ঢাকা মঙ্গলবার, সেপ্টেম্বর ২৫, ২০১৮

Mountain View



‌উপন্যাস লিখছেন মোস্তাফিজুর রহমান

Print Friendly, PDF & Email

আবীর দে : তরুণ গল্পকার, কলামিষ্ট, প্রথম আলো ব্লগের জনপ্রিয় “রবিবারের চিঠি”র লেখক মোস্তাফিজুর রহমান উপন্যাস লিখছেন। সম্প্রতি একটি ফেসবুক স্টাটাসের মাধমে তিনি এই কথা জানান। ফেসবুক স্টাটাসে আরও উল্লেখ করেন, এর আগেও তিনি উপন্যাস লেখার কথা ফেসবুকে প্রকাশ করেছে। তার ওয়াল পর্যবেক্ষণ করে দেখা যায়, গত ১৮ মার্চ ২০১৪ তিনি প্রথম উপন্যাস লেখার কথা ফেসবুকে প্রকাশ করেন। এরপর বিভিন্ন সময়ে উপন্যাসের চুম্বকঅংশ তুলে দিয়ে তিনি স্টাটাস দিয়েছেন।

3প্রকাশিতব্য উপন্যাস সম্পর্কে জানতে চাইলে মোস্তাফিজুর রহমান ফেসবুক স্টাটাস থেকে উপন্যাসের অংশগুলো চিহ্নিত করে দেন। উপন্যাসের নাম কি হবে, জানতে চাইলে তিনি বলেন “এটা এখনই বলতে চাচ্ছি না, মিস্ট্রিটা থাক। আরও কিছুদিন পর জানাবো।”

জীবনের প্রথম উপন্যাসটি তিনি গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসকে উৎসর্গ করবেন বলে ঠিক করেছেন। গত ১৭ এপ্রিল সাহিত্যে নোবেল বিজয়ী স্পানিস লেখক মার্কেস মারা গেলে তিনি লেখেন, “জীবনে এতটা খারাপ লাগেনি কখনো। খুব ইচ্ছা ছিল, জীবিত থাকাকালিন গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের সাথে একবার সাক্ষাত করবো। কিন্তু, নানা সিমাবদ্ধতার কারনে আমার পক্ষে এখনই তা সম্ভব নয়; ভেবে রেখেছিলাম, আগামি বছর আমার প্রথম উপন্যাস প্রকাশ হলে উৎসর্গপত্র সহ আমার বাংলা উপন্যাসের এক কপি ম্যাক্সিকো সিটিতে পাঠাবো। আমার ইংরেজিতে লেখা উৎসর্গ পত্রটা স্যার পড়বেন, অথবা কেউ পড়ে শোনাবেন। বাংলা পড়তে পারবেন না জানি, তবুও আমার বইটা হাতে নিয়ে নেড়ে চেড়ে দেখবেন। তার বহু বছর পরে জন্ম নেওয়া এক বাঙালী কাঁচা বয়সি গুণগ্রাহীর পাগলামিতে একটু হাসবেন আর আমার কাছে তা পৌছাবে বিংশ শতকের সাহিত্য ঈশ্বরের আর্শিবাদ হয়ে।”

ফেসবুকে প্রকাশিত উপন্যাসের অংশবিশেষ পড়লে বোঝা যায় এটি একটি প্রেমের উপন্যাস। জানতে চাইলে মোস্তাফিজুর রহমানও তাই বলেন। টাঙ্গাইল বার্তার পাঠকদের জন্য মোস্তাফিজুর রহমানের অপ্রকাশিত উপন্যাসের অংশগুলো এখানে তুলে ধরা হল-

মার্চ ২১:

. . . কিন্তু দেখ, কি এক বিচিত্র কারণে আমি পারিনি, প্রকৃতি করতে দেয়নি। কেননা, আমিও তো মানুষ, বিচিত্র আকৃতির দুইশো ছয়টা হাড়, একদলা মাংস আর কয়েক তোলা মগজের অধিকারী মানুষ; যার প্রতিটা নিউরণের ভাজে ভাজে, শরীরের প্রতিটা অনুভূতিতে ঈশ্বর তার নিজের গুণ বৈশিষ্ট্য ঢুকিয়ে দিয়েছেন। অথচ দেখ আমি ঈশ্বরের মত হতে পারলাম না, হলাম আর দশজন সাধারণ মানুষের মত, যাদের কামনা আছে, ক্ষুধা আছে, জিঘাংসা আছে, স্বার্থপরতা আছে। . . .

 মার্চ ২২:

1450880_542370092514450_1129631197_n. . .মেয়েরা মায়ের জাত, ওদের কেমন যেন একটা আলাদা সম্মহনী ক্ষমতা আছে, এক রহস্যময় শক্তি আছে যা মনকে মোহিত করতে জানে; মুগ্ধতা, পবিত্রতা এবং পরিতৃপ্তির এক আশ্চর্য মেলবন্ধন ঘটে নারীর সংস্পর্শে অথবা দর্শনে। নারীর এই রহস্যময় শক্তি কারো জন্য অনুপ্রেরণা, কারো জন্য ধ্বংসের কারন, এটা এমনই যে, ভালো কিছুকে আরও ভালো করে তোলে আর মন্দ কিছুকে চুড়ান্ত মন্দের দিকে নিয়ে যায়।

 মার্চ ২৪:

