ঢাকা বৃহস্পতিবার, নভেম্বর ১৫, ২০১৮

Mountain View



সন্ত্রাসের জনপদ গোপালপুর : চাঁদাবাজরা গুড়িয়ে দিলো বাড়িঘর, লুটে নিল পুকুরের মাছ, পাড়ের গাছ, গোয়ালের গরু

Print Friendly, PDF & Email

কে এম মিঠু, গোপালপুর (টাঙ্গাইল) সংবাদদাতা: সন্ত্রাসের জনপদ গোপালপুরে চাঁদাবাজদের হাতে ঘরবাড়ি গুড়িয়ে দেয়া, পুকুরের মাছ, পাড়ের গাছ, গোশালার গরু, গোলার ধান লুটে নেয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। প্রকাশ্য দিবালোকে লুটের মূল হোতা হলেন এক ইউপি মেম্বার। এলাকাবাসি তাকে ডাকে নেতা নামে। পদে সরকারি দলের পুঁচকে নেতা। তবে দাপট সীমাহীন। গত শুক্রবার অকূস্থল ধোপাকান্দি ইউনিয়নের নারায়নপুর গ্রাম সরেজমিন পরিদর্শণে গিয়ে ওই ইউপি সদস্য ও তার দলবলের কুকীর্তির জলন্ত নমুনা দেখতে পান প্রতিবেদক। হতভাগ্য গৃহস্থ্য শমসের আলীর সাজানো বাড়ির শূণ্য ভিটে এখন খাঁ খাঁ করছে।

gopalpur 1

গ্রামের প্রবীণ ছাইদুর রহমান জানান, ঘটনার সূত্রপাত গত ৫ মে। বর্ণনা দিয়ে বলেন, ‘ওই দিন গাছের আম পাড়া নিয়ে ঝগড়ায় শমসের আলীর স্কুল পড়–য়া পুত্র আব্দুল হাকিম পড়শ সোবহান মিয়ার মাথা ফাটিয়ে দেয়। পিতাপুত্রকে আসামী করে থানায় মামলা হয়। পারিবারিক পর্যায়ে ঘটনার মিমাংসা চূড়ান্ত হয়। এতে হস্তক্ষেপ করেন ইউপি মেম্বার হুমায়ুন কবীর। নেতার পারমিশন ছাড়া এলাকার গাছের পাতা নড়েনা। আর মারামারির আপোষরফা তার সম্মতি ছাড়া হবেনা বলে ঘোষনা দেন। এর পরেই ঘটে ওই অপকর্ম। তা সবার জানা।’

ক্ষতিগ্রস্ত শমসের জানান, গ্রামের ইউপি সদস্য ও ওয়ার্ড আওয়ামীলীগ নেতা হুমায়ুন কবীর সেকেন্ড ইন কমান্ড আতিকুলের মাধ্যমে গত ১৯ মে বাড়িতে ডেকে পাঠান। তাকে ধমকে বলা হয়,‘তোরা বাপব্যাটা মারামারির আসামী। আমার ওয়ার্ডে বাস কইরা আমারে না জানাইয়া আপোষরফা চলবোনা। আপোষ অহনের আগে কাফফারা হিসাবে একলক্ষ টাকা চাঁদা দিবি। নইলে তোর ক্ষেতের বোরো ধান কাটা বন্ধ থাকবো।’

শমসের আলীর স্ত্রী হাছিনা বেগম জানান, ‘ক্ষেতের তিন বিঘা জমির পাঁকা ধান কাটবার গেলে মেম্বার হুমায়ুন ও সন্ত্রাসী আতিকুল বাধা দেয়। চোহেমুহে না দেইকা ২৪ মে ১০ হাজার টেহা চাঁন্দা দিয়া ধান কাটাই। এরপর হুমায়ুন ও তার সাঙ্গতরা আরো ৯০ হাজার টেহার জোন্নে চাপ দেয়। ভয় পাইয়া আমার স্বামী ধনবাড়ির ভাইঘাট গ্রামে আত্মীয় বাড়ি আশ্রয় নেয়। এর মধ্যে গত ২০ জুন শনিবার সকালে সন্ত্রাসী আতিকুল, পিতা শুকুর, মেম্বার হুমায়ুন কবীর পিতা ইয়াকুব, হাবিবুর পিতামৃত ইয়াছিন, দুদু পিতা সামাদ, শফিকুল পিতা ইউসুফ, শুকুর ও জলিল পিতা তফছর এর নেতৃত্বে ২৫/৩০ জন সন্ত্রাসী রামদা, লোহার রড়, লাঠি, খোন্তা ও কুড়াল নিয়ে বাড়িতে হামলা চালায়।

