,


রাজনীতির অবতার-ম্যান্ডেলা

Print Friendly, PDF & Email

জাহিদ কবীর হিমন, জার্মানি থেকে : বলা হয়ে থাকে মৃত্যুই সবচেয়ে প্রতিষ্ঠিত সত্য। এর কারণ এর উপস্থিতি টের পাওয়া যায়। জন্মস্বাদ কারো মনে থাকার কথা নয়, টের পাওয়া যায় মৃত্যুকষ্ট। এই অমোঘ সত্য আর তার শেষ পরিণতি সকলেরই জানা। জাগতিক সকল বিষয়ের সাথে সম্পর্কচ্ছেদ ঘটে মৃত্যুর মধ্য দিয়ে।

Nelson Mandela. 1 কোন অঞ্চলের লতাগুল্ম হামেশা মারা যায়, হয়ত এর পাশের সবুজ ঘাসই তা টের পায় না। তবে অঞ্চলের প্রাচীন কোন বটবৃক্ষ মারা গেলে শুধু আশ্রয়হীন পক্ষীকুলই বিপদাপূর্ণ হয় না বরং যুগের পর যুগ যে মানুষেরা চলতি পথে খানিক ছায়ার আশায় বটবৃক্ষের তলে সময় যাপন করত তারা পর্যন্ত শোকার্ত হয়ে পড়ে। মহাকাল আর মহাবিশ্বের বটবৃক্ষন্যায় নেলসন ম্যান্ডেলার মৃত্যও তাই এমনই শোকের, এমনই বেদনার। নির্যাতিত নিষ্পেষিত নীপিড়িত বঞ্চিত শোষিত মানুষের চিরস্থায়ী কণ্ঠস্বর হিসেবে বিশ্বের ইতিহাসে তাঁর নাম স্বর্ণাক্ষরে লিখিত থাকতে এই বিশ্বের ধ্বংসোবধি পর্যন্ত।

পরিবারের সাথে জন্মদিনে

পরিবারের সাথে জন্মদিনে

একটি মানুষ এক জীবনে গণমানুষের তরে কত ত্যাগ স্বীকার করতে পারে তার অত্যুজ্জল উদাহরণ তিনি। অধুনা অস্থির বিশ্ব ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বহু দেশের বহু শাসককে দানবের ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে দেখা যায়। ক্ষমতা আঁকড়ে থাকার উন্মত্ততায় হেন স্বৈরকর্ম নাই যা তাদের দ্বারা কৃত হয় না। বিরোধীমত দমনে রাষ্ট্রের সকল শক্তি নিয়োগকৃত হয়। তথাপি আজ পর্যন্ত এই অপশাসকদের টিকে থাকার ইতিহাস তৈরি হয়নি। এই সমস্ত কুশাকসদের কাছে নেলসন ম্যান্ডেলা এক শ্রেষ্ঠ রাজনৈতিক শিক্ষক হিসেবে পরিগণিত হতে পারে। শোষণের শেষ সীমা পর্যন্ত সহ্য করে জনগণের অকুন্ঠ সমর্থনে ক্ষমতাসীন হয়ে কী করে সকলকে ক্ষমা করতে হয়, সকলকে নিয়ে কীভাবে উন্নয়নের পথে চলতে হয় এই দৃষ্টান্ত তিনি পৃথিবীর সমসাময়িক ও ভাবী শাসকদের জন্য স্থাপন করে গেছেন।

কৃষ্ণাঙ্গদের ন্যায্য অধিকার আদায়ের সংগ্রামকে নিজের জীবনের ব্রত করায় রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগ মাথায় নিয়ে কারাগারে প্রায় তিন দশকের জীবন কাটাতে হয়। একদিন বর্ণবাদের কৃষ্ণপক্ষ কেটে যায়, মহাসাম্যের সূর্য্য উদিত হয়, আর তিনি পরেন দক্ষিণ আফ্রিকার প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ প্রেসিডেন্টের মুকুট। দক্ষিণ আফ্রিকা হতে সাদা আর কালো মানুষদের মাঝে অসামান্য সাম্য প্রতিষ্ঠার জন্য তিনি ১৯৯৩ সালে লাভ করেন নোবেল শান্তি পুরষ্কার

রবেন দ্বীপ- যে দ্বীপে ম্যান্ডেলা তাঁর বন্দীদশা কাটিয়েছিলেন

রবেন দ্বীপ– যে দ্বীপে ম্যান্ডেলা তাঁর বন্দীদশা কাটিয়েছিলেন

সুদীর্ঘ্য জীবনে তিনি কর্মের যে ব্যাপ্তি ছড়িয়েছেন পৃথিবী চিরকার তা থেকে শিক্ষা নিয়ে চলবে। বিনয়বোধ কী জিনিস আধুনিক নেতারা বিশেষ করে আমাদের মত তৃতীয় বিশ্বের নেতৃবৃন্দ তাঁর থেকে রপ্ত করতে পারে। তিনি কখনো নিজেকে নেতা হিসেবে আখ্যায়িত করেননি। বিভূতিভূষণ বলেছিলেন, “আমি আমি ছাড়, আমার আমার ত্যাগ কর, ত্যাগের মাঝে ভোগ কর”। এই ত্যাগের পরাকাষ্ঠা তিনি স্থাপন করেছেন। আত্মজৈবনিক গ্রন্থ ‘লং ওয়াক টু ফ্রিডম‘-এ ম্যান্ডেলা লিখেছেন, নেতার কাজ পাদপ্রদীপের সব আলো নিজের ওপর ধরে রাখা নয়, পেছনে থেকে সবাইকে সামনে এগোতে সাহায্য করা। ম্যান্ডেলার কথায়, একজন নেতা হলেন মেষপালকের মতো। মেষের দল থাকবে সম্মুখে। যারা সবচেয়ে চতুর ও দ্রুত পথচলায় সক্ষম, মেষপালক তাদের সামনে এগোনোর পথ করে দেবে। অন্যরা তাকেই অনুসরণ করে চলবে, অথচ জানতেও পারবে না পেছন থেকে কে তাদের পরিচালিত করছে। ম্যান্ডেলা তাঁর স্মৃতিকথার একটি খসড়া করেছিলেন। তাঁর দলের তিনজন নেতার দায়িত্ব ছিল ভুলভ্রান্তি শুদ্ধ করে তা বই আকারে প্রকাশ করার। প্রকাশক সহ সকলের চেষ্টা ছিল ম্যান্ডেলার জীবনের ব্যক্তিগত প্রসঙ্গ যেন তাতে বেশি করে ঢোকানো হয়। ম্যান্ডেলাকে মহান করে দেখানোর চেষ্টা বইটির কাটতি ও ম্যান্ডেলার ব্যক্তিগত ইমেজের জন্য সহায়ক হবে—এই ছিল তাদের যুক্তি। ম্যান্ডেলা তাদের সেই কথায় রাজি হননি।

nelson mendela 6

সুখী মুহূর্তে নেলসন ও উইনি

কঠোর অধ্যাবসায়, জনগণের প্রতি তীব্র ভালবাসা আর তাদের অধিকার আদায়ে নিরলস পরিশ্রম কী করে অভিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছতে সাহায্য করে সারাটা জীবনই তিনি সেসবের দৃষ্টান্ত তৈরি করেছেন। হানাহানি হিংসা-প্রতিহিংসার পথ পরিহার করে অহিংসা প্রেম আর সাম্য দিয়ে বিজয়মাল্য অর্জনের উদাহরণ ম্যান্ডেলা

দুঃখ-কষ্ট ম্যান্ডেলাকে প্রতিহিংসাপরায়ণ করে তোলেনি, করেছে আরও মানবিক। এমনকি তাদের প্রতিও তিনি মানবিক ছিলেন যারা বর্ণবাদের সৃষ্টি করেছে, তাঁকে জেলে ঢুকিয়েছে। তিনি মনে করতেন, তারাও দেশের নাগরিক। কে দক্ষিণ আফ্রিকা গণতান্ত্রিকভাবে পুনর্গঠিত করার জন্য কৃষ্ণাঙ্গ আর শ্বেতাঙ্গদের মধ্যে তখন আলাপ-আলোচনা চলছে। কখনো কখনো আলোচনা থমকে যাচ্ছে, সহিংস হয়ে উঠতে চাইছে, পুলিশ আর বর্ণবাদীদের মধ্যে সংঘাত ঘটছে। এক মাস পর অচলায়তনের মধ্য দিয়ে ভেঙে গেল এই কনভেনশন। কিন্তু এর মাধ্যমেই প্রণীত হলো সেই নতুন সংবিধান, যেখানে দক্ষিণ আফ্রিকার সাদা-কালো সব মানুষের সম-অধিকার নিশ্চিত হলো।

বক্সিংরত ম্যান্ডেলা

বক্সিংরত ম্যান্ডেলা

ধর্মীয় অবতার সেজে পৃথিবীতে আগমন ঘটলে শেষকালে মওকা মত সম্মানপ্রাপ্তি ঘটে না। এর কারণ সম্প্রদায়গত ধর্মীয় প্রচার যা অন্য ধর্মাবলম্বীদের কোন কাজে দেয় না। ফলে সংশ্লিষ্ট ধর্মের অবতারের প্রস্থানের পর শোক সাগরে ভাসে শুধু তাঁরই অনুসারীরা। এদিক থেকে ভাগ্যবান তাঁরা যাঁরা ধর্ম বর্ণ গোত্র সম্প্রদায় ব্যতিরেকে গণমানুষকে শুধু মানুষজ্ঞান করে নিরলস যাবজ্জীবন কাজ করে। নেলসন ম্যান্ডেলা তাই করে গেছেন যা কোন ধর্মবেত্যা করেননি। ম্যান্ডেলা তাই সম্মানিত হলেন ঠিক তেমনি করেই যেমনি করে সম্মানিত হওয়া তাঁর প্রাপ্য ছিল। যে দিনে যেকালে যে যুগে অজ্ঞতা কুসংস্কার অন্ধকার হতে মুক্ত হয়ে স্বাপ্নিক কল্পিত উপাস্য ভুলে গিয়ে সম্মান আর উপাস্যের স্থানে ম্যান্ডেলাদের বসাবে মানুষ সেদিন সহস্র বছরে একজন মহামানব নয়, মহামানব আসবে শতাব্দী অন্তর। হৃদয় নিংড়ানো শ্রদ্ধা আর সম্মান মহাকালের এক মহানায়ক বিপ্লবী নেলসন ম্যান্ডেলাকে।

লেখক : শিক্ষার্থী, কন্সটাঞ্জ বিশ্ববিদ্যালয়; জার্মানি, উপদেষ্টা সম্পাদক, টাঙ্গাইল বার্তা

লেখাটি ‘জার্মান প্রবাসে’ নামক ম্যাগাজিনের প্রকাশিত

Comments

comments