আন্দোলনের পথে জামায়াত

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশের সময়: সোমবার, ১৬ মার্চ, ২০২৬ । ১০:০৯ পূর্বাহ্ণ

দেশের রাজনীতিতে সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম আলোচিত ইস্যু সংবিধান সংস্কার পরিষদ। এ বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ স্পষ্ট করে বলেছেন, গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করতে হলে সংবিধান সংশোধন অপরিহার্য। তবে বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন নিয়ে সৃষ্ট সংকটের সমাধান জাতীয় সংসদে না হলে রাজপথে নামবেন। ঐকমত্য কমিশন নিয়ে দ্বিচারিতা করা হয়েছে জানিয়ে ইতোমধ্যে ১১দলীয় জোটের পক্ষ থেকে ঈদের পর আন্দোলনের আভাস দেওয়া হয়েছে। যদিও রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, সংসদ ও রাজপথ দুই জায়গাতে চাপে রাখতেই বিরোধী দলের কৌশলের অংশ এটি। বিএনপি সংবিধান সংস্কারের অঙ্গীকার থেকে পুরোপুরি সরে যায়নি, বরং তারা সংবিধান সংশোধনে বিল আনার কথা বলেছে।

সংসদের প্রথম অধিবেশন গত ১২ মার্চ শুরু হয়। সংবিধানের ৭২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ওই দিন অধিবেশন আহ্বান করেন এবং প্রথম দিনই ভাষণ দেন। এরপর রোববার বেলা ১১টা পর্যন্ত অধিবেশন মুলতবি করা হয়। গত শনিবার কার্যোপদেষ্টা কমিটির বৈঠকে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর মোট ৫০ ঘণ্টা আলোচনার সিদ্ধান্ত আসে। সেদিন সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানিয়ে বিরোধী জোট আন্দোলনে নামার হুমকি দেয়। ফলে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আনা ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনায় জুলাই জাতীয় সনদ, গণভোটের রায় ও সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য শপথ প্রসঙ্গ টেনে বিএনপির অবস্থান নিয়ে সরাসরি প্রশ্ন তোলেন বিরোধী দলের সদস্যরা।

অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি করা জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন ডাকার জন্য গতকাল ছিল শেষ দিন। এদিন সরকার জানায়, এ ধরনের কোনো পরিষদ করতে হলে আগে সংবিধান সংশোধন প্রয়োজন। ফলে সাম্প্রতিক সময়ের রাজনীতির তুমুল আলোচিত ইস্যু সংবিধান সংস্কার পরিষদ নামে যে কিছু এখনই হচ্ছে না, তা পরিষ্কার।

সংস্কার ইস্যুতে বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন নিয়ে সৃষ্ট সংকটের সমাধান জাতীয় সংসদের ভেতরে হোক- এমনটা চায় বিরোধী দল। তবে সংসদের ভেতরে এর সমাধান না হলে রাজপথে নামবে বিরোধী দল। তিনি বলেন, সরকার গঠনের পর সংসদ অধিবেশন ডাকা হলেও সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন ডাকা হয়নি। অধিবেশনের প্রথম দিন সময় কম ছিল, বিরোধী দলও একটা ইস্যুতে ওয়াকআউট করেছিল। বিরোধী দল সেখানে কথা তুলেছিল, কিন্তু তাদের কথা আমলে নেওয়া হয়নি। অধিবেশনের দ্বিতীয় দিনের শুরুতে পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে বিরোধী দল সে ব্যাপারে কথা বলার চেষ্টা করেছে।

জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ পুরোটাই সংসদে পড়ে শোনানো হয়েছে উল্লেখ করে জামায়াতের আমির ও বিরোধী দলের নেতা বলেন, ‘শেষ পঞ্জিকা দিবস উপলক্ষে বিরোধী দল গতকালের (রোববার) মধ্যে এর সমাধান চেয়েছিল। বিরোধী দল যে সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ নিয়েছে, এই শপথের কী হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে, পাশাপাশি যারা শপথ নেননি, তারা কবে শপথ নেবেন, তা-ও জানতে চাওয়া হয়েছিল। এ ছাড়া সংস্কার পরিষদের অধিবেশন কবে ডাকা হবে, গণভোটকে আদৌ মান্য করা হবে কি নাÑ এসব প্রশ্নও তোলা হয়েছিল।’

