ঢাকা বৃহস্পতিবার, এপ্রিল ২৬, ২০১৮

Mountain View



মানবপাচারঃ রাষ্ট্র বনাম মানবাধিকার

Print Friendly, PDF & Email

শিশির মল্লিক: মে মাস জুড়ে গণমাধ্যমগুলোয় মানব পাচার ও অভিবাসন নিয়ে ব্যাপক লেখালেখি ও প্রতিবেদন লক্ষ্য করছি আমরা। যার মাধ্যমে লোমহর্ষক, বর্বরতম ও জঘণ্য অপরাধসমূহ জানতে পারছি। বাংলাদেশ ও মায়ানমারের হতভাগ্য রোহিংগা জনগোষ্ঠী এই মানব বিপর্যয়ের শিকার। বিশ্ব নেতৃবৃন্দ ও মানবাধিকার সংস্থাগুলো এ বিষয়ে বেশ উদ্বিঘ্ন বলেই মনে হচ্ছে! কিন্তু যে দেশের মানুষেরা এই জঘণ্যতম মানব বিপর্যয়ের সম্মুখীন সে দেশের নেতৃবৃন্দ কতটা তাড়িত তা ভাববার আছে।

manob pachar

এই একটি ঘটনাই প্রমাণ করে রাজনীতির মাঠে যে দল বা সরকার কিংবা রাষ্ট্র- যত গলাবাজিই করুক না কেন নির্মম বাস্তবতা এই যে তারা সকলেই চরমভাবে ব্যর্থ। তাদের সমস্তরকম হাঁকডাক দারিদ্রমুক্তকরণ ও উন্নয়ন জোয়ারের ফিতা মাপামাপি আদতেই মিথ্যা ভূয়া ও প্রতারণা ছাড়া আর কিছুই নয়।

মাত্র ১০-১২ হাজার টাকা রোজগারের আশায় মালয়েশিয়ায় পাড়ি জমানোর উদ্দেশ্যে জীবনের ঝুঁকি নিচ্ছে সাধারণ কৃষক দিনমজুর কিংবা বেকার এই মানুষগুলো। আর তাদের এই অভাবের সুযোগকে কাজে লাগাচ্ছে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পাচারকারী চক্রগুলো। যার সাথে জড়িত এ দেশগুলোর প্রসাশন ও রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তিবর্গসহ সহায়তাকারী বিভিন্ন এজেন্ট।

মজার বিষয় হলো, এ ঘটনা হঠাৎ করে ঘটে গেল এমন তো নয়। এটি বরাবরই চলে আসছে। সেটার বাড়তি কমতি হয়। বাজার ব্যবস্থাপনার যুগে এটাই স্বাভাবিক। পৃথিবীর কোন আদিম বর্বরতায়ই আজকের পূঁজিবাদী বিশ্বব্যবস্থা আতিক্রম করেনি। মানবপাচারও নয় বরং কোন কোন ক্ষেত্রে তাকে ছাড়িয়ে গেছে। মানব বিপর্যয়ের জন্যে সবচাইতে বড় হুমকিই আজকের উন্নত পূঁজিবাদী দেশগুলো। সম্প্রতি ঘটে যাওয়া নেপালের ভূকম্পনের জন্য আমেরিকার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ ও গণমাধ্যমগুলোতে।

