চেয়ারম্যান রফিকুল হত্যায় মৃত্যুদণ্ড: প্রথমবার ‘খান পরিবারের’ সদস্যের সাজা

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশের সময়: মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ । ৭:৪৪ অপরাহ্ণ

টাঙ্গাইল সদর উপজেলার দাইন্যা ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও বিএনপি নেতা রফিকুল ইসলাম ফারুক হোসেন হত্যা মামলায় আওয়ামী লীগের বহুল আলোচিত ‘খান পরিবারের’ ছোট ছেলেসহ তিনজনকে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দিয়েছেন আদালত।

একই মামলায় আরও চারজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং একজনকে বেকসুর খালাস দেওয়া হয়েছে।

প্রায় চার দশক ধরে হত্যা, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও অস্ত্রবাজিসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ থাকলেও এই রায়ের মধ্য দিয়েই প্রথমবারের মতো টাঙ্গাইলের প্রভাবশালী খান পরিবারের কোনো সন্তানের সাজা হলো।

এই রায়ের দ্রুত বাস্তবায়ন চেয়েছেন মামলার বাদী ও নিহতের ভাই ভাই লাভলু মিয়া।

তিনজনের মৃত্যুদণ্ড, চারজনের যাবজ্জীবন

সোমবার দুপুরে টাঙ্গাইলের প্রথম অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ মো. ফয়সাল আল মামুন এ রায় ঘোষণা করেন বলে রাষ্ট্রপক্ষের অতিরিক্ত কৌঁসুলি (এপিপি) মোহাম্মদ সাইদুর রহমান স্বপন জানান।

মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত তিন আসামি হলেন- টাঙ্গাইল শহরের কলেজপাড়া এলাকার আতোয়ার রহমানের ছেলে ও কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সাবেক সহসভাপতি সানিয়াত খান বাপ্পা, সদর