ঢাকা শনিবার, নভেম্বর ১৭, ২০১৮

Mountain View



আজ নববর্ষঃ বাঙ্গালীর দেনা পাওনা শোধের দিন

Print Friendly, PDF & Email

Menon Rangdhanu 01 (Medium)মোঃ রাশেদ খান মেনন (রাসেল): আজ ১ বৈশাখ নববর্ষ। বাঙ্গালীর দেনা পাওনা শোধের দিন। ব্যবসা-বাণিজ্যে আজকের এই দিনেই নতুন বছরের জন্য হালখাতা খোলা হয়। বাংলা ১৪২১ বঙ্গাব্দকে বিদায় ও নতুন ১৪২২ বঙ্গাব্দকে বরনের মধ্য দিয়ে নতুন সূর্যের আলোয় উদ্ভাসিত হলো নতুন বছরের নতুন দিন। পুরাতন বছরের সকল দুঃখ ক্লান্তি ভুলে সাফল্য আর গৌরবের উজ্জল স্মৃতিকে সঙ্গী করে  শুরু হলো নতুন বছরের পথচলা। বাঙালীর ঐতিহ্যের উৎসব ১ বৈশাখকে বরণ করার জন্য টাঙ্গাইলের জেলা প্রশাসন, টাঙ্গাইল প্রেসক্লাব, বিভিন্ন সামাজিক সাংস্কৃতিক ও অন্যান্য সংগঠন ব্যাপক অনুষ্ঠানমালার উদ্যোগ গ্রহন করেছে। ভোর হতেই বর্ষবরণের গান, পান্তা ইলিশ খাওয়া এবং বিচিত্র সাজের বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রার মধ্য দিয়ে শুরু এই অনুষ্ঠানমালার। এছাড়াও বিভিন্ন জায়গায় আয়োজন ঘৌর দৌড় প্রতিযোগীতা, ষাড়ের লড়াইসহ অন্যান্য প্রতিযোগীতা।

বাঙ্গালীর এই নববর্ষ উৎসব প্রায় চার হাজার বছরের পুরনো। সারা বিশ্বে যে নিরন্তর পরিবর্তন  দেখা যায়, তাকে গ্রহণ করে যে বার্ষিকী পালন করা হয়, তাকে ঘিরেই নববর্ষের উৎসব। বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থানের কারনে বর্ণাঢ্য সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাস ঐতিহ্য রয়েছে। মুসলমানদের বিভিন্ন ধর্মীয় উৎসবের পাশাপাশি হিন্দুদের রয়েছে বারো মাসে তেরো পার্বণ। বাঙ্গালী উৎসবের মেলায় তাদের উৎপন্ন দ্রব্য সামগ্রী বিক্রি করে এবং তার প্রয়োজনীয় কেনাবেচা করে মেলার মধ্য দিয়ে। ইদানীং বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠান নববর্ষে  বর্ণাঢ্য মেলার আয়োজন করছে।

বর্তমান সময়ে নববর্ষ পালনে মুসলমানদের বিরক্তিভাজন হতে দেখা যায়না। ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে বড় পরিসরেই নববর্ষ একযোগে নববর্ষকে বরনের উৎসব পালিত হচ্ছে। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে এবং বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে যে নববর্ষ পালিত হয়, তা পহেলা  বৈশাখের আগের দিন পালিত হয়। জনগোষ্ঠীর স্বকীয়তায় সেই উৎসবের নাম বিচিত্র। যেমন চাকমাদের বিজু, মারমাদের সাংগ্রাইং, ত্রিপুরাদের বৈসু, রাখাইনদের সাংগ্রেং, পাংখোদের ডাইমাজের, খুমীদের সাংক্রাই, মুরংদের চাংক্রান, সাঁওতালদের বাহা পরব বা পুল উৎসব, ওঁরাওদের ফাগুয়া ইত্যাদি।

আমাদের দেশে ১০মার্চ ১৫৮৫ খ্রি. মোঘল সম্রাট বাদশাহ আকবরের ফরমান অনুযায়ী আমির ফতেউল্লাহ সিরাজী উদ্ভাবিত বাংলা ফসলি সাল নববর্ষ চালু হয়। ১০ মার্চ থেকেই তখন (১বৈশাখ ছিল) নতুন সাল গণনা হতো। বাংলাদেশে এবং বাংলাদেশের বাইরে এখন পয়লা বৈশাখই বাঙ্গালির নববর্ষ হিসেবে পালিত হয়। কিন্তু উদযাপনের দিন বাংলাদেশে বাংলা একাডেমির সুপারিশকৃত পঞ্জিকাই অনুসরণ করা হয়।

বাংলা নববর্ষ সম্রাট আকবর চালু করেছিলেন রাজস্ব আদায়ের জন্য। বৈশাখ মাস থেকে বাংলায় প্রথম খাজনা আদায় করা শুরু করেন নবাব মুর্শিদকুলি খান। জমিদারি আমলে পয়লা বৈশাখের প্রধান আয়োজন ছিল খাজনা আদায় উপলক্ষে ‘রাজপুণ্যাহ’ ও ব্যবসায়ীদের ‘হালখাতা’। এর সঙ্গে যতই উৎসব আনুষ্ঠানিকতা থাক, মূলে ছিল অর্থনীতি। জমিদারি প্রথা বিলোপের পর ‘রাজপুণ্যাহ’ লুপ্ত হয়ে যায়। ব্যবসা-বাণিজ্য, লেনদেনেও আসে পরিবর্তন। হালখাতাও জৌলুস হারিয়ে ফেলে। ইদানীং নাগরিক জীবনে যে সাংস্কৃতিক চেতনায় পয়লা বৈশাখের উৎসব হচ্ছে, তা প্রবর্তনের কৃতিত্ব রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের। তিনিই প্রথম শান্তিনিকেতনে ঋতুভিত্তিক উৎসবের আয়োজন করেন। এর অংশ হিসেবে বৈশাখ বরণের উৎসবের জন্য বাংলা নতুন বছরকে সম্ভাষণ জানিয়ে রচনা করেছেন বহু কালজয়ী সংগীত ও কবিতা।

বাঙ্গালির কণ্ঠে আজ ছড়িয়ে যাবে সেই চেনা সুর ‘এসো হে বৈশাখ এসো এসো…’।
আধুনিক জীবনযাত্রার নানাবিধ প্রয়োজনে সব ক্ষেত্রে বাংলা সনের অনুসরণ এখন আর সম্ভব না হলেও নিজের বর্ষপঞ্জিটি নিয়ে বাঙালির রয়েছে বিশেষ গৌরব। পয়লা বৈশাখ নেহাত একটি বছরের শুরুর দিন নয় বাঙ্গালীদের কাছে। এটি এই বাঙ্গালীর সুদীর্ঘকালের আপন সাংস্কৃতিক চেতনা ও ঐতিহ্যের স্মারক। আপন জাতিসত্তায় অনুপ্রাণিত হওয়ার উৎস। সা¤প্রদায়িক ভেদাভেদের ঊর্ধ্বে উঠে জাতীয় ঐক্যবোধে দীপ্ত হওয়ার উপলক্ষও। এ কারণেই এই উৎসবের গুরুত্ব দিনে দিনে বৃদ্ধি পেয়েছে। পরিণত হয়েছে বাঙালি জাতির জীবনে এক মহৎ উৎসব হিসেবে। এভাবেই সারাদেশ ব্যাপী  নানা আয়োজনে উদযাপিত হচ্ছে বাংলা বছরের প্রথম দিনটি।

মোঃ রাশেদ খান মেনন (রাসেল)
সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টার, দৈনিক প্রগতির আলো এবং ফিচার লেখক টাঙ্গাইল বার্তা ২৪ ডটকম
ফোনঃ ০১৭১২-৪৬৫০৭০ ই-মেইলঃ rkmenonrasel@gmail.com

ফেসবুক মন্তব্য