নির্বিবাদী সাধারণরা এর অর্থ খুঁজে পাবেন না। তারা প্রশ্ন করবেন মানুষ কেন এমন করে! মানুষকে মেরে খুন করে কি লাভ! ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু তারা হয়তো সচেতন থাকেন না যে, সমস্ত সম্পদের উৎসই হলো মানুষ। মানুষ উৎস হলেও সম্পদের মালিকানা বা অধিকার সবার সমান নয়। বরং আজকের পূঁজিবাদি ব্যবস্থায় তা একেবারে হাতেগোনা কয়েকশ’, হাজার, কিংবা লাখো ক্ষমতাশালী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের হাতে কুক্ষিগত হয়েছে। তারাই পুরো পৃথিবীর স্থল, জল, আকাশ ও সৌরজগতের মালিক। এমন একটি ব্যবস্থাকে বলা হচ্ছে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা। সম্পদে অমিল রেখে মানুষে মানুষে সমতা হয় কিভাবে? (একজন মধ্যবিত্ত মানুষকেও তো আমি দেখি না তার বাসার কাজের সহয়াকারী মেয়ে বা ছেলেটিকে তার পাশে বসার অধিকার বা সুযোগ দিতে। সেখানে সবকিছু তার জন্যে আলাদা। অথচ ঐ পরিবারে তার গুরুত্বের কথাটি বিবেচনা করলে দেখা যাবে অন্য সবার চেয়ে তার ভ’মিকা কোন অংশে কম নয়।) একটি পুলিশ স্টেশনে একজন কোটিপতি ও একজন দিনমজুরের উপস্থিতি পুলিশের কাছে সমগুরুত্ব পাবে কি? কিংবা আইনজ্ঞের কাছে?

অথচ আমরা রাষ্ট্রের কাছে সবাই সমান এ ধরণের মহৎ উদ্ধৃতির কথা শুনি। আরো শুনি বা জানি রাষ্ট্র একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন। জনগণের সেবাদানই তার একমাত্র লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য। বক্তিগত লাভালাভ ও সুবিধা আদায়ের মাধ্যম নয়। আমির থেকে ফকির সবাই তার কাছ থেকে সামাজিক অবস্থান ভুলে সম সেবা বা নিরাপত্তা পাবে। ব্যক্তিগত সম্পর্ক বা আনুকুল্য দেখানো অপরাধ তুল্য। রাষ্ট্র কোন দল বা সংগঠনের মুখপত্র নয়। সব ভিন্নতা বা ভিন্নমত-পথ ও স্বতন্ত্র্যের সুরক্ষা ও নিরাপত্তা বিধান করা তার দায়িত্ব ও কর্তব্য। কিন্তু বাস্তব জীবনে কি দেখি- তা বলাই বাহুল্য। এক্ষেত্রে নানা জন নানা যৌক্তিকতা পোষণ করবেন; নানা সীমাবদ্ধতার কথা বলবেন। যা কখনোই প্রকৃত সত্য উপলব্দির জন্য উপযুক্ত নয়।

আমাদের রাজনৈতিক নেতৃত্বরা তো সংখ্যাধিক্যের তোড়ে উচ্ছল ছল ছল অবস্থায় থাকেন। তারা ভাবেন সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে ক্ষমতায় এসেছি অতএব আমরাই এখন সবকিছুর অধিপতি। ভিন্নমতকে তোয়াক্কা করে কে। কিন্তু এটা কখনোই ভাবেন না যে সত্য সবসময় সংখ্যাধিক্যের ভোটের মাঝে নিহিত থাকে না। যদি তাই হতো তবে সত্য প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে বিজ্ঞান বা দর্শনের প্রবক্তারা হারিয়ে যেতেন। তা না হয়ে কোপার্নিকাস, ব্রুনো, গ্যালিলিওরা মানবাকাশে ‘জ্বলজ্বলে তারা’ হিসেবে আমাদের মাঝে প্রতিষ্ঠা পেয়েছেন। তারা সবাই যা বলতেন বা বিশ্বাস করতেন তার উল্টোটাই বলেছেন। আমরা দেখি যে, কোনকালেই ক্ষমতাশীনরা প্রচলিত মতের বাইরের বিপরীত মতকে মেনে নেননি। নানাভাগে নির্যাতন ও নিপীড়ন ও হত্যা করেছে। আজকের দিনেও আমরা শাসকদের একই ভূমিকায় দেখতে পায়। তারা ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেয় না।

