ভোরের আলো ফুটলেই গ্রামীণ কাঁচা রাস্তার পাশে থমকে দাঁড়ায় নিয়তি। জন্ম থেকেই যার দুটি হাত নেই, তার পৃথিবীর ক্যানভাসে ছবি আঁকার কথা ছিল না। কথা ছিল না হাজারো প্রতিকূলতার দেয়াল টপকে বিজয়ের নিশান ওড়াবার। কিন্তু শারীরিক সীমাবদ্ধতা আর দারিদ্র্যের নিষ্ঠুর পরিহাসকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে এক অনন্য ইতিহাস লিখে চলেছেন টাঙ্গাইলের ঘাটাইল উপজেলার ৭ নম্বর দিগড় ইউনিয়নের গারট্র উত্তরপাড়া (খুশিপাড়া) গ্রামের সন্তান মো. তাওহীদ ইসলাম।
“হাত নেই বলে থমকে দাঁড়ায়নি পথ,
পা দিয়ে লিখে বুনেছেন শত শপথ।
চোখ মেলে চেয়ে আকাশের নীল পানে,
জীবন জয়ের গান গায় অদম্য প্রাণে।”
পিতা মো. ফজলুল হক ও মাতা রত্না খাতুনের সন্তান তাওহীদের জীবনটা আর দশটা শিশুর মতো সহজ ছিল না। শৈশবে সমবয়সীরা যখন হাত বাড়িয়ে জীবনের রং কুড়াত, তখন তাওহীদ নিষ্পাপ চোখে তাকিয়ে থাকতেন নিজের খালি দুটি কাঁধের দিকে। কিন্তু তিনি হার মানেননি। প্রকৃতির কাছে পরাজয় না মেনে পা দুটোকেই বানিয়ে নিয়েছেন হাত, আর আঙুলগুলোকে করেছেন স্বপ্নের কলম।
“অশ্রু জমেছে চোখের কোণে অজস্র নিশিরাতে,
তবু কলম থেমে থাকেনি, পায়ের ওই শক্ত মুঠোতে।
ব্যথার পাহাড়ে দাঁড়িয়ে যিনি জিতেন দিনপ্রতিদিন,
তাঁর এই লড়াইয়ের কাছে ইতিহাস নিজেই ঋণ।”
পা দিয়ে প্রতিটি অক্ষর লেখার পেছনে রয়েছে দীর্ঘ কষ্টের গল্প। ঘণ্টার পর ঘণ্টা পায়ের আঙুলের ভাঁজে কলম চেপে ধরে পড়াশোনা করতে গিয়ে তাঁর আঙুলে ক্ষত তৈরি হয়েছে। তবুও সেই যন্ত্রণা তাঁর অদম্য ইচ্ছাশক্তিকে দমাতে পারেনি।
কঠিন সেই পথ পেরিয়ে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় জিপিএ ৪ দশমিক ৩৮ অর্জন করে সবাইকে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন তাওহীদ। বর্তমানে তিনি ঐতিহাসিক করটিয়া সা’দত কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে স্নাতক সম্মান প্রথম বর্ষে পড়াশোনা করছেন।
মায়ের ভেজা চোখ আর বাবার নিঃশব্দ দীর্ঘশ্বাসের মাঝে দাঁড়িয়ে তাওহীদ এখন শুধু নিজের স্বপ্ন পূরণের জন্য লড়ছেন না, তাঁর সংগ্রাম অনুপ্রেরণা জোগাচ্ছে পুরো সমাজকে। তবে তাঁর মনের গভীরে রয়েছে একটি সহজ আকাঙ্ক্ষা—পড়াশোনা শেষ করে নিজের পায়ে দাঁড়ানো এবং একটি সরকারি চাকরি পাওয়া।
গভীর আবেগে তাওহীদ বলেন, “আমার দুটি হাত নেই, বেঁচে থাকার তাগিদে আমি পা দিয়েই সব লিখি। আমার খুব বেশি চাওয়া নেই এই পৃথিবীর কাছে; আমি কেবল নিজের পায়ে শক্ত হয়ে দাঁড়াতে চাই। কষ্ট করে পড়াশোনাটা শেষ করে যদি একটি সরকারি চাকরি পাই, তবে আমার ভাঙা সংসারের মুখে একটু হাসি ফোটাতে পারব। আল্লাহ যদি সেই সুযোগটা দেন, তবে এই জীবন সার্থক হবে।”
“হাত নেই বলে কে বলে গো তিনি একা?
