ঢাকা বৃহস্পতিবার, এপ্রিল ২৬, ২০১৮

Mountain View



যৌন সংক্রমণে নিউজ পোর্টাল!

Print Friendly, PDF & Email

জব্বার হোসেন : আমি যদি জানতে চাই, সেক্সসাইটে ঢোকেন কি না, পর্নোসাইট ক্লিক করেন কি না, বেশিরভাগ লোকই বলবেন, কখনও না। কেউ কেউ আবার আমাকে গালমন্দও করবেন। বলবেন-অসভ্য, ইতর, দুশ্চরিত্র, লম্পট কোথাকার! সেক্স বা পর্নো শব্দটি তারা কখনোই গুগলে সার্চ করেন না। ক্লিক তো দূরের কথা। কিন্তু আমি বলব অন্য কথা। আমি সচেতনভাবেই সেক্স সাইট ভিজিট করি। পর্নো সাইটেও ক্লিক করি। শুধু ক্লিক করি না, রীতিমত কাগজ কলম নিয়ে বসি। মানুষের যৌন মনস্তত্ব, আচরণ নিয়ে লেখালেখি আমার অনেক দিনের কাজ। ফলে আমাকে ঢুকতেই হয়, দেখতেই হয়। এ নিয়ে কথা না বলি।

তবে যৌন রুচি ও চাহিদা নিয়ে দুনিয়াজুড়ে তর্কের শেষ নেই। প্রাচ্য-পাশ্চাত্য সবখানেই তর্ক চলছে। সে অন্য প্রসঙ্গ। আজকের প্রসঙ্গ নিউজ সাইটের বিকৃতি, বিভ্রান্তি ও যৌন সংক্রমণ!

নিউজ সাইটের হালের হালচালকে বিবর্তন বা ট্রান্সফরমেশন বলবার সুযোগ কোথায়? তারা তো পুরোপুরি সেক্স সাইটও হচ্ছে না, পর্নোসাইটও না, আবার একেবারেই যে হচ্ছে না তাও তো না। এ এক অদ্ভুত ধোঁয়াশা!

এই মুহূর্তে দেশে অনলাইন নিউজ পোর্টালের সঠিক হিসাব খোদ তথ্যমন্ত্রণালয়ের কাছেও নেই। থাকবে কি করে, গণমাধ্যমের স্বাধীনতার নামে রীতিমত যথেচ্ছ ব্যবহার তো চলছে। অবাধ নিরপেক্ষতার কথা বলে, যেকোনো দায়িত্বহীন মন্তব্য অনেকের রীতিমত অভ্যাসে পরিণত। অনলাইনের কোনো নীতিমালাও নেই। ডোমেইন হোস্টিং হলেই হয়। যেকোনো তথ্য, মিথ্যাচার, বানোয়াট খবর দেখবার কেউ নেই। ‘মনিটর’ বলে শব্দটি সুদূরে।

কোনও কোনও অনলাইন যে কোথা থেকে কিভাবে, কি কারণে চলছে, চালাচ্ছেন কারা তা নিজেরা ছাড়া কেউই জানেন না।

গণমাধ্যমের মানুষ আমি। যোগাযোগ নিয়ে কাজ করছি দীর্ঘদিন। ফলে ব্যক্তিগত কৌতুহলের বাইরেও মিডিয়া মনিটর আমার কাজের মধ্যেই পড়ে। দেখতে হয় ব্রডকাস্ট, প্রিন্ট এবং অনলাইন জার্নালিজমের খুঁটিনাটি। খবরের ক্ষুধায় অনলাইনে বিচরণ। কিন্তু একি! একি কাণ্ড! রীতিমত বিস্মিত আমি; শুধু বিস্ময় নয়, বিরক্তিও বোধ করি! বিব্রত তো বটেই!

অনেক বেশি ভিজিট হয়, এমন একটি নিউজ সাইটের কয়েকটি খবর এমন-

‘বাবাকে চিনি না, আমি ধর্ষণের ফসল’, ‘তরুণী রোগীকে অজ্ঞান করে একি করলেন ডাক্তার (ভিডিওসহ)’, ‘মীমের পর নগ্ন ভিডিও সারিকার’, ‘মা মেয়ের এক স্বামী’, ‘চিলি জিতলেই টানা ২৬ ঘন্টা যৌনতার সুযোগ’, ‘সেক্সের সময় যে ভুলগুলো হয়ে থাকে (ভিডিওসহ)’, ‘অর্থের জন্য হোটেলে কলেজ ছাত্রী (ভিডিওসহ)’, ‘স্ত্রীকে ধর্ষণের পর বন্ধুর সঙ্গে সহবাসের চাপ স্বামীর’, ‘দুইশত নারীকে যৌন মিলনের আহ্বান এক যুবকের’, ‘যৌন উত্তেজনা হলেই পোষাক খুলে পড়বে’।

আরেকটি সাইটের নমুনা –

‘সেক্স বিষয়ে তিনটি সত্যি কাহিনী’, ‘শাশুড়ির কারণে ডিভোর্স’, ‘নারীর অপছন্দের পুরুষ’, ‘মৃত স্বামীর সঙ্গে প্রতিদিনকার সহ-জীবন’, ‘শখের বসে গোপনাঙ্গ সার্জারিতে ঝুঁকছে নারীরা’, ‘যা হলে মেয়েদের যৌবন শেষ হয় না’, ‘যৌন মিলন রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়’, ‘যৌন মিলন না করলে ডায়েবেটিকস হতে পারে’, ‘স্বামী বিদেশে স্ত্রীরা পরকীয়ায়’, ‘আবারও অন্তঃসত্ত্বা শাকিরা’, ‘বলিউডে আরেক সানি লিওনে প্রমিতা’- এসব হচ্ছে খবর।

রীতিমত শিউরে ওঠার মতো ব্যাপার। শুধুমাত্র এসব নিউজের মধ্যেই তারা সীমাবদ্ধ বিষয়টি তা নয়, নানা ধরনের সেক্স ভিডিও আপলোড হচ্ছে। সফট পর্ন থেকে শুরু করে হার্ডকোর, বাদ পড়ছে না কিছুই। মিথ্যা খবর, ভুল খবরের ছড়াছড়ি। যৌনতার বিষয়েও বিভ্রান্তির শেষ নেই। ‘দ্রুত বীর্যপাত একটি কমন সমস্যা। পুরুষদের কেন দ্রুত বীর্যপাত হয়। এক সময় পুরুষাঙ্গে হাড় ছিল’ এই জাতীয় খবর ‘ভুল’ বা ‘বিভ্রান্তিকর’ তথ্যই নির্দেশ করে। ফলে যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্যে এই ধরনের খবর বিরূপ প্রভাব ফেলে।

আরেকটি বিষয় বেশ লক্ষ্যণীয়- নির্বাসিত লেখক তসলিমা নাসরিনের বিভিন্ন লেখার অংশ বিকৃতি, কখনও কখনও যেকোনও যৌন উত্তেজক লেখাকে তার বলে চালানো, এসব এই সাইটগুলো চলে নিয়মিত। যেহেতু তসলিমা নারীবাদী লেখক, তসলিমা নির্বাসিত, তসলিমাকে বিতর্কিত বলে প্রচার আছে, ফলে ‘তসলিমা’ নামটি তাদের বাণিজ্যিক সফলতার জন্য সুবিধাজনক।

এসব সাইটের আরও ভয়ংকর, বিপজ্জনক দিকও রয়েছে। যেকোনোও জনপ্রিয় নারী তারকার সেক্স ভিডিও বেরিয়েছে বলে খবর প্রকাশ, এই কাণ্ডটি কদিন পর পরই তারা করে।

কদিন আগে ‘তিশার সেক্স ভিডিও নিয়ে তোলপাড়’ এই খবর প্রকাশিত হয় বেশ কিছু অনলাইনে। তার কদিন পর ‘এবার সারিকার সেক্স ভিডিও’। ফটোশপ, ভিডিও এডিটিংয়ের কারসাজিতে কতো কিছুই না হয়।

ব্যাস, খোঁজ দ্য সার্চ। এসব খবরের যৌক্তিকতা, সত্য-মিথ্যাও যাচাই করতে যান না কেউ। অনলাইনে তখন ‘Tisha sex video, Sarika sex video’নামে সার্চ চলে। মিথ্যে হলেও খবর ছড়িয়ে পড়ে দাবানলের মতো। এই খবরটি প্রতিষ্ঠিত হয় যে, ‘তিশা বা সারিকার’ গোপন ভিডিও বেরিয়েছে। হয়তো হাতে এসে পৌঁছায়নি এখনও। নিউজ সেনসেশনের জন্য, হিট বাড়ানোর জন্য অন্যের সামাজিক জীবনে, ব্যক্তিগত জীবনে কত বড় বিপর্যয় নেমে আসে, তাতে কিছুই যায় আসে না এইসব ব্যবসায়ীদের।

একসময় চিত্রবাংলা, বর্তমান দিনকাল, ছায়াছন্দ, খবর গ্রুপের পত্রিকাগুলো গসিপ নিউজ ছেপে, অন্যের চরিত্র হনন করে এক ধরনের বাজার নেওয়ার চেষ্টা করেছে। প্রায় সারাবছরই তসলিমা বিষোদগারও থাকত নিয়মিত। ‘যৌবনের রানী,’ ‘এক পুরুষে শখ মেটে না’, ‘নারীদের যৌন কামনা বাড়িয়ে দিচ্ছেন লেখিকা তসলিমা নাসরিন’ এমন অসভ্য, অশোভন শিরোনাম থাকত নিয়মিত। এখন কিন্তু এই পত্রিকাগুলো নেই। থাকলেও দু’একটা অনেক অনিয়মিত মৃত্যু ঘটেছে প্রায় সবকটারই।

এখন কথা হচ্ছে যে, খবরগুলোর শিরোনাম এখানে দেখানো হয়েছে এসব কি আসলেও কোনও খবর? হয়তো খবর। ধরে নিলাম খবর। যদি খবরও হয়, তাহলে কিসের খবর? কী নির্দেশ করে, যৌন সুড়সুড়ি ছাড়া? যদি যৌন উত্তেজনা বা যৌন সুড়সুড়ি প্রধান বা প্রাধান্য হয়ে থাকে, তবে নিউজ সাইটের প্রাইম স্লাইডে এসব খবর কেন? এসব খবরের জন্য, ভিডিওর জন্য তো আলাদা সাইটই রয়েছে। সারা দুনিয়াতেই রয়েছে। বরং বাংলাদেশেও দু’চারটে বড় ব্যানারের সেক্স সাইট থাকতে পারে। আমি তাকে অন্যায় দেখিনা, অপরাধ দেখিনা। সারা দুনিয়াতেই সেক্স সাইটের চল আছে, বিনিয়োগ আছে, বাজার আছে। কিন্তু যে জায়গাটিতে অন্যায় দেখি, তা হচ্ছে নিউজ সাইট আর পর্নোসাইটকে এক করে ফেলা। এসব খবর নেহাত পর্নো খবর ভিন্ন অন্য কিছু নয়। এইসব সাইটকে আমি সেমি-পর্নোসাইটই বলব।

বাজার ধরতে, কাটতি বাড়াতে, হিট আর হটের জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে খবর ব্যবসায়ীরা। অনলাইনজুড়ে ছড়িয়ে দিচ্ছে যৌন সুড়সুড়ি। কিন্তু মনে রাখতে হবে, নিউজ সাইটকে নিউজ দিয়েই বাজার ধরতে হয়। তাৎক্ষণিক ও সঠিক খবরটি প্রয়োজন। থাকতে হবে অনুসন্ধান। আড়ালে থাকা অপ্রকাশ্যের প্রকাশ দরকার। মুখোশের তলের মুখটি তুলে আনতে হবে। খুলতে হবে ছদ্মবেশ, তার যাবতীয় পোশাক -আশাক।

যৌনতা দিয়ে, অন্যের চরিত্র হনন করে, ধর্ষণ দৃশ্যের বর্ণনা পাঠক বা ভিজিটরকে আটকে রাখতে পারে না। বরং সাময়িক আগ্রহ, উত্তেজনা বাড়ায় হয় তো। কিন্তু সময়ের বিচারে শেষ পর্যন্ত অবস্থান তৈরি করতে পারে না।

এসব খবর নয়; দায়িত্বশীলতা, পাঠকের প্রতি ভালোবাসাই পাঠক বাড়াবে, গ্রাহক বাড়াবে। খবরের ক্ষুধা খবর দিয়েই মেটাতে হয়, অন্য কিছু দিয়ে নয়।

পাঠক হিসেবে আমি নিজেই কখনও নিউজ সাইটে গিয়ে পর্নো সাইটের স্বাদ পেতে চাই না। আমার নৈতিকতা বলে, নিউজ সাইটে গিয়ে এই স্বাদ পেতে চাওয়া বা দিতে চাওয়া-দুটোই অন্যায় ও অসভ্যতা।

লেখক: সম্পাদক সাপ্তাহিক কাগজ ও মিডিয়া ওয়াচ

ফেসবুক মন্তব্য