আমাদের দেশীয় রাজনীতিতে এমন অবস্থা দাঁড়িয়েছে আওয়ামী লীগ ও বিএনপিই যেন রাজনীতিতে সবকিছুর নির্ধারক। এখন অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে হাওয়া উল্টো দিকে ঘুরা শুরু হয়েছে। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন পূর্ব ও পরের রাজনৈতিক তৎপরতা আমাদের নতুন অভিজ্ঞতা দিচ্ছে। এই অভিজ্ঞতার উপলব্দি জনসাধরণ ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের এক নয় বরং উল্টো। কিন্তু জনসাধারণের বিচ্ছিন্ন-বিক্ষিপ্ত মতামত ও উপলব্দি মূল্যায়ন ও মন্তব্য থেকে অনুমান করা যায় রাজনীতি কোন দিকে যায়। কারণ সুবিধা যারা নেওয়ার তারা এ মতামতগুলোর গুরুত্ব উপলব্দি করে এবং পরবর্তী রাজনৈতিক তৎপরতার ক্ষেত্র হিসেবে তাকে ব্যবহার করে। কারণ রাজনীতিতে যে দল যতই শক্তিশালী হোক না কেন তার বিরুদ্ধে যেকোন পদক্ষেপ গ্রহণে জনগণের প্রচ্ছন্ন সমর্থন লাগে।

দেশের জনগণ স্বাধীনতাত্তোর বিভিন্ন সরকারগুলোকে দেখেছে সেখানে আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জাতীয়পার্টি ক্ষমতাসীন ছিল শরীক হিসেবে জামাত ও বামপন্থী দলের কেউ কেউ ক্ষমতায় ছিলেন বা আছেন যখন যে ক্ষমতায় থেকেছে তার দাবী দেশের জন্যে সর্বোচ্চ করেছে যে ছিলেন বাইরে তিনি বলেছেন কিছুই করেনি নিজেদের আখের গুছিয়েছে ইত্যাদি ইত্যাদি। কোন যুক্তিকেই আপাত দৃষ্টিতে উড়িয়ে দেয়া যাবে না। দেশ একেবারে এগোয়নি তাও বলা যাবে না। জনসাধারণের জীবনমানের অগ্রগতি ঘটেনি তাও বলা যাবে না। কিন্তু এর পিছনে সরকার বা জনসাধারণের নিজস্ব ভূমিকা কতটুকু তাই বিবেচ্য। সরকার কতটুকু পৃষ্ঠপোষকতা দিয়েছে আর জনগণ কতটুকু পৃষ্ঠপোষকতা পেয়েছেন তাই বিবেচ্য। দেখা যাবে এক্ষেত্রে কৃতিত্ব রাষ্ট্রের চেয়ে জনসাধারণের ব্যক্তি উদ্যোগই মুখ্য। দেশে চাহিদানুযায়ী কর্মসংস্থানের সুযোগ না থাকায় ব্যাপক জনসাধারণ বহির্বিশ্বে কর্মসংস্থানের খোঁজে দেশ ত্যাগ করেছেন এখনো করছেন। রাষ্ট্রীয় অনুমোদনের বাইরে যেকোন সিদ্ধান্ত বা পদক্ষেপ যে একজন নাগরিকের জন্য পুরোপুরি ঝুঁকি এটা জানা বোঝার পরও যখন কোন নাগরিক সেই ঝুঁকিকেই বেছে নেন তখনই সমাজের ভিতরের ক্ষতটা জ্বল জ্বল করে উঠে। সাম্প্রতিক মানবপাচার ও অবৈধ অভিবাসনের খবরাখবর আমাদের সেই ক্ষতটিই চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে। গণমাধ্যমগুলোও স্বীকার করছে অবৈধ উপায়ে দেশান্তরী হওয়ার মূল কারণ অভাব বা দারিদ্র। কিন্তু এটাতো বলা যাবে না। সরকারকে দেখাতে হবে প্রবৃদ্ধি ধেই ধেই করে এগুচ্ছে। আওয়ামী সরকার মধ্য আয়ের দেশ গড়ার যে স্লোগান দিচ্ছে তার কি হবে? অতএব কারণটা দারিদ্রতা বা অভাব নয় অন্যকিছু। কিছু গণমাধ্যম বা বুদ্ধিজীবী জুটেও যাবে সেটা প্রমাণ করতে। তারা উপদেশ বা পরামর্শও দিবেন অভিবাসন কিভাবে বৈধ উপায়ে করা যায় ইত্যাদি ইত্যাদি। আপাত তার ব্যবস্থাও হবে। অবৈধ পথে আপাত কিছুটা  লাগবও হবে। কিন্তু দারিদ্রতা? সেটা কিভাবে ঢাকবেন? সেই কর্মসূচীগুলো কি? যে মানুষগুলো ফেরত আসবে তাদের কাজের ব্যবস্থা কি সরকার বা আমাদের দেশের প্রাইভেটাইজেশনের সুবাদে মিলিয়ন মিলিয়ন ডলারের মালিক বনে যাওয়া কর্তা ব্যক্তিরা নিবেন? গণমাধ্যমের চিল্লাচিল্লি শেষ তো এ বিষয়টিও আস্তে আস্তে চাপা পড়ে যাবে। দারিদ্রতার চাপে এ মানুষগুলো আরো ঝুঁকি নেবে। রোজগারের অন্য কোন উপায় বের করে নেবে। কারণ তার বাঁচার দায়িত্ব তার। রাষ্ট্র তো নেবে না। অতএব আরেক উপসর্গ দেখা দিলে তখন তাকেও সামাল দেয়া হবে। এভাবেই চলবে। শোষণ লুণ্ঠনে ফুলে ফেঁপে ওঠা বাঙালি সাহেবেরা আরো ধনী থেকে ধনী হবেন। আর রাজনৈতিক ক্ষমতার সুবাদে জনরোষকে কিভাবে পশমিত করা যায় তার নীল নকশা আঁকবেন। রাজনীতির মাঠের আরো অভিনব সব খেল দেখতে পাবেন জনগণ। বিগত ৪৩ বছরে কম খেল তো দেখেননি এভাবে হয়তো তারা আরো কিছুদিন ক্ষমতার স্বাদ নিবেন। কথাসাহিত্যিক হুমায়ুন আহমেদের সেই উদ্ধৃতি মনে পড়ে ‘এ দিন দিন নয় আরো দিন আছে….