gopalpur

ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী গিয়াস উদ্দীন জানান, হেরা অস্ত্রশস্ত্র নিয়া দলবাইন্ধা আইয়া বাড়ির চাইরডা টিনের ঘরের বেড়া ও চালের টিন খুললা ফালায়। ঘরের বেরে (গোলা) রাহা ৫০ মণ ধান, গোয়াইল ঘরের তিনডা গরু, খাট, টেবিল, আলমারি, থালবাসন, কাপড়চোপড়, টেলিভিশন থাইকা যা আছিলো সব জিনিষ লুইটা নিয়া রিকসা ভ্যান আর ভটভটিতে কইরা চইলা যায়। পর দিন হেরা সবাই আবার আইয়া পুকুরের সব মাছ লুট কইরা নিয়া যায়। বাড়ির উটান আর পুকুর পারের ষাটসত্তুরডা কাঠাঁল, জাম, আম, সেগুন, মেহগিনি, ইউক্যালিপটাশ ও আকাশমনি গাছ কাইটা নেয়।’

আরেক প্রত্যক্ষদর্শী মালেক মুন্সি জানান, ‘বাবাগো দিনেদুহুরে এমন ডাহাতির কথা কোনো দিন হুনি নাই। গাঁর সবাই দারাইয়া দারাইয়া ঘটনা দেইখছে। ভয়ে কেউ কাছে যাবার সাহস পায় নাই। হুনলাম মামলা অইছে। ওরা আমাগোরে সকাল বিকাল শাসাইতাছে। বোলতেছে তোরা কিছু দেহস নাই। শোনোস নাই। যদি দেহখা থাকস, শুইনা থাকস তবে হজুমত (শাস্তি) পাবি। হের জন্নে ভয়ে কিচু কবার পারিনা।’ পাশ্ববর্তী আঠার পাখিয়া গ্রামের সেকান্দর আলী জানান, মেম্বর হুমায়ুন দাঙ্গাবাজ। যাদের নিয়ে চলে হেরা সব দুষ্ট লোক। সরকারি দলের নাম ভাঙ্গাইয়া ছয়সাত বছর ধইরা ত্রাশ বানাইছে। ওগোর ভয়ে কেউ মুখ খোলবার পারেনা। হুমায়ুন নিজে নিশা করে। চেলাচামুন্ডাদের নিশা করায়। নিশা দ্রব্য বেইচা টেহা কামায়।

মেম্বার হুমায়ুন এলাকায় ত্রাশের রাজত্ব কায়েম করেছেন স্থানীয় সাংবাদিকরা তা হাতেনাতে প্রমাণ পায়। গত শুক্রবার অকূস্থল পরিদর্শনের সময় সাংবাদিকরা গ্রামবাসির সাক্ষাৎকার নেয়ার সময় মেম্বার হুমায়ুন অনাহুত ভাবে সেখানে হাজির হয়ে দুজন মহিলাকে ধমক দিয়ে বলেন‘ অহন সাংবাদিক পাইয়া তোগর মুখচোখ খুইলা গেছে। সাংবাদিকরা যখন যাবোগা তহন এ বাপেরে লাগবো। আমি ভোটে নেতা অইছি। মাগনা চোদা না। তার গর্জনে এক দমকায় সবাই স্থান ত্যাগ করে। পরে মেম্বার হুমায়ুন বলেন,‘ভাইরে কোন থিকা যে এত লোক আইয়া দিনদুপুরে এমন ডাহাতি কইরা গেলো বুঝবার পারলামনা। গাঁয়ের লোকের হাথে আমিও চাই। যারা একাম করছে তারা শাস্তি পাইক।’

ভিক্টিম সমশের জানান, প্রকাশ্য দিবালোকে আমার সবকিছু লুইটা নিয়া হুমায়ুন মেম্বর নানা মিথ্যাচার করতেছে। আমারে প্রাণে মাইরা ফেলার চেষ্টা করতাছে। সব মিলায়া আমার ২০/২৫ লক্ষ টাকার ক্ষতি করছে। মামলার জন্নে থানায় যাওয়ার পথে আটকাইয়া হুমায়ুন আমারে মাইরধোর করছে। উপায় না দেইখা আমি গত ২২ জুন জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হুমায়ুনসহ তার দলের ১৮ জনেরে আসামী কইরা মামলা দিছি। আমি এ অন্যায়ের বিচার চাই।’

এদিকে সংশ্লিষ্ট আদালত গোপালপুর থানা পুলিশকে তদন্ত পূর্বক আগামী ১৩ জুলাই এর মধ্যে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেন। থানার ওসি জহিরুল হক জানান, বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে। ধোপাকান্দি ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান সিরাজুল ইসলাম ঘটনার সত্যতা স্বীকার করেছেন।

ফেসবুক মন্তব্য