তাঁর বিশ্বাসের ক্যানভাসে তো স্বর্গের আলো আঁকা।
রাষ্ট্র কি দেবে না বাড়িয়ে একটু সহানুভূতির হাত?
মুছে কি যাবে না তাঁর জীবনের এই ঘোর অমাবস্যা রাত?”
উচ্চশিক্ষার দীর্ঘ পথ তাওহীদের জন্য মোটেও মসৃণ নয়। অভাবের কষাঘাত আর ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা প্রতিনিয়ত তাঁকে ভাবিয়ে তোলে। পা দিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লিখে যখন শরীর আর সায় দেয় না, তখনও তিনি স্বপ্ন দেখেন—একদিন তাঁর এই নিরবচ্ছিন্ন পরিশ্রম সফল হবে।
তাওহীদ ইসলামের এই সংগ্রাম প্রমাণ করে, শারীরিক সীমাবদ্ধতা মানুষের স্বপ্ন ও আত্মবিশ্বাসকে থামিয়ে দিতে পারে না। এখন তাঁর প্রয়োজন পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ, কর্মসংস্থানের পথ এবং সমাজের সহযোগিতা।
বাবা মো. ফজলুল হক বলেন, “ছেলেটার যখন জন্ম হলো, হাত দুটো না দেখে বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠেছিল। ভেবেছিলাম ও হয়তো সমাজের বোঝা হয়ে থাকবে। কিন্তু তাওহীদুল আমাদের ভুল প্রমাণ করেছে। পা দিয়ে লিখে যখন ভালো ফল করে, গর্বে বুকটা ভরে যায়। তবে আমার তো সামর্থ্য নেই, বয়সও হচ্ছে—ওকে একটা সরকারি চাকরি দিলে আমরা অন্তত শান্তিতে মরতে পারতাম।”
মা মোছা. রত্না খাতুন কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, “ছোটবেলা থেকে ছেলেটার কষ্ট চোখের সামনে দেখেছি। অন্য বাচ্চারা যখন খেলত, ও তখন একমনে পা দিয়ে অক্ষর লেখা প্র্যাকটিস করত। ব্যথায় পা ফুলে যেত, রাতে ঘুমাতে পারত না, আমি লুকিয়ে কাঁদতাম। আমার তাওহীদ কারো কাছে দয়া চায় না, ও নিজের যোগ্যতায় বাঁচতে চায়। সরকার যেন আমার এই অবুঝ ছেলেটার দিকে একটু নজর দেয়।”
এলাকাবাসী বলেন, “তাওহীদ শুধু তার বাবা-মায়ের নয়, আমাদের পুরো গ্রামের গর্ব। দুই হাত না থাকার কষ্টকে হার মানিয়ে ও যেভাবে অনার্সে পড়ছে, তা আমাদের চোখের সামনে এক অলৌকিক ঘটনা। ওর মতো মেধাবী ও সংগ্রামী ছেলেকে যদি একটি সরকারি চাকরির সুযোগ দেওয়া হয়, তবে তা শুধু ওর একার নয়, পুরো সমাজের জন্যই এক বড় অনুপ্রেরণা হবে।”

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশের সময়: বৃহস্পতিবার, ২০ আগস্ট, ২০২৬ । ৪:৩৩ অপরাহ্ণ