আমরা যদি দেশের আর্থ-সামাজিক অবস্থা পর্যালোচনা করি তবে মানব পাচারের অবাধ বাণিজ্যের মূল কারণ উপলব্দি করতে পারব। নিম্নে কিছু তথ্যসূত্র উদ্ধৃত করা হলো-

বাংলাদেশ পরসিংখ্যান ব্যুরোর কৃষি শুমারি ২০০৮-এর তথ্যানুযায়ী দেশে ভূমিহীন পরিবারের সংখ্যা ১৫ লাখ ৮ হাজার ৮৭৬টি বলে জানিয়েছেন পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। দশম জাতীয় সংসদের চর্তুথ অধিবেশনের তৃতীয় দিনে চট্টগ্রাম ৪ আসনের সংসদ সদস্য দিদারুল আলমের তারকা চিহ্নিত প্রশ্নের জবাবে তিনি সংসদকে এ তথ্য জানান। [তথ্যসূত্র ভোরের কাগজ, মঙ্গলবার, ১৮ নভম্বের ২০১৪।]

৮  থেকে ১৪ সালের পরিসংখ্যান যোগ করলে এ হিসেব আরো বাড়বে।

২৭ শতাংশ মানুষ চরম দারদ্র্যিতায় বাস করছে যারা কোনোমতে এক বেলা খেতে পারছে। ভূমিহীন মানুষের সংখ্যা ৬২ শতাংশ, ৬ শতাংশ হারে গ্রামের মানুষ র্সবস্ব হারিয়ে শহরমুখী হচ্ছে। ৪০ শতাংশের অধিক মানুষ দারিদ্র সীমার নীচে বাস করছে। গৃহহীন মানুষের সংখ্যা ১২ শতাংশ। বছরে ১.৫০ শতাংশ চাষের জমি হারাচ্ছে। [দৈনেক সংগ্রাম, শুক্রবার ২২ অক্টোবর ২০১০] বিগত ৪ বছরের পরিসংখ্যান আমাদের জানা নেই।

