ঢাকা শুক্রবার, মে ২৪, ২০১৯

Mountain View



টাঙ্গাইল-ময়মনসিংহসহ বিভিন্ন জেলায় কলকাতার ভূয়া ডাক্তার সেজে ভবেশ ঘটকের প্রতারণা, হাতিয়ে নিয়েছে কোটি কোটি টাকা

Print Friendly, PDF & Email

bhobesh ghotok

মু. জোবায়েদ মল্লিক বুলবুল, টাঙ্গাইল : ভারতের কলকাতার পরিচয় ব্যবহার করে প্রশাসনের চোখকে ফাঁকি দিয়ে ভবেশ চন্দ্র ঘটক নামে এক ব্যক্তি দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রতারণারনার ফাঁদ পেতে বিগত প্রায় ২৫ বছরে কয়েক কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়ার চাঞ্চল্যকর খবর পাওয়া গেছে। সাধারণ মানুষের চিকিৎসার নামে প্রতারণা করে নেয়া টাকায় টাঙ্গাইলের পাকুল্যায় গড়ে তুলেছেন ৪ তলা বিশিষ্ট রাজপ্রাসাদ, ঢাকায় ৩ টি ফ্ল্যাট বাড়ি, কলকাতার জলপাইগুড়িতেও বাড়ি করেছেন নিজ নামে। বর্তমানে পাকুল্যা থেকে ভবেশ চন্দ্র ঘটক গা-ঢাকা দিয়েছেন, স্থানীয় লোকজন তার বাড়ি পাহারায় রেখেছে আর অপেক্ষা করছে কখন আসবে প্রতারক।

বিভিন্ন পত্রিকার টাঙ্গাইল ও ময়মনসিংহের ৭জন সাংবাদিক পৃথক ২টি টিমে ভাগ হয়ে অনুসন্ধান চালিয়ে জানাগেছে, টাঙ্গাইলের মির্জাপুর উপজেলার হালালিয়া গ্রামের মৃত সুধন্য কুমার ঘটকের ছেলে ভবেশ চন্দ্র ঘটক নিজেকে ভারতের কলকাতার ডাক্তার পরিচয় দিয়ে বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকার হাজার হাজার মানুষের সাথে দীর্ঘ প্রায় ২৫ বছর যাবত প্রতারণা করে যাচ্ছেন। ননমেট্রিক ভবেশ চন্দ্র ঘটকের চিকিৎসা পদ্ধতি ছিল ভিন্ন। আগে থেকেই ওষুধের নামসহ প্রেসক্রিপশন কম্পিউটারাইজড করা থাকতো। সকল রোগীর জন্য একই ধরনের প্রেসক্রিপশন ব্যবহার করতো। রোগী মারা না গেলেও কোন রোগী সুস্থ হয়েছে এমন কাউকে খুঁজে পাওয়া যায়নি।

অনুসন্ধান চালিয়ে বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায় তার কিছু রোগী দেখার চেম্বার খুঁজে পাওয়া যায়। মুন্সীগঞ্জের পুরাতন কাচারি রোডের সেবা মেডিকেল হল, দীন মোহাম্মদ সুপার মার্কেট (৩য় তলা) সামাদ সুপার মার্কেট, ঢাকার দক্ষিণ যাত্রাবাড়ি সাউথ এশিয়ান চক্ষু হাসতাপাল, হাজী মুনাম উদ্দিন ওয়াক্ফ এস্টেট মার্কেট, গাজীপুর জেলার চৌরাস্তার মেসার্স কুমিল্লা মেডিকেল হল, নেত্রকোনার পূর্বধলায় বিসমিল্লাহ্ মেডিকেল হল, সিলেটের বিয়ানীবাজারে মেসার্স তাসমিয়া ফার্মেসি, ময়মনসিংহের ফুলপুর উপজেলার মেসার্স কায়সার ড্রাগ সেন্টার, শম্ভুগঞ্জের তামিম মেডিকেল হল। এছাড়া জানা-অজানা আরও অনেক ব্যাঙের ছাতার মতো চেম্বার রয়েছে বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায়। সে সমস্ত জায়গায় ভুয়া এমবিবিএস ডাক্তার সেজে ভবেশ চন্দ্র ঘটক প্রতারণা করছে।

ভবেশ চন্দ্র ঘটকের প্রতারণার চটকদার প্রচারণা রয়েছে। তিনি দাবি করেন তার বাড়ি কলকাতার জলপাইগুড়ি। এমবিবিএস কলকাতা (নাক, কান ও গলা বিভাগ)। সম্পূর্ণ বিনা অপারেশনে ইনজেকশনের সাহায্যে নাকের পলিপাস, মক্সিলারি, সাইনোসাইটিস, গলার ফলিকিউলার, টন্সিলাইটিস, ফেরিনজাইটিস, কান পাকা, কানের পর্দা ছিদ্র প্রভৃৃতি জটিল রোগের চিকিৎসা দিয়ে সম্পূর্ণ আরোগ্য করে থাকেন। তিনি কলকাতা থেকে বিমানযোগে এসে প্রতিমাসে দু’দিন করে একটি চেম্বারে রোগীর চিকিৎসা দিয়ে থাকেন। যেখানে অপারেশন করলে লক্ষাধিক টাকা খরচ হয় সেখানে মাত্র ১৫-২০ হাজার টাকায় সম্পূর্ণ আরোগ্য হয়ে যায়। ইনজেকশন এবং অন্য ওষুধগুলো সরাসরি কলকাতা থেকে নিয়ে আসেন তিনি। এইরকম হাজারো প্রপাগান্ডা এবং সঙ্গে ব্যাগের ভিতর রক্ষিত বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায় রোগী দেখার চেম্বারের লিফলেট দেখিয়ে প্রায় ২৫ বছর ধরে ভুয়া ডাক্তার সেজে রোগীদের সাথে প্রতারণা করছেন। রোগীদের কাছ থেকে আদায় করে নিচ্ছেন কোটি কোটি টাকা। প্রতারিত হচ্ছে হাজার হাজার রোগী। প্রশাসনের চোখকে ফাঁকি দিয়ে টাঙ্গাইলের মির্জাপুর উপজেলার পাকুল্যায় গড়ে তুলেছেন ৪ তলা বিশিষ্ট রাজপ্রাসাদ, ঢাকায় ৩ টি ফ্ল্যাট বাড়ি, কলকাতার জলপাইগুড়িতেও বাড়ি করেছেন নিজ নামে। ভবেশ চন্দ্র ঘটক ডাক্তার কি-না তা মির্জাপুরের পাকুল্যা বাজার এলাকার কেউ বলতে পারেননি। তিনি এসএসসি পাস করেছেন এমন খবরও তারা জানেন না।

ময়মনসিংহের ফুলপুর উপজেলার মেসার্স কায়সার ড্রাগ সেন্টারের মালিক কায়সার আহমেদ জানান, আমার এখানে প্রায় ৫-৭ মাস রোগী দেখার জন্য প্রতি মাসের দুই মঙ্গলবার বসতেন। তার মাধ্যমে কোন রোগী ভাল হয়েছে কিনা তা তার জানা নেই। হঠাৎ করে সে রোগী দেখা বন্ধ করে দিয়েছে। তার মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। কায়সার ড্রাগ সেন্টারের মাইকিং ম্যান জুলহাস মিয়া জানান, এই চেম্বারে কমপক্ষে ২ হাজার রোগীর কাছ থেকে জন প্রতি ১৫-২০ হাজার টাকা নিয়েছে, কিন্তু কোন রোগীই সুস্থ হয়নি।

মুন্সীগঞ্জের সেবা মেডিক্যাল হলের জাহাঙ্গীর হোসেনের সাথে কথা বলে জানা যায়, ঐখানে তিনি মাসে দুইবার করে রোগী দেখতে যেতেন। কয়েক হাজার রোগীর কাছ থেকে চিকিৎসার নামে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়ে বর্তমানে তিনি গা-ঢাকা দিয়েছেন। একইভাবে কুমিল্লা মেডিকেল হলের সাদেকুর রহমান, মেসার্স তাসমিয়া ফার্মেসির সাবন আহমদ, বিসমিল্লাহ্ মেডিক্যাল হলের নূরুল আমিন জানান, ডাক্তার ভবেশ চন্দ্র ঘটক প্রথমে এসে তাদের ওখানে চেম্বার করে রোগী দেখার প্রস্তাব করেন। তিনি কলকাতা থেকে আসেন এবং বাংলাদেশে তার শ্বশুরবাড়ি। প্রথমে তাকে রোগী দেখতে দিলে তার চিকিৎসা পদ্ধতি নিয়ে সন্দেহ দেখা দেয়। তখন তারা তার সার্টিফিকেট দেখতে চাইলে তিনি সেগুলো কলকাতায় রেখে এসেছেন বলে জানান। পরে সার্টিফিকেট নিয়ে আসবেন বলে চলে যায় এবং পরবর্তীতে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রাখে।

এছাড়া, ময়মনসিংহের শম্ভুগঞ্জের তামিম মেডিকেল হলের মালিক মোস্তফা কামাল জানান, ডা. ভবেশ চন্দ্র ঘটকের মাইকিং ম্যান ফুলপুর উপজেলার জুলহাস উদ্দিনের মাধ্যমে তার পরিচয় ঘটে। রোগী দেখার চেম্বার দিতে চাইলে তিনি সরল মনে রাজি হন। ডা. ভবেশ কলকাতার জলপাইগুড়ির নাক, কান ও গলা বিভাগের একজন বিশেষজ্ঞ ডাক্তার এটা বিশ্বাস করেই চলে যায় ৮টি মাস। প্রতি মাসে ২দিন চলে রোগী দেখা। লম্বা হতে থাকে রোগী দেখার সিরিয়াল। এরই মধ্যে ঘনিষ্ঠতা জমায় মোস্তফা কামালের সাথে। ডা. ভবেশ মাঝে মধ্যেই নিয়ে যেতেন ময়মনসিংহের সেরা রেস্টুরেন্ট ধানসিঁড়িতে। তাকে জামাই আদর করতেন। মোস্তফাও বিশ্বাস করতে থাকেন ডা. ভবেশ চন্দ্র ঘটককে। এই সম্পর্ককে পুঁজি করে প্রতারণার ফাঁদ পাতেন ভবেশ। কলকাতার জলপাইগুড়ির দোকান বিক্রি করে বাসার কাজ সম্পন্ন করবেন কিন্তু দোকান বিক্রি না করতে পারার অজুহাতে ১৫ লাখ টাকা ধার হিসেবে দেওয়ার দাবি জানান মোস্তফার কাছে। একই সঙ্গে কিছু লোভনীয় প্রস্তাবও দেন যে, কলকাতার জলপাইগুড়িতে নিয়ে গিয়ে ব্যবসার সুযোগ করে দিবেন। এসব কথা বলেই মোস্তফার কাছ থেকে ১৫ লাখ টাকা হাতিয়ে নেন। এরপর থেকে ডা. ভবেশ চন্দ্র ঘটক নিখোঁজ। রোগী দেখা বন্ধ। অনুসন্ধান চালিয়েও তার কোন খোঁজ পাওয়া যায় না। কোন চেম্বারের মালিকরা বলতে পারে না ভুয়া ডা. ভবেশ চন্দ্রের প্রকৃত ঠিকানা কোথায়। তাকে খুঁজতে খুঁজতে অনেকেই টাঙ্গাইলের মির্জাপুর উপজেলার পাকুল্যা বাজার সংলগ্ন ৬ তলা ফাউন্ডেশন বিশিষ্ট অট্টালিকার সন্ধান পেলেও তার দেখা মেলেনি ভূক্তভোগি কারও। ইতোমধ্যে এলাকাবাসী জেনে ফেলেছে তার অপকর্ম, বিক্ষুব্ধ তারা। ভবেশ ঘটককে পেলে গণধোলাই দিয়ে পুলিশে সোপর্দের অপেক্ষা করছেন প্রতারিত জনতা।

অনুসন্ধানে আরো জানা যায়, প্রতারণার টাকায় তার শ্যালক সুমন ঘটককে টাঙ্গাইল শহরে একটি মোবাইল ফোন বিক্রির দোকান করে দিয়েছেন। স্থানীয় কয়েকজন নামধারী সাংবাদিকের সাথে তার শ্যালকের রয়েছে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। এ সম্পর্ককে কাজে লাগিয়ে তিনি নিজেকে আড়াল করার প্রয়াস পেয়েছেন। তাদের মাধ্যমে অনুসন্ধান টিমকেও অনুরোধ করেন যাতে কোন সংবাদ কোথাও প্রকাশ না হয়।

অনুসন্ধানের এক পর্যায়ে সাংবাদিকদের কথা হয় ভূয়া ডা. ভবেশ চন্দ্র ঘটকের সাথে। তিনি জানান, কলকাতায় তার কোন ঠিকানা নেই। ডাক্তারির সার্টিফিকেট তার নেই বলে অকপটে স্বীকার করেন। বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায় ২৫ বছর ধরে তার চলছে এ অনিয়ম তাও স্বীকার করেন। তিনি অভিযোগ করে বলেন, শুধু আমি কেন আমার মতো বাংলাদেশে প্রায় ২ হাজার ভুয়া এমবিবিএস ডাক্তার রয়েছে যারা আমার মত এভাবে চিকিৎসা দিয়ে আসছে। তিনি তার এসব কাহিনী প্রকাশ না করার অনুরোধ জানান।

ফেসবুক মন্তব্য