ঢাকা শনিবার, সেপ্টেম্বর ২২, ২০১৮

Mountain View



ঈদ আনন্দে টাঙ্গাইলের তাঁতের শাড়ি, নতুন যোগ হয়েছে থ্রি-পিস

Print Friendly, PDF & Email

মু.জোবায়েদ মল্লিক বুলবুল, টাঙ্গাইল : ‘নদী চর খাল-বিল,গজারির বন, টাঙ্গাইল শাড়ি তার গর্বের ধন।’ এ প্রবাদেই মেলে টাঙ্গাইল শাড়ির পরিচয়। মান, নকশা আর বৈচিত্রই শুধু নয়, এ শাড়ির ঐতিহ্যও অনেক পুরনো। সে জন্য দেশ এবং দেশের বাইরের লক্ষ-কোটি বাঙালি রমণীর অন্যতম পছন্দ টাঙ্গাইলের তাঁতের শাড়ি। এই শাড়ির কদর এখনও কমেনি বরং যোগ হয়েছে আধুনিকতা। যুগ ও সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে টাঙ্গাইলের শাড়িতে এসেছে নতুনত্ব। বিভিন্ন সময় শাড়ির নকশায় নিয়ে আসা হয়েছে দৃষ্টিনন্দন সব পরিবর্তন। এমনও হয়েছে, দেশের বিভিন্ন এলাকার তাঁতীরা এই শাড়ির অনুকরণ করেছেন। কিন্তু তারা সফল হননি। এসব কারণে বিভিন্ন উৎসবের বাজারে এ শাড়ির আলাদা একটি গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হয়েছে। সে কথা মাথায় রেখেই প্রস্তুতি নিয়ে থাকেন টাঙ্গাইলের তাঁতীরা। এবারের ঈদের বাজারের প্রস্তুতিও তার ব্যতিক্রম ছিলনা।

tangail 3

মুসলমানদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে শাড়ি তৈরিতে ব্যস্ত সময় কাটিয়েছেন-এখনও কাটাচ্ছেন টাঙ্গাইলের শাড়ির রাজধানী হিসেবে খ্যাত পাথরাইলের তাঁত সমৃদ্ধ এলাকার তাঁতশিল্পীরা। তবে তারা এবার শুধু শাড়ি তৈরি করছেন না, এর সঙ্গে যুক্ত করেছেন বিভিন্ন নকশার থ্রি-পিস। ঈদের চাহিদা মেটাতে জেলায় প্রায় ৭০ হাজার তাঁতে গড়ে ৩ লাখ তাঁতশিল্পী দিন-রাত কাজ করছেন। ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত তাঁতের খট্ খট্ শব্দে টাঙ্গাইলের দেলদুয়ার উপজেলার পাথরাইল, নলশোধা, বাজিতপুর, টেগুড়ি, বীরপুষিয়া, গোপালপুর, নলসন্ধ্যা, চন্ডি, রূপসী, ডুলুটিয়া, কালিহাতী উপজেলার বল্লা, রামপুর, মমিননগর, কোকডহরা, নাগবাড়ি, কাজীবাড়িসহ বিভিন্ন এলাকার তাঁতীরা ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন। তারা মেধা এবং শ্রম দিয়ে নিঁপুণ দতায় তৈরি করছেন ঐতিহ্যবাহী টাঙ্গাইল শাড়ি।

তাদের তৈরি শাড়ি এলসির মাধ্যমে দেশের সীমানা পেড়িয়ে চলে যাচ্ছে দেশের বাইরে। ভারতের বাজারের বাড়তি আকর্ষণ এখন টাঙ্গাইলের তাঁতের শাড়ি। টাঙ্গাইলের শাড়ি কেনার জন্য পাথরাইল, বল্লা এলাকা সহ করটিয়া, বাজিতপুর হাটে ভিড় করছেন ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলার শাড়ি ব্যবসায়ীরা। ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে মহিলারাও তাঁত সমৃদ্ধ এলঅকায় এসে পছন্দ অনুযায়ী শাড়ি কিনে নিয়ে যাচ্ছেন। গ্রাহকের চাহিদা মেটাতে এ সময় তাঁতীদের দিন-রাত পরিশ্রম করতে হচ্ছে। পরিবারের অন্যান্য সদস্যরাও শাড়ি তৈরির কাজে তাঁতীদের সাহায্য করছেন। কিন্তু তারপরও চাহিদা অনুযায়ী শাড়ি সরবরাহ করতে হিমশিম খাচ্ছেন তারা। এ জন্য তাঁতীদের অতিরিক্ত শ্রম দিতে হচ্ছে। কিন্তু বাড়তি পারিশ্রমিক তারা পাচ্ছেন না। এর ফলে সীড লুম তাঁতীর সংখ্যা দিন দিন কমে যাচ্ছে। এ অঞ্চলে ২০০১ সালে সীড লুম তাঁতীর সংখ্যা ছিল ২ হাজার ১৬২জন। বর্তমানে এ সংখ্যা এসে দাঁড়িয়েছে ৯৮১ জনে। তাঁতের সংখ্যাও ৭ হাজার ৩৫ থেকে ১ হাজার ৪৮৯টিতে নেমে এসেছে।

tangail 2

পারিশ্রমিক প্রসঙ্গে তাঁতীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ভাল একটি শাড়ি তৈরি করতে ৫-৭ দিন সময় লাগে। এ জন্য তারা পারিশ্রমিক পান ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা। বর্তমান দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির বাজারে যা খুবই সামান্য।

অপরদিকে, সুতা ও রঙসহ শাড়ি তৈরির উপকরণের মূল্য দফায় দফায় বৃদ্ধির কারণে বরাবরের মতো এবারও শাড়ি বিক্রি হচ্ছে অনেকটা চড়া দামে। আগে টাঙ্গাইলের তাঁতে শুধু সাধারণ মানের শাড়ি তৈরি হত। কিন্তু এখন বাহারি নকশার দামি শাড়িও তৈরি হচ্ছে। ঈদের মার্কেটে এবার সফ্ট সিল্ক, জামদানী, সুতি, ধানসিঁড়ি, আনারকলি, গ্যাস সিল্ক, একতারি, দোতারি ও রেশম শাড়ির চাহিদা বেশি। শাড়িগুলো পাঁচশ’ থেকে ৪০ হাজার টাকা দামে বিক্রি হচ্ছে। এখন টাঙ্গাইল শাড়ি নিম্নবিত্তের সীমানা ডিঙ্গিয়ে উচ্চবিত্ত এবং ফ্যাশন সচেতন নারীর মন জয় করে নিতে সম হয়েছে। পার্শ্ববর্তী দেশে ভারতেও টাঙ্গাইলের তাঁতের শাড়ি দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। টাঙ্গাইল শাড়ির নকশায় বৈচিত্র্য থাকার কারণেই এমন ঘটছে বলে মন্তব্য করেন শাড়ি কিনতে আসা ভারতীয় ব্যবসায়ী অপর্ণা বসাক।

টাঙ্গাইল শাড়ির ডিজাইনার ও পাথরাইলের নীল কমল শাড়ির স্বত্বাধিকারী নীল কমল বসাক জানান, ঈদকে সামনে রেখে প্রতি বছরের মতো এবারও তারা বাহারি ডিজাইনের শাড়ি তৈরি করেছেন। ক্রেতার চাহিদা আর যুগ ও সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে নকশায়ও এনেছেন নতুনত্ব। ক্রেতা-ভোক্তাদের কাছে টাঙ্গাইলের শাড়ির যে সুনাম রয়েছে তারা সেই সুনাম ধরে রাখতে বদ্ধ পরিকর।

তিনি আরো জানান, শাড়ির সাথে এবার তারা যোগ করেছেন থ্রি-পিস। সব সময় ব্যবহার উপযোগী আর কাপড়ের মান ভালো বলে এই থ্রি-পিসের উল্লেখযোগ্য চাহিদা দেখা যাচ্ছে।

ঢাকা থেকে সরাসরি এখানে শাড়ি কিনতে আসা এক দম্পতি জানান, ঈদ মাকের্টের ভিড় এড়িয়ে নিরিবিলি ও স্বাচ্ছন্দে নিজের এবং প্রিয়জনকে উপহার দেয়ার জন্য পছন্দের শাড়ি কিনতে এখানে এসেছেন। বড় বড় বিপণীবিতান, মার্কেট ও শো-রুমের চেয়ে অনেক কম দামে এখানে শাড়ি পাওয়া যায়। তাই প্রতি বছর ঈদের শাড়ি কিনতে তারা এখানে চলে আসেন। তবে অন্যান্য বছরের চেয়ে এবার শাড়ির দাম কিছুটা বেশি মনে হচ্ছে বলেও জানান তারা।

ঢাকার সাভার থেকে আসা শাড়ি ব্যবসায়ী রাইসুল, জয়নাল জানান, ঈদকে সামনে রেখে তারা শাড়ি নিতে এসেছেন। এখানকার শাড়ির চাহিদা অনেক। এবং মানও ভালো, দামটাও তুলনামূলক কম। এর আগেও তারা কয়েক হাজার শাড়ি নিয়ে গেছেন। স্টক ফুরিয়ে যাওয়ায় আবারও এসেছেন।

tangail 4

প্রখ্যাত তাঁত শাড়ি ব্যবসায়ী যজ্ঞেশ্বর অ্যান্ড কোং-এর সত্বাধিকারী রঘুনাথ বসাক জানান, ঈদ উপলক্ষে টাঙ্গাইলের শাড়ির ব্যবসা এবার তেমন জমে ওঠেনি। সুতার দাম কম হলে ঈদের বাজার জমজমাট হতো এবং তাঁতীরা লাভবান হতে পারতো। সুতার দাম সিল্ক প্রতি কেজি ৬ হাজার টাকা দরে, কটন প্রতি বান্ডিলে ৪ হাজার ১০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। সুতার দাম বাড়লেও কাপড়ের দাম তুলনামূলকভাবে বাড়েনি। এ জন্য মুনাফা কম হচ্ছে। ঈদের বাজারে এবার টাঙ্গাইলের শাড়ির ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। ঈদ উপলে তাঁতের শাড়ি ছাড়াও সিল্ক, জামদানি, দোতারি, রেশম, আনারকলি, তসর শাড়ির চাহিদাও কম নয়। সিল্ক শাড়ি সাড়ে ৩ হাজার টাকা থেকে ১২ হাজার, নেট জুট সাড়ে ১০ হাজার, বাহারি শাড়ি সাড়ে ১৬ হাজার, কটন জুট আড়াই হাজার, টিস্যু, সিল্ক সাড়ে ৪ হাজার টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।

তিনি আরও জানান, তাঁতের ব্যবসা পরিচালনা করতে প্রচুর অর্থের প্রয়োজন। সরকার যদি স্বল্প সুদে তাঁতীদের ব্যাংক ঋণের ব্যবস্থা করতো তাহলে তাঁত ব্যবসায়ীদের হিমশিম খেতে হতো না। শাড়ির দাম বেশি-ক্রেতাদের এমন অভিযোগ স্বীকার করে তিনি জানান, বর্তমান বাজার দরের সাথে পাল্লা দিয়ে শাড়ি তৈরির উপকরণগুলোর দাম আগের চেয়ে বেড়েছে। তাছাড়া শ্রমিক মজুরিও বেশি। ফলে এর প্রভাব শাড়ির দামের ওপর পড়ছে।

সবকিছু ঠিক থাকলে ঈদের বাজারে অতীতের মতো টাঙ্গাইলের তাঁতের শাড়ি স্বকীয়তা বজায় রেখে ক্রেতার মন জয় করবে বলে মনে করছেন অনেকে। পাশাপাশি সরকারি সহযোগিতা পেলে দেশের বাজারের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশেও বিপুল পরিমানে টাঙ্গাইলের শাড়ি রপ্তানি করা সম্ভব হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা।

ফেসবুক মন্তব্য