন্তানের বয়স তিনমাস পূর্ন হলেই স্বামীর কাছ থেকে তালাকের ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন ইউপি চেয়ারম্যানসহ গ্রাম্য মাতব্বররা। কথা হয় হাজেরার সাথে। সে জানায়, আমি কিছু বুঝে উঠার আগেই লোভ দেখিয়ে সে আমার সব শেষ করে দিয়েছে। আমি এখন ছোট এ বাচ্চা নিয়ে কোথায় যাবো এই বলে হাউমাউ করে কাঁদতে থাকে। হাজেরার বাবা হাসেন আলী ও মা নাসিমা বেগম বলেন, আমরা এছাকে মামা বলে ডাকতাম। হাজেরা ডাকতো নানা বলে। সে আমার মেয়েকে অনেক আদর করতো। কিন্তু আমরা বুঝতে পারিনি যে তার মনে এতো শয়তানি ছিল। এখন আমি মেয়েকে নিয়ে কোথায় গিয়ে দাড়াবো? গরিব মানুষ তাই আমাদের কথা কেউ শুনেনা। আল্লাহই তাদের বিচার করবেন।

এ বিষয়ে সালিশে অংশ নেয়া গ্রাম্য মাতব্বর ও ইব্রাহীম খাঁ সরকারি কলেজের মার্কেটিং বিভাগের সহকারি অধ্যাপক নুরে আলম উজ্জ্বল বলেন, সালিশে সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বাচ্চার বয়স ৩ মাস পূর্ন হলেই এছাকে দিয়ে মৌখিক খোলা তালাকের মাধ্যমে হাজেরাকে ডিভোর্স দেয়া হবে এবং জরিমানার দেড় লাখ টাকা প্রদান করা হবে। খোলা তালাক যুক্তিযুক্ত হবে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি কোন মন্তব্য না করে ফোন কেটে দেন।

আরেক গ্রাম্য মাতব্বর লোটন ডাক্তার বলেন, সালিশে এধরনের রায় কোন দিনই ঠিক হয়নি। তারপরও বিভিন্ন চাপে ও অবস্থার প্রেক্ষিতে সকলের মতামতের উপর রায় দেয়া হয়েছে।

স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান আইয়ুব মোল্লা বলেন,হাজেরার পরিবারকে জরিমানা দেয়ার পর মৌখিক তালাকের বিষয়টি আলোচনায় রয়েছে। এবিষয়ে পুনরায় সালিশে বসে একটা সমাধান বের করা হবে।

ফেসবুক মন্তব্য