ঢাকা মঙ্গলবার, নভেম্বর ১৩, ২০১৮

Mountain View



গল্প

Print Friendly, PDF & Email

দূর আকাশের সেই মেঘ

নাজনীন সাথী

লাল ইটের গাঁথুনিতে চমৎকার তিনতলা বাাড়ি। প্রতিদিন টিউশনী যাওয়া-আসার পথে ও বাড়ির পাশ দিয়ে যেতে হয় সুখীকে। বাড়ির গেটে মাধবীলতার নুইয়ে পড়া ডগা। বারান্দায় নাম না জানা ঝুলন্ত অর্কিড। আর ভেতরে পরিপাটি ড্রয়িংরুমে বিশাল ক্যানভাসে খ্যাতিমান শিল্পীর জলরং ছবি। থরে থরে সাজানো শো-পিস। শুধু অনাহুত বুকশেলফটা যেন দীর্ঘশ্বাস বুকে চেপে নীরবে দাঁড়িয়ে। বেডরুমে কারুকার্যময় আসবাব। সর্বত্রই প্রাচুর্যের উৎকট প্রকাশ।
কল্পনার জালকে বিস্তৃত না করে গুটিয়ে আনে সুখী। হাতে সময় কম। ছাত্র পড়িয়ে যাওয়ার পথে বাজার করতে হবে। রান্না-বান্নার সাথে সাথে একগাদা দৈনন্দিন কাজ সারতে হবে। প্রতিদিনকার এটাই রুটিন। আজও কাজ শেষে বাসায় ফিরছে সে। পাখির নীড়ের মতো ছোট্ট ঘর। রুমের সামনে এক চিলতে ব্যালকনি। সেখানে কয়েকটা টবে সুখীর স্বপ্নেরা রঙে রঙে খেলা করছে।
ক’দিন আগে বড় বোনের মেয়ে ঋতু নয়নতারার পাঁপড়িতে আঙ্গুল ছুঁইয়ে হাসতে হাসতে বলেছিল- তুমি গোলাপ অথবা অর্কিড না লাগিয়ে পাথরকুচি, নয়নতারা, সন্ধ্যামালতি এসব লাগাও কেন? সেই মুহুর্তে সঠিক জবাব দিতে পারেনি সুখী কিন্তু প্রশ্নটা মনে খচখচ করেছে অনেকক্ষণ।
শৈশবে ভাইয়া আপা ফুলের বাগান করত। শীতকালে কসমস, ডালিয়া, জিনিয়া, নানা বাহারি ফুলে ছেয়ে যেত বাগান। বাবার লাগানো গোলাপ গাছগুলো ফুলে ফুলে মিষ্টি সুবাস ছড়াতো। বাড়ির সামনের বাগানটির মাটি ছিল উর্বর, সেখানে জল আলো হাওয়ার বসতি ছিল না। পাথুরে এই ঢাকা শহরে অনুর্বর মাটিতে মানুষের জীবনও নয়নতারার মতোইÑ সামান্য আলোর স্পর্শে কংক্রীটের হৃৎপিণ্ডে শিকড় গ্রোথিত করে বেঁচে থাকে যেন।
বর্তমান চাকুরীটার আগে অল্প কয়েক মাস একটা গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিতে প্রশাসনিক কাজ করেছিলো সুখী। সে সুবাদে অনেক শ্রমিকের জীবন উপলব্দি করতে পেরেছে সে। বলতে গেলে ২৭ বছরের জীবনটা এক নির্মম অভিজ্ঞতায় ঋদ্ধ হয়েছে তার।
আদিগন্ত বিস্তৃত ধানক্ষেত, আলপথে শিশিরের কোমল ভাবালুতা আর কঠোর দারিদ্রতাকে পেছনে ফেলে যে মেয়ে রাজধানীর লাল নীল আলোর রোশনাই পাড়ি জমায়। ক’দিন বাদে সুপারভাইজার অথবা প্রডাকশন ম্যানেজারের মধুমাখা বুলিতে(!) ফ্যাক্টরীর বদ্ধ বাতাসে, বস্তির কদর্যতায় বিষিয়ে ওঠে তার জীবন। প্রচণ্ড প্রাণশক্তির জোরে বেঁচে থাকে এ মেয়েগুলো। স্বল্প শিক্ষিত বা অক্ষরজ্ঞানহীন বস্ত্র বালিকাদের কাছ থেকে যে কোন পরিস্থিতিতে আনন্দ খুঁজে পেতে শিখেছে সুখী।
বাবা-মা মারা যাবার পর ভাইয়ার বাসার পরিপাটি ফ্ল্যাটে সাজানো আসবাব আর সাজানো সম্পর্কের মাঝে খুব কষ্ট করে থাকতে হয়েছিল সুখীর।
ভাবীর আত্মীয়-স্বজন বন্ধু-বান্ধব নিয়ে আদিখ্যাত- বাড়াবাড়ি রকমের মনে হচ্ছিল। ছোট্ট মীম স্কুল-কোচিং আর টিউটরের চাপে চিড়ে চ্যাপ্টা। তারপরও ফুপী ভাতিজির খুনসুটি চলতো। দিনে দিনে ভাবী যেন সহ্য করতে পারছিল না সুখীকে। সুখীর ব্যাপারে নিরুদ্বেগ আচরণ যেন স্মরণ করিয়ে দিচ্ছিল তোমার কোনকিছুতেই আমি নেই। অনাত্মীয় পরিচিতের মতো আশ্রিতা হিসেবে থাকো। নতুবা চলে যাও। তারপরও সুখী বুঝতে দিত না তার কষ্ট। ভাইকেও বলতে পারছিল না। ক্রমশ অপরাধী মনে হচ্ছিল নিজেকে। আমার জন্যেই ভাবী নিজের সংসারে খোলামেলা হতে পারছেনা। আমি চলে গেলে হয়তো তার মতো করে আত্মীয় পরিজন নিয়ে সে ভালোই থাকবে।   সেদিন রাতে খাবার টেবিলে হঠাৎ মীমকে কেন্দ্র করে ভাবী সিনক্রিয়েট করে বসল। মীম বলছিল- মামনি আমি খাব না। বলতে না বলতেই প্লেটে পানি ঢেলে দেয়। সুখী বিরক্তির সুরে বলল-
এ কি করলে ? খাবে না ঠিক আছে, খাবারগুলো নষ্ট করলে কেন?
শরতের আকাশের মতো দ্রুত বদলে গেল ভাবীর মুখের মানচিত্র। মীমকে জোরে ধমক দিয়ে বেসিনে নিয়ে গেল হাত ধোয়াতে। খাওয়া-দাওয়ার পর স্বামী-স্ত্রীতে যে কথোপকথন হল তা কানে আসে সুখীর।
-আমার একমাত্র সন্তান ওর যা মন চাইবে তাই করবে।
-প্লীজ চুপ করো।
ভাইয়ার কণ্ঠকে অতিক্রম করে যায় ভাবীর স্বর।
-কদিন থেকেই দেখছি তোমার বোন আমার মেয়েকে যখন তখন ভদ্রতা শিখাচ্ছে।
-ফুপী হিসেবে শেখাতেই পারে; সমস্যা কোথায়।
-সমস্যা অবশ্যই আছে, তোমাদের ঐ ল্যাবামার্কা ভদ্রতায় আমার মেয়ের কোন দরকার নেই।

সাধারণ দাম্পত্য কলহ ভেবে উড়িয়ে দেয়া যেতে পারে ঘটনাটিকে। কিন্তু কোথায় যেন একটা বেসুর সুখীকে চঞ্চল করে তোলে। ছেলেবেলার কথা বড্ড মনে পড়ে। বয়সের পার্থক্য থাকা সত্বেও ভাইয়ার সাথে পাখির বাসা থেকে ডিমপাড়া, চড়–ইভাতি খেলা, হাতাহাতি-মারামারি ছিল নিত্যদিনের ঘটনা।
ভাইয়া যখন ভার্সিটির ছাত্র, সুখীর ভীষণ জ্বর। কোন কিছুতেই জ্বর কমছিল না, মা মাথায় পানি ঢালছে, বড়বোন ভেজা কাপড় দিয়ে হাত-পা স্পঞ্জ করে দিচ্ছে। বাবা সারা ঘরে পায়চারি করছেন। একটানা তিনদিন জ্বরের সঙ্গে যুদ্ধ করে যখন জ্বরের প্রকোপ খানিকটা কমেছিল তখনি ভাইয়াকে দেখতে চেয়েছিলো সুখী। বাবা তক্ষুনি ছুটলেন এক্সেঞ্জ থেকে টেলিফোন করতে। দু’দশক আগে বড় ব্যবসায়ী বা সরকারী কর্মকর্তা ছাড়া ব্যক্তিগত ফোন ভাবা-ই যেত না। বিপদে-আপদে একমাত্র ভরসা টেলিফোন টেলিগ্রাফ। অন্য সময়ে চিঠি। সে যাত্রায় ভাইয়া ছুটে এসেছিল সুখীর জন্য হলদে ফ্রক নিয়ে। আজও চোখ বুজলে নতুন জামাটার ঘ্রাণ অনুভব করে সুখী।

এসব ভাবতে ভাবতে টিউশনির উদ্দেশ্যে এগুচ্ছিল সুখী। পিছন থেকে ধাক্কা লাগায় রিক্সাওয়ালা। বিরক্তি ভরে পেছনে তাকায় সুখী, আবার ভাবনায় ডুবে যায়Ñ জীবন এ রকম কেন? পাতা ঝরে নতুন পাতা গজায়। বসন্ত চলে গিয়ে আরেক বসন্ত আসে। নবীন প্রজন্মের কাছে প্রকৃতি চির সবুজ, অভিজ্ঞ মানুষদের কাছে জীবনের পরতে পরতে সংগ্রাম। প্রকৃতির মতো কখনও উজ্জল কখনও বিবর্ণ। সুখী হতাশাবাদী নয়। এই ব্যবস্থার চাওয়া-পাওয়ার কাছে বাঁচার তাগিদে মধ্যবিত্ত স্মৃতিকাতরতা ঝেড়ে ফেলেছে প্রতিদিন।
ভাইয়া ভাবীর ঐদিনের ঘটনা সুখীকে সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করেছিলো। নিজেই নিজের ভবিষ্যত গড়বে বলে বেরিয়ে এসেছিল ভাইয়ার বাসা থেকে। এ দুর্দিনে এগিয়ে এসেছিল শম্পা আপু । চাকরীর ব্যবস্থা করে দিয়েছিল আর বলেছিলো মনে রাখিস, সমাজে একজন নারীর একা পথ চলা সহজ নয়। সত্যি তাই। আজ ভাবতে ভালো লাগছে আমি স্বাধীন। নিজের মতো করে বাঁচতে পারছি।

বর্ষার এ সময়টায় ঢাকার অলিগলি কাদায় থ্যাক-থ্যাকে হয়ে থাকে। মেইন রোড থেকে রিকসাও পাওয়া যায় না। কাদা-পানি ঠেলে পায়ে হেঁটে টিউশনী বাড়ি যাচ্ছে সুখী। যাবার পথে লাল বাড়ি পাশ কাটতেই হঠাৎ গাড়ির শব্দে চোখ তুলে সুখী। ভাইয়ার গাড়ি পাশ কেটে চলে গেল। ভাইয়া লক্ষ্য করেছে কিনা কে জানে। সুখী দেখলো গাড়িতে বউ-বাচ্চা আরো কে জানি আছে।

তার কিছুদিন পর বড় আপুর বাসায় ভাইয়ার মুখোমুখি হয় সুখী। মনে মনে প্রস্তুতি ছিল সুখীর। আজ কোন কিছু জানতে চাইলে কাটা কাটা জবাব দিয়ে দিবে। যদিও কোনদিন ওভাবে ভাইয়ার মুখোমুখি হয়নি সে। এতো ক্ষোভ কেন জন্মাল নিজেও বুঝতে পারছে না সুখী। সুখীর কাছে ভাইবোনের সম্পর্কটা এখন একটা ফরমাল সামাজিকতায় দাঁড়িয়েছে। এর মাঝে কোন আন্তরিকতা নেই, অনুভব নেই, আকুতি নেই। সুখীর কোন কিছু হলে যে ভাই বেশি অস্থির হয়ে পড়তো সে বোনের এখন একটা খোঁজ পর্যন্ত না নিয়ে কি করে থাকে? সুখীর তো কষ্ট হয়। আড়ালে আবডালে ভাইয়াকে দেখতে ইচ্ছে করে। আবদার করতে ইচ্ছে করে ঠিক ছোট বেলার মতো।
-ক্যামন আছিস? ভাইয়া জানতে চাইল। ভাইয়ার চোখের দিকে না তাকিয়ে সুখী জবাব দিল
-ভালো। তুমি ক্যামোন আছো?
-আমার ভালোমন্দ জেনে লাভ কি? তুই কি আমাদের খোঁজ খবর রাখিস?
ভাইয়ার কণ্ঠে শীতের খেজুর রসের মতো অভিমান চুঁইয়ে পড়ে।
-পাল্টা একই প্রশ্নতো তোমাকে আমিও করতে পারি ভাইয়া।
-তুই ঋতুকে জিজ্ঞেস করিস আমি তোর খবর নেই কিনা?
-তুমি যেমন মিডিয়া হয়ে খবর নাও, আমিও সেভাবেই তোমাদের খবর রাখি।
-আমার এ্যাতো ব্যস্ততা। শুক্রবারও মাঝে মধ্যে অফিস করতে হয়। তুই তো বাসায় আসতে পারিস। বাসায় আসিস না কেন?
-তোমাদের শান্তি বিঘ্নিত হোক চাই না বলে।
-সেটাই একমাত্র কারণ?
মঞ্চে বক্তৃতা দেবার আগমুহুর্তের মতো খানিকটা প্রস্তুতি নেয় সুখী।
-বাবা-মায়ের মৃত্যুর পর জীবন আমার সামনে নতুনভাবে উন্মোচিত।
-দেখ বাবা-মা কারও চিরকাল বেঁচে থাকে না।
-থাকে না বলেই নিজের দায়িত্ব নিজে তুলে নিয়েছি। আমাকে নিয়ে তোমার দুর্ভাবনার দরকার নেই।
-দরকার আছে কি নেই তুই বুঝবি না। সংসারে যে বড় হয় তাকে অনেক কিছু ভাবতে হয়।
-কই তোমরা তো একবারও আমাকে দেখতে আমার বাসায় যাওনি? আমি সময় করতে পারলে যাবো। আপাতত ইচ্ছে নেই।
ঊড় আপু খাবার টেবিলে ডাকলো সবাইকে। একসাথে খাওয়-দাওয়া আড্ডা দিয়ে যে যার মতো নিজ নিজ বাসায় ফিরেছে। এরপর দেখা হয়নি অনেকদিন। দেখা না হলেও প্রতিদিনই লাল বাড়িটির পাশ কাটার সময় সুখীর মনে তোলপাড় তোলে অতীত স্মৃতি। ছাত্রকে লিখতে দিয়ে ভাবনার এলোমেলো মেঘ ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়তে থাকে। চোখের পলকে কৈশোরের হাজারো স্মৃতি মনের আকাশে উড়ে বেড়ায়।
‘টিচার। আমার অংক হয়ে গেছে।’ ছেদ পড়ে সুখীর ভাবনায়।
অতীত যেন শেষ হতে চায় না, এ যেন অমোচনীয় কালি। হঠাৎ বাড়ির জন্য মন পোড়ে। শীতকালে বাড়ির পিছনে খোলা জায়গায় দাঁড়ালে শত মাইল দূরের এভারেস্টের চূড়া দেখা যেত এখনও দেখা যায়। অনেক দূর থেকে দেখলে মেঘের মতো মনে হয় কিন্তু নিশ্চল। আজ হঠাৎ ভাইয়াকে মনে হয় সেই মেঘ, যত কাছে যাবে ততই দূরে সরে যাবে।
পথ চলতে চলতে ভাবনাগুলো গুছানো যায়। অনেক কষ্টে মেলানো অংকের মতো আনন্দ অনুভূত হয় সুখীর। তাই পথই সুখীর বড় বন্ধু। পথে হাঁটতে হাঁটতে নাম না জানা মানুষের কোলাহলে মিশে যেতে যেতে হঠাৎই সন্ধ্যার হাস্নাহেনার ঘ্রাণ সব মন খারাপ ভাবকে সুবাসিত করে যেন। নিজেকে মেঘের মতো নির্ভার মনে হয় সুখীর।

ফেসবুক মন্তব্য