. . .কোন সম্পর্ক আদৌ নষ্ট হয় না, নশ্বর এই পৃথিবীতে সকল সম্পর্কই অবিনশ্বর। পৃথিবীতে মানুষ জন্ম নেয় আর কেবল সম্পর্ক সৃষ্টিই করে, সম্পর্ক ভঙ্গ করা মানুষের ক্ষমতার বাইরে। হয়তো ভুল বুঝে পরষ্পর থেকে দুরে থাকে অথবা ধরলাম, প্রমাণিত কোন অপরাধে চিরতরে দুরে ঠেলে দেয়, হয়তো জীবিত থাকাকালিন পরষ্পর আর সাক্ষাত করে না, কিন্তু মন থেকে কি মুছে যায়? মানুষের মস্তিষ্কের এই ক্ষমতা দেওয়া হয়নি, চাইলেই কম্পিউটারের হার্ডডিক্স থেকে কোন ফাইল চিরতরে ডিলিট করে দেওয়ার মত স্মৃতি থেকে কোন কিছু চিরতের ডিলেট করতে পারে না।

 মার্চ ৩০:

. . .রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে শিশুকাল থেকেই চিনি, আমাদের বিশ্বকবি। স্কুলের পাঠ্যবইয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গল্প, কবিতা পড়তাম আর কেন জানি তখন ভাবতাম বড় হয়ে আমিও বিশ্বকবি হব! আমার ধারণা ছিল বিশ্ব কবি হওয়ার জন্য স্কুলের জরিমানা মৌকুফের নিমৃত্তে লেখা আবেদনের মত কোন বিশ্ব সংস্থায় নিজের কবিতার পান্ডলিপি সহ আবেদন করতে হয়; দায়িত্বপ্রাপ্তরা যাচায় বাছায় করে যোগ্য কবিকে “বিশ্বকবি” অভিধা দেন এবং প্রতিবছরই এটা দেওয়া হয়। হয়তো যোগ্য কাউকে পাওয়া যায়নি, তাই এত বছর দেওয়া হয়নি।

এপ্রিল ২:

. . . তারপরও আমি চেয়েছি খুব ছোট অথচ অনেক বেশি ভালোবাসায় পূর্ণ একটা প্রেমপত্র তোমাকে দিতে, যা আমি মরে যাওয়ার পরও তুমি বুড়ি হয়ে থুরথুরে শরীর নিয়ে পুরনো ট্রাংক থেকে বের করে পড়ার সময় যেন তরতাজা আর সদ্য লেখা মনে হয়।

এপ্রিল ৬:

2. . . এই শুকনো রুক্ষ ঠাঠা শহরের ব্যালকনিতে দাড়িয়ে মায়ের কথা খুব মনে হয় তোমার; একটা চাপা নিঃশব্দ কান্না এসে আচ্ছন্ন করে তোমাকে, মনে হয় এই কান্নার জল কেবল মায়ের চোখই দেখতে পারে, এই নিঃশব্দ কান্নার চিৎকার কেবল মায়ের কানই শুনতে পারে। তুমি যেন, চিৎকার করে ডাক দাও, মা, তোমার লাঠিটা কই, আমাকে মার, আমি তোমার মার খেতে চাই। আমি খুব খারাপ হয়ে গেছি মা, বিশ্বাস কর, আমি আর সাদা স্যালোয়ারে কচু পাতার দাগ লাগাইনি; ওরা জোর করে লাগিয়ে দিয়েছে। আমার স্যালোয়ারটা ধুয়ে দেবে মা? মা তোমার লাঠিটা কই? আমাকে মার, আমি আর কচু গাছের পাশ দিয়ে যাব না। . . .

জুন ১১:

… … আমি প্রায়শই রোমিও হয়ে যেতাম আর জুলিয়েটের ঠোট স্বপ্নে দেখতে শুরু করলাম। এমনই স্বপ্নে বিভোর থাকতে থাকতে একদিন এরেন্দিরার প্রেমে পড়ি। এরেন্দিরা গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের “সরলা এরেন্দিরা আর তার নিষ্ঠুর দাদিমার গল্পে”র নায়িকা, যে দাদিমার নিষ্ঠুর লালসার শিকার হয়ে পতিতাবৃত্তি করতে একরকম বাধ্য হয়। ক্রমাগত সার বেধে আসা পুরুষেদের তৃপ্ত করে যার বিনিময়ে ওর দাদিমা পয়সা গোনে। গল্পটা পড়ার পর মনটা খারাপ হয়ে গেল। যদিও আমার উত্তেজিত হওয়ার কথা ছিল, কেন জানি হলাম না বরং এরেন্দিরার জন্য একটা চাপা কষ্ট, সম্ভবত ভালোবাসা অনুভব করলাম আর তখনই বুঝে গেলাম আমার মধ্যে একটা ভালো মানুষ আছে যে ভালোবাসা আর নির্যাতনের তফাত বোঝে। … … …

মোস্তাফিজুর রহমান উপন্যাস রচনাকে শক্তপোক্ত আর গভীর মনোযোগের বিষয় বললেও, বেশ মুনশিয়ানার পরিচয় দিয়েছেন তিনি। বাংলা সাহিত্যে চমৎকার একটি উপন্যাস সংযুক্ত হওয়ার প্রতিক্ষায়।

ফেসবুক মন্তব্য