শফিকুর রহমান বলেন, ‘পয়েন্ট অব অর্ডারে এসব বিষয় তুলে ধরা হলে স্পিকার বলেছেন, এ ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট নোটিশ দিলে বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে আলোচনা করা হবে। বিরোধী দল একটি নোটিশ দিয়ে সংসদের ভেতরেই এ সমস্যার সমাধান চাইবে। কিন্তু সংসদের ভেতরে যদি জনগণের প্রত্যাশা বা আকাক্সক্ষার প্রতিফলন না ঘটে, তখন স্বাভাবিকভাবেই রাজপথে নামতে হবে। তবে বিরোধী দল সেটা চায় না।’ তিনি আরও বলেন, ‘যেহেতু আমরা বিষয়টা উত্থাপন করেছি, মাননীয় স্পিকার যেহেতু এটা বিবেচনায় নিয়েছেন, নোটিশ দিতে বলেছেন, সেই ধারাবাহিকতায় এটা এখন চলতে পারে।’

এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, সংবিধানে সংবিধান সংস্কার পরিষদের অস্তিত্ব না থাকায় প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রপতিকে পরামর্শ দিতে পারেন না। রাষ্ট্রপতিও অধিবেশন ডাকতে পারেন না বলে তা করেননি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘জুলাই জাতীয় সনদ কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করতে সরকার অঙ্গীকারবদ্ধ। গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করতে হলে সংবিধান সংশোধন অপরিহার্য। সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি জাতীয় সংসদের অধিবেশন আহ্বান করেছেন। এখানে ‘সংস্কার পরিষদ’ নামে কোনো অধিবেশন নেই। জুলাই জাতীয় সনদ অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার পরিষদ বাস্তবায়ন করতে হলে আগে সংবিধানে সংশোধনী আনতে হবে।’

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, “রাষ্ট্রপতি জাতীয় সংসদের অধিবেশন আহ্বান করেছেন, কোনো ‘সংস্কার পরিষদের’ অধিবেশন আহ্বান করেননি। আমরা এখন সাংবিধানিকভাবে জাতীয় সংসদের অধিবেশনে অংশ নিচ্ছি। ওই পরিষদের সাংবিধানিক বৈধতা নিয়ে ইতোমধ্যে আদালতে চ্যালেঞ্জ হয়েছে এবং রুল জারি রয়েছে। বিষয়টি বিচার বিভাগের বিবেচনায় রয়েছে।” তিনি আরও বলেন, ‘সংবিধান অনুযায়ী বর্তমানে এমন কোনো পরিষদের অস্তিত্ব নেই। গণভোটের রায়ের ভিত্তিতে এ ধরনের পরিষদ গঠন করতে হলে আগে সংবিধানে সংশোধনী আনতে হবে। সংসদে আলোচনা শেষে সংবিধান সংশোধন হলে তবেই এটি সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত হবে এবং পরে প্রয়োজন হলে পরিষদ গঠন ও শপথগ্রহণের বিষয়টি আসতে পারে।’

তবে বিরোধী দলের নেতা শফিকুর রহমান পাল্টা প্রশ্ন ছুড়ে সরকারের কাছে জানতে চেয়েছেন, সংবিধানে কি ২০২৬ সালে কোনো ভোট ছিল? এটা তো ছিল না। এই প্রেসিডেনশিয়াল অর্ডার, একই অর্ডার, এই একই অর্ডারের মাধ্যমে যেটা হয়েছে, আপনি এক অংশকে সংবিধানের বাইরে গেলেও মানবেন, আরেক অংশকে বাইরে গেলে মানবেন না। না মানলে দুটোই না মানেন। আর মানলে তো দুটোই মানতে হবে। নতুবা রাজপথেই সমাধান খোঁজার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তারা।

এদিকে, জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১দলীয় জোটের পক্ষ থেকেও হুঁশিয়ারি দিয়ে বলা হয়েছে, সংস্কার পরিষদ বিষয়ে সংসদে সমাধান না হলে রাজপথে নামবে বিরোধী দল। প্রয়োজনে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে রাজপথেই সামাধান খুঁজবে ১১ দল।