ভূমিহীন কৃষকের সংখ্যা বাড়ছে- কৃষিপ্রধান এ দেশের প্রধান দুটি উপকরণ ভূমি ও কৃষক। ভূমি ছাড়া কৃষি যেমন অসম্ভব,  তেমনি কৃষক ছাড়া কৃষিকর্ম। ভূমি ও কৃষক যেন একটি অন্যটির সঙ্গে ওতপ্রােতভাবে জড়িত। সম্প্রতি কৃষিশুমারি থেকে জানা গেছে, ভূমিহীন কৃষক পরিবারের সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। অন্যদিকে কৃষি জমি হারিয়ে যাচ্ছে অকৃষিজ খাতে। র্বতমানে আ্মাদের দেশে মােট পরিবারের সংখ্যা ২ কােটি ৮৬ লাখ ৭০ হাজার। এর মধ্যে ৩৩ লাখ ১০ হাজার পরিবার শহরে এবং ২ কােটি ৫৩ লাখ ৬০ হাজার পরিবার গ্রামে বসবাস করে। ১৯৮৪ সালে দেশে ভূমিহীন কৃষি পরিবারের সংখ্যা ছিল ১১ লাখ ৯৮ হাজার। ১৯৯৬ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১৮ লাখ ১৫ হাজার। ২০০৮ সালে ভূমিহীন কৃষি পরিবারের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৩২ লাখ ৫৬ হাজার। (সূত্র : কৃষিশুমা্রি ২০০৮) [দৈনিক ইত্তফোক, শুক্রবার, ১২ এপ্রিল ২০১৩]

এটিও ৬ বছর র্পূবের হিসেব। আমরা ধারণা করতে পারি র্বতমানে দা্রিদ্রতা এ পরিসংখ্যান ছাড়িয়ে গেছে। দারিদ্রতা বেড়ে যাওয়ার কারণকে নানাভাবে ব্যাখ্যা করা হয়। যেমন- ভুমি সংস্কার না হওয়া, জনসংখ্যা বৃদ্ধি, জিডিপি-এর প্রবৃদ্ধি দরদ্রিমুখী না হওয়া, র্কমসংস্থান সৃষ্টি না হওয়া, দূর্নীতি প্রভৃতি। আরো অজস্র কারণ খুটিঁয়ে খুটিঁয়ে বের করা যাবে। আমরা সে সবে না যেয়ে মূল কারণটি বুঝবার চষ্টো করি।

জাতীয় গণমাধ্যম ও পত্রপত্রিকায় স্বীকার করা হচ্ছে দারদ্র্যি দূরীকরণে বাংলাদেশ বিশ্বব্যাপী অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত তৈরি করলেও ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য কমাতে পারেনি।

বাংলাদেশে দরিদ্র মানুষের হার শতকরা ৫০ ভাগ। কিন্তু সরকার থেকে বলা হয়ে থাকে বাংলাদেশে দরিদ্র মানুষের হার চল্লিশ শতাংশ। লক্ষ্য করলে দেখা যাবে দেশে ধনী দরিদ্রের ব্যবধান দিন দিন প্রকট হচ্ছ, ক্রমইে বৃদ্ধি পাচ্ছে। ২০১৩ সালের সমীক্ষা অনুযায়ী ২০১০ সালে মোট জাতীয় আয়ের সর্বনিন্ম অবস্থানে পাঁচ শতাংশ দরিদ্র মানুষের অংশীদারিত্ব দশমিক ৭৮ শতাংশ আর এদিকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পাঁচ শতাংশ ধনীর জাতীয় আয়ের অংশীদারিত্ব শতকরা ২৪ দশমকি ৬১ শতাংশ। কাজেই মাথাপছিু আয় বৃদ্ধির প্রচারিত তথ্যে তথা পুলকিত হবার কিছু নেই, তবে বিভ্রান্ত হবার ফাঁদ রয়েছে। [দৈনিক আজাদী,২৮ মে বুধবার ২০১৪ খ্রী]

দেশের জনগণের সর্বমোট ব্যক্তিগত আয়কে জনপ্রতি ভাগ করে দিলে যা হয় সেটা হচ্ছে মাথাপিছু আয়। আমাদের দেশের এমন এমন ব্যক্তি আছেন যা্দের আয় বছরে শত কোটি হাজার কোটি আবার দিনে দুবেলা খেতে পারেন না এমন দূর্ভাগা মানুষও লক্ষ কোটি।

পরিসংখ্যান ব্যুরো (ববিএিস) বলেছে বাংলাদেশের মানুষের এখন মাথাপছিু আয় এক হাজার ১৯০ ডলার। এর মানে হলো বাংলাদেশের জনগণ বছরে গড়ে ৯২ হাজার ৫৫২ টাকা আয় করছে। দেখা যায় দেশের প্রায় পঞ্চাশ শতাংশ মানুষ দরিদ্র সীমার নীচে বসবাস করে সেখানে যদি সকলের মাথাপিছু গড় আয় ৯২ হাজার ৫৫২ টাকা হয় তাহলেতো য্থার্থ অর্থে দরিদ্র সীমার নীচে বসবাস মানুষের সংখ্যা খুঁজে পাওয়াটাই হতো না। অথচ দেশের জনসংখ্যার অর্ধেক মানুষ মানবেতর জীবন যাপন করছেন। কোটি মানুষের নেই মাথা গুজবার ঠাঁই, নাই এক শতক জমিও তেমন মানুষ লক্ষ লক্ষ, তাহলে মাথাপছিু আয় বৃদ্ধির এই তথ্য কি ভুল? বাস্তবিক ভুল নয় কারণ বাংলাদেশে অতি বিত্তশালী লোকের সংখ্যা দিন দিন এতো বেড়ে গেছে যে তাদের আয়ের অনুপাত ও সম্পদের মূল্য যে সারা দেশের মানুষের সংখ্যার মধ্যে বিভাজনের খেলা দেখিয়ে একটা আরোপিত আয়ের তথ্য দেয়া হলওে তা আসলে এক ধরনের  ভ্রান্ত তথ্য। [দৈনিক আজাদী,২৮ মে বুধবার ২০১৪ খ্রী]

উপরে উল্লেখিত তথ্যগুলো থেকে আমরা এটা ধারণা পাই যে, বার্ষিক মাথাপিছু আয় কিংবা জাতীয় আয় ব্যয় আমদানী রপ্তানীর হিসাব-নিকাশ দিয়ে অভাব বা দারিদ্রতা ঢাকা সম্ভব নয়। ব্যক্তি উন্নয়ন সামাজিক উন্নয়নের মাপকাঠি নয়। কয়েক দশক ধরে তৃতীয় বিশ্বের ধনী দেশগুলো প্রাইভেটাইজেশনের যে তত্ত্ব আওড়াচ্ছে তারই উন্নয়নের রোল মডেল হতে চলেছে বাংলাদেশ। মুষ্ঠিমেয় কিছু মানুষ কোটি কোটি মানুষের শ্রম-ঘাম সম্পদ লুঠে মুনাফার পাহাড় গড়ে তুলছে। আর তার পাহারা দিচ্ছে রাষ্ট্র। রাষ্ট্রের ক্ষমতায় যারা আওয়ামী লীগ কিংবা বিএনপি বা জামাত জাতীয় পার্টি বিভিন্ন দালাল বাম সংগঠনগুলো তারা হচ্ছে সেই মুষ্টিমেয় ক্ষমতাবান মানুষের নির্ভেজাল সেবক। তারাও সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলছে দিন দিন। রাজনীতি এখন ভালো বিজনেস এটা বাংলাদেশের কে না জানে। এমতাবস্থায় জনগণ বিদ্রোহ না করে দুমুঠো খেয়ে পড়ে বাঁচার চেষ্টা করছেন, জীবনের ঝুঁকি নিচ্ছেন, দেশান্তরী হচ্ছেন যা আমাদের রাজনীতিবিদ কিংবা শাসক ক্ষমতাসীনদের জন্যে পোয়া বারোই বলতে হবে। কিন্তু দূর্ভাগ্য, দুঃখজনকভাবে এসব অসহায় মানুষ নিজের জীবন বাঁচাতে গিয়ে জীবন দিচ্ছেন নিষ্ঠুর নির্মমতার স্বীকার হচ্ছেন। যা কোনভাবেই কাম্য হতে পারে না…।

লেখক: সাহিত্যিক ও গণমাধ্যমকর্মী

ফেসবুক মন্তব্য