ঢাকা রবিবার, সেপ্টেম্বর ২৩, ২০১৮

Mountain View



যমুনার ভাঙ্গনে টাঙ্গাইলের মানচিত্র থেকে হারিয়ে যাচ্ছে ১৫ গ্রাম

Print Friendly, PDF & Email

মু.জোবায়েদ মল্লিক বুলবুল, টাঙ্গাইল : যমুনা নদীর নজীরবিহীন ভাঙ্গনে টাঙ্গাইলের ভূঞাপুর, গোপালপুর ও নাগরপুর উপজেলার ১৫টি শতাব্দি প্রাচীন গ্রাম মানচিত্র থেকে হারিয়ে যাচ্ছে। গ্রামগুলো হচ্ছে, ভূঞাপুরের চরবিহারী, জুঙ্গীপুর-রুলীপাড়া, বেলটিয়া, চানগঞ্জ, রেহাই গাবসারা, রামপুর, বিশ্বনাথপুর , গোপালগঞ্জ; গোপালপুরের পশ্চিম শাখারিয়া, চর ভরুয়া, সোনামুই, চর সোনামুই এবং নাগরপুর উপজেলার আটাপাড়া, মারমা ও ধলাই।

জানাগেছে, ভূঞাপুরের গাবসারা ইউনিয়নের ৮টি গ্রামসহ প্রায় ১ হাজার পরিবার গৃহহীন ও শত শত একর ফসলি জমি যমুনাগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। এ ছাড়া বঙ্গবন্ধু সেতুর উত্তরে যমুনা নদীর বাঁধ হুমকির মুখে পড়েছে। প্রতিদিনই একের পর এক নতুন পরিবার গৃহহীন ও ফসলি জমি নদীগর্ভে হারিয়ে যাচ্ছে। ভাঙ্গনের তীব্রতা এতই বেশি যে, লোকজন ঘরবাড়ি সরানোরও সময় পাচ্ছে না। এ সব এলাকার লোকজন বঙ্গবন্ধু সেতু রক্ষা গাইড বাঁধের পাদদেশে ও খোলা আকাশের নিচে মানবেতর জীবনযাপন করছে।

unnamed (2)

ভাঙ্গন কবলিত চরবিহারী গ্রামের আবু সাঈদ (৯০), রুলীপাড়া গ্রামের মর্তুজ ফকিরসহ (৮৫) অনেকেই বলেন, ‘যমুনা নদীর ভাঙ্গনে ১৫-২০ বার করে বাড়ি সরিয়েছি। আর পারছি না। স্থায়ী কোনো জায়গায় শান্তিতে মরতে চাই।’

গোপালপুর উপজেলার পশ্চিম শাখারিয়া ও চর ভরুয়া ইতোমধ্যে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। গত এক সপ্তাহে চর সোনামুই গ্রামের অর্ধেক নিমজ্জিত হয়েছে।

জেলার নাগরপুর উপজেলার ভাড়রা ইউনিয়নের চরাঞ্চলের ৩টি গ্রামে নতুন করে ভাঙ্গন দেখা দিয়েছে। হুমকির মুখে পড়েছে কমপে ৫ শতাধিক পরিবার। ভাঙ্গনের শিকার হয়ে বিলীন হয়েছে দুটি মসজিদ ও একটি গোরস্থান সহ কমপে ২০০ একর ধানি জমি। এছাড়া ৪টি কাঁঠালের বাগান, বাঁশ ঝাড়েরও ব্যাপক তি হয়েছে। ইতোমধ্যে শতাধিক পরিবারের বসত ভিটা যমুনার পেটে চলে গেছে। গৃহহীন এসব পরিবার খোলা আকাশের নিচে মানবেতর জীবন যাপন করছে।

unnamed

গত এক সপ্তাহে নাগরপুর উপজেলার যমুনা তীরবর্তী ৪ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে নতুন করে তীব্র ভাঙ্গন দেখা দিয়েছে। বর্তমানে নদীর পূর্বপাড় নাগরপুর উপজেলার ভাড়রা ইউনিয়নের আটাপাড়া, মারমা ও ধলাই গ্রামের বিস্তীর্ণ এলাকায় ভাঙ্গনের তীব্রতা ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। গত সাত দিনের ব্যবধানে নতুন করে ভাঙ্গনের শিকার হয়েছে ওই ৩ গ্রামের অন্তত শতাধিক পরিবারের বসত ভিটা। নদী তীরবর্তী শত শত পরিবার হুমকির মুখে পড়ায় তাদের ঘরবাড়ি অন্যত্র সরিয়ে নিচ্ছে। প্রতি বছর ধলাই, খাসধলাই, আটাপাড়া ও মারমা গ্রাম ভাঙ্গনের শিকার হলেও ভাঙ্গন ঠেকাতে পানি উন্নয়ন বোর্ড ও স্থানীয় প্রশাসন এ পর্যন্ত কার্যকর কোন উদ্যোগ গ্রহণ করেনি।

ভাঙ্গন কবলিত এলাকার লোকজন জানায়, ভাঙ্গনরোধে দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে গোপালপুর উপজেলার চর সোনামুই গ্রামটিও মানচিত্র থেকে হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সোনামুই গ্রামের প্রবীণ ব্যক্তি ছানোয়ার হোসেন জানান, তারাকান্দি-ভূঞাপুর যমুনা বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ নির্মাণের সময় ৪টি শতাব্দী প্রাচীন জনপদকে বাঁধের বাইরে রাখা হয়। এটিই ছিল সর্বনাশের মূল কারণ। পরবর্তীতে বঙ্গবন্ধুসেতু নির্মিত হলে যমুনার মূল স্রোতধারা পূর্ব দিকে ক্রমান্বয়ে সড়ে আসতে থাকে। বর্ষাকালে তা গ্রামে হানা দেয়। গত কয়েক দিনের ভাঙ্গনে গোপালপুর উপজেলার সহস্রাধিক একর আবাদী জমি, পাঁচ শতাধিক বাড়িঘর বিলীন হয়েছে। স্কুল, মাদ্রাসা, মসজিদ, দোকানপাট কিছুই রেহাই পায়নি। নিম্নবিত্ত চাষীরা ঝাওয়াইল কৃৃষি ব্যাংকের ঋণে ৫০০ একরে গ্রীস্মকালীন সব্জির আবাদ করেছিল। ভাঙ্গনে যমুনা তা গ্রাস করেছে। তিগ্রস্তরা বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধে আশ্রয় নিয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছে। বাঁধের পশ্চিম অংশের অনেক বাসিন্দা এখনও পানি বন্দী। ঘরে খাবার নেই। ডায়রিয়া দেখা দিয়েছে। একমাত্র স্কুলটি নিমজ্জিত পানিতে।

unnamed (1)

গোপালপুর উপজেলা চেয়ারম্যান ইউনুস ইসলাম তালুকদার জানান, বাঁধে আশ্রয় নেয়া পরিবারগুলো অনাহার-অর্ধাহারে দিনযাপন করছে। বরাদ্দের অভাবে নিঃস্ব মানুষের মধ্যে নূন্যতম ত্রাণ সামগ্রী বিতরণ করা সম্ভব হয়নি।

নাগরপুর উপজেলার ভাড়রা ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান আবু বক্কর সিদ্দিক জানান, ভাঙ্গন রোধে জরুরি ভিত্তিতে কাজ শুরু না করলে যে কোন মুহুর্তে ৩টি গ্রাম নদী গর্ভে বিলীন হয়ে যাবে। মানচিত্র থেকে হারিয়ে যাবে, ধলাই, আটাপাড়া ও মারমা গ্রাম। ভাঙ্গনের শিকার ওই গ্রামের অশীতিপর বৃদ্ধা রঙ বাহার, আইয়ুব আলী সিদ্দিক, সালাম, সামাদ, ছরোয়ার সন্তোষ, তমেজ, বাবু ও ফরিদসহ শতাধিক পরিবার খোলা আকাশের নিচে মানবেতর জীবন যাপন করছে। এখনও ভাঙ্গন কবলিত এলাকায় ত্রাণ পৌঁছায়নি। ভাঙ্গনের শিকার ওই গ্রামগুলোকে দূর্গত এলাকা ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন ক্ষতিগ্রস্তরা।

টাঙ্গাইলের জেলা প্রশাসক মো. মাহবুব হোসেন জানান, নাগরপুরে ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য ত্রাণ সামগ্রী বরাদ্দ করা হয়েছে। ইউএনও’র মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট এলাকায় পৌঁছানো হয়েছে। এছাড়া গোপালপুর ও ভূঞাপুরের ইউএনও এখনও ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য জেলা প্রশাসনের কাছে বরাদ্দ চায়নি। চাওয়া মাত্রই দেয়া হবে।

ফেসবুক মন্তব্য