রাজপথেই সমাধান খুঁজবে বিরোধী দল : জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১দলীয় জোটের লিয়াজোঁ কমিটির সভার পর সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন না ডাকলে রাজপথে আন্দোলনের হুমকি দেওয়া হয়েছে। লিয়াজোঁ কমিটির সমন্বয়ক হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, সরকার যদি এ বিষয়ে উদ্যোগ না নেয়, তাহলে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের দাবিতে রাজপথে আন্দোলনে নামতে বাধ্য হবে ১১দলীয় ঐক্য।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট এবং ঐকমত্য কমিশন নিয়ে দ্বিচারিতা করা হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সংগঠক ও কুমিল্লা-৪ আসনের সংসদ সদস্য হাসনাত আব্দুল্লাহ। তিনি বলেন, জাতীয় নির্বাচন, গণভোট, ঐকমত্য কমিশন নিয়ে দ্বিচারিতা করা হয়েছে। বিএনপির কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে তা প্রমাণিত। তাদের সংবিধান নিয়ে দেওয়া বক্তব্য অনেকটা পতিত সরকারের সময়ে দেওয়া বক্তব্যের মতো শোনায়।

জাতীয় নাগরিক পার্টির সদস্যসচিব আখতার হোসেন বলেছেন, ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদের জন্য সংসদের ভেতরে ও বাইরে তারা তাদের প্রচেষ্টা চালিয়ে যাবেন। প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শে রাষ্ট্রপতি সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন না ডাকলেও আমরা মনে করি, এটি করার সুযোগ আছে।’

এ বিষয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) অধ্যাপক মো. শামছুল আলম সেলিম রূপালী বাংলাদেশকে বলেছেন, বিএনপি সংবিধান সংস্কারের অঙ্গীকার থেকে পুরোপুরি সরে যায়নি, বরং তারা সংবিধান সংশোধন বিল আনার কথা বলেছে। বিএনপির দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা আছে। সংবিধান সংস্কার পরিষদের কাজ ছিল সংবিধান সংশোধন করা। বিএনপি সেটি সংবিধান সংশোধন বিলের মাধ্যমে করার পক্ষে। সুতরাং সংবিধান সংশোধন নিয়ে মতপার্থক্য নেই।

রাষ্ট্রপতির আদেশে যা ছিল : ’২৪-এর ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে গঠিত জাতীয় ঐকমত্য কমিশনে রাজনৈতিক দলগুলোর ধারাবাহিক আলোচনার পর ২০২৫ সালের ১৭ই অক্টোবর ‘জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫’ স্বাক্ষরিত হয়েছিল। একই বছরের ১৩ নভেম্বর জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ গেজেট আকারে প্রকাশ করা হয়। পরে জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ অনুসারে সংবিধান সংস্কার সম্পর্কিত কতিপয় প্রস্তাবের বিষয়ে জনগণের সম্মতি রয়েছে কি না, তা যাচাইয়ে ২৫ নভেম্বর গণভোট অধ্যাদেশ, ২০২৫ জারি করা হয়। তার ভিত্তিতে গত ১২ ফেব্রুয়ারি সংসদ নির্বাচনের দিন একই সঙ্গে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং তাতে হ্যাঁ ভোট জয়ী হয়েছে। নির্বাচনের পর জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটের নির্বাচিতরা সংসদ সদস্য ও সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নিলেও বিএনপির নির্বাচিতরা শুধু সংসদ সদস্য হিসেবেই শপথ নিয়েছেন। দলটি তখনই এর ব্যাখ্যা দিয়ে বলেছিল যে, সংবিধানে সংবিধান সংস্কার পরিষদ ও এর শপথের বিষয়ে কিছু নেই বলেই তারা শপথ নেয়নি।

সম্পাদক : মোঃ খায়রুল ইসলাম, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : টাঙ্গাইল-ময়মনসিংহ রোড, দেউলাবাড়ী, ঘাটাইল, টাঙ্গাইল-১৯৮০। মোবাইল : +৮৮০১৭৬৪-২৬৬৪৭৫

প্রিন্ট করুন