ঢাকা শনিবার, সেপ্টেম্বর ২২, ২০১৮

Mountain View



চলচ্চিত্র র্নিমাণ টিপস-৪

Print Friendly, PDF & Email

Tips-04চলচ্চিত্র র্নিমাণ টিপস-৪
হার্ড লাইট ও সফ্ট লাইটের পার্থক্য

প্রথমেই বলে নেই এখানে লাইটিং কি ভাবে করতে হয় তা শেখানো হবে না। সেটা একটি বিশদ বিষয়। এখানে শুধু লাইটিং এর জন্যে অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হার্ড লাইট ও সফট লাইটের মাঝে পার্থক্য কি এবং কিভাবে হার্ডকে সফট এবং সফটকে হার্ড করা যায় সে সম্পর্কে আলোচনা করা হবে।
উৎসগত ভাবে লাইট অনেক ধরনের (যেমন, টিউব লাইট, হ্যালোজেন লাইট, মোমবাতির আলো, বজ্রপাতের আলো ইত্যাদি) হলেও বৈশিষ্ট্য বা গুতগত ভাবে লাইট মোট দু ধরনের। হার্ড এবং সফ্ট। নাম শুনেই বুঝতে পারছেন হার্ড লাইটের আলো কড়া হয়, আর সফট লাইটের আলো কোমল বা নরম ধাঁচের। প্রথমেই জেনে নেই কোন লাইটের কি বৈশিষ্ট।
হার্ড লাইটের আলো যেহেতু কড়া হয় তাই এর ছায়াও গাঢ় হয়ে থাকে। ছায়া গাঢ় হওয়ার অর্থ হল ছায়ার প্রান্ত সীমা বা ধার বা edge খুব স্পষ্ট হয়ে থাকে। সুতরাং হার্ড লাইট ব্যবহার করলে আলো ছায়ার কন্ট্রাস্ট (বৈপরীত্ব) বেশী পাওয়া যায়। আর কন্ট্রাস্ট যদি বেশী হয় তাহলে যার উপরে আলো পড়ছে তার খুঁটিনাটি সব কিছুই স্পষ্ট ভাবে ধরা পড়বে। মানে বস্তুটির যা কিছু আঁক-বাঁক, খানা-খন্দ, ডোবা-নালা অর্থাৎ সারফেস টেকচার হার্ড লাইট স্পষ্ট ভাবে ফুটিয়ে তুলবে। তাছাড়া হার্ড লাইটের প্রতিফলনের ক্ষমতাও বেশী। তাই যে কোন সমান সারফেসে খুব সহজেই তা প্রতিফলিত হয়।
সফট লাইট হার্ড লাইটের উল্টো আচরণ করে। অর্থাৎ এর ছায়া হালকা হয়। যার ফলে এর ছায়ার প্রান্ত সীমা অস্পষ্ট হয়ে থাকে। একারণে সফ্ট লাইট ব্যবহার করলে আলো ছায়ার কনট্রাস্ট কম পাওয়া যায়। আর কন্টাস্ট কম হলে স্বাভাবিক ভাবেই যার উপরে আপনি লাইট মারছেন তার টেকচার স্পষ্ট ভাবে বোঝা যাবে না। মানে খানা-খন্দে ভরা কোন তল বা সারফেসকে প্রায় মসৃণ দেখাবে। সফট লাইটের আরেকটি বৈশিষ্ট হল এর প্রতিফলন ক্ষমতা কম। তার মানে সফট লাইটের শুণ্যে মিলিয়ে যাওয়ার অভ্যাস রয়েছে। আর তাই যদি হয়, তবে বুঝতেই পারছেন নির্দিষ্ট একটি জায়গাকে যে পরিমান (ওয়াটের) হার্ড লাইট দিয়ে যতটুকু আলোকিত করতে পারবেন একই পরিমাণ (ওয়াটের) সফট লাইট দিয়ে ততটুকু আলোকিত করতে পারবেন না। অর্থাৎ একই সমান আলো পেতে গেলে হার্ড লাইটের চেয়ে বেশী সংখ্যক বা বেশী ওয়াটের সফট লাইটের প্রয়োজন পড়ে।
এতো গেল বৈশিষ্ট্য। এবার ব্যবহারে আসা যাক। থ্রিলার, এ্যাকশন, হরর এই জাতীয় সিনেমায় হার্ড লাইট বেশী ব্যবহার করা হয়। কারণ এর কন্ট্রাস্ট বেশী। সেই সাথে হার্ড লাইট ঘরের দেয়ালের বা কোন বস্তুর টেকচারকে সহজেই ফুটিয়ে তুলতে পারে। আবার চকচকে সমান কোন জিনিস যেমন কোন গাড়ি বা প্লেনের বডিকে আর্কষনীয় করে তুলতে হার্ড লাইটের জুড়ি নেই। কারণ এর প্রতিফলন ক্ষমতা বেশী।
সমস্যা হল হার্ড লাইট সহজে নিয়ন্ত্রন করা যায় না। ধরেন, আপনি চাচ্ছেন নায়িকার পুরো চেহারায় আলো থাকবে কিন্তু তার গালের সামনে ঝুলে পড়া চুলের গোছার ছায়াটা গালের উপর পড়বে না। এমনটা করতে গেলে লাইটম্যানকে অনেকগুলো লাইট কাটার ব্যবহার করতে হবে। সেই সাথে নায়িকাকেও খুব বেশী একটা নড়াচড়া করা যাবে না। কারন নড়লেই তার চেহারার জন্যে র্নিধারিত নাইট সেটিংটুকু সে আর পাবে না। অপর দিকে সফ্ট লাইটের যেহেতু ছায়া কম বা হালকা হয় তাই এক্ষত্রে সফ্ট লাইট ব্যবহার করলে নায়িকার সারা মুখে সমান ভাবে আলো ছড়িয়ে পড়বে কিন্তু চুলের ছায়াটা সে ভাবে দেখা যাবে না। শুধু তা-ই নয় হার্ড লাইট ব্যবহারের কারণে নায়িকার গালের যা কিছু বোরন, ফোঁড়া, জন্মদাগ ইত্যাদি যেভাবে ড্যাব ড্যাব করে ক্যামেরার দিকে চেয়ে থাকত সফ্ট লাইট ব্যবহার করলে সেই সমস্যাটাও আর থাকছে না। এই সমস্ত কারণে চলচ্চিত্রে অথবা স্টীল ফটোগ্রাফিতে সফ্ট লাইটরে ব্যবহার বেশী।
মনে রাখবেন হার্ড লাইট নায়ক নায়িকার চেহারার বলি লেখা, যা বয়সের চিহ্ন, তা স্পষ্ট করে ফুটিয়ে তোলে। অর্থাৎ কাহিনীর প্রয়োজনে কাউকে বয়স্ক দেখাতে হলে হার্ড লাইট ব্যবহার করতে হবে। আবার যে অভিনয় শিল্পীর ত্বক অসাধারণ মসৃণ ও টানটান, তার জন্য হার্ড লাইট আর্শিবাদ স্বরূপ। কারণ হার্ড লাইটের প্রতিফলন ক্ষমতা তার চেহারার জৌলুসকে আরো বাড়িয়ে দেবে। তাকে বাস্তবের চেয়ে অনেক কম বয়স্ক দেখাবে।
এবার আসা যাক হার্ড লাইটকে আপনি কি ভাবে সফ্ট বানাবেন। আর তা করতে হলে প্রথমেই আপনাকে বুঝতে হবে হার্ড লাইট কেন হার্ড আর সফ্ট লাইট কেন সফ্ট। এক কালে আমাদের দেশে সিএফএল তো বটেই টিউব লাইটের ব্যবহারও তেমন একটা ছিল না। তখন যে লালচে আলোর গোলাকৃতি ব্লাল্বগুলো ব্যাপক ভাবে ব্যবহার করা হত তার ছায়া আর টিউব লাইটের ছায়া কেন আলাদা হয় তা নিয়ে কখনও ভেবেছেন কি? না ভাবলে এখন একটু ভাবেন। গোলাকৃতি ব্লাল্বগুলোর আলোর উৎস কেন্দ্রীভূত আর টিউব লাইটের আলোর উৎস প্রায় তিন চার ফিট জায়গা জুড়ে ছড়ানো। যদি টিউব লাইটের আলোর (পরিমান না কমিয়ে) উৎসকে কোন ভাবে কেন্দ্রীভুত করা যায় তবে তার ছায়ার আচরণ কি পাল্টাবে না? একই ভাবে গোলাকৃতি ব্লাল্বের উৎসকে যদি বিস্তৃত করা যায় তবে?
উৎপাদিত আলোর পরিমানের তুলনায় উৎস যদি কেন্দ্রীভূত হয় তবে লাইট অনেক বেশী কড়া বা হার্ড হয়ে থাকে। আর উৎপাদিত আলোর পরিমানের তুলনায় উৎস যদি বিস্তৃত বা ছড়ানো হয় তবে লাইট সফট হয় থাকে। এখন আপনি যদি হার্ড লাইট উৎপাদকারী ব্লাল্বটি অর্ধ স্বচ্ছ কোন কিছু দিয়ে মুড়ে দেন তবে উৎস একই থাকবে কিন্তু আলোর পরিমান কমে যাবে মানে আলো স্ফট হবে। অবার অনেকগুলো হার্ড লাইট উৎপাদন করে এমন বাল্ব যদি পাশাপাশি রাখেন তবে আলোর উৎস পরিমানের তুলনায় বিস্তৃত হয়ে যাচ্ছে। সেই সাথে একটা উৎসের ছায়ার সংগে অন্য উৎসের ছায়া মিশে গিয়ে আলো সফ্ট হয়ে যাচ্ছে। লাইটের সামনে যদি নেট বা জাল রাখা হয় তবে আলোর উৎস অনেক ভাগে ভাগ হয়ে যাচ্ছে (নেটের প্রতিটা ফুটো এক একটা উৎস হিসাবে আচরণ করবে)। অর্থাৎ এক্ষেত্রেও লাইট সফট হয়ে যাচ্ছে।
এবার আসা যাক, সফট লাইটকে কি ভাবে হার্ড করবেন। খুব সহজ। লাইটের সামনে একটা উত্তল লেন্স লাগিয়ে দেন। উত্তল লেন্স ছড়িয়ে পড়া লাইটকে কেন্দ্রীভুত করবে। ফলে লাইট হার্ড হবে।
এই হল হার্ড লাইট আর সফ্ট লাইটের মূল বিষয়। লাইটের এই বৈশিষ্টগুলোকে পরিমান ও প্রয়োজন মাফিক ব্যবহার আপনার চলচ্চিত্র বা টিভি নাটকের লাইটিংকে আপনি আরো সমৃদ্ধ করে তুলতে পারবেন।

(চলবে)

ফেসবুক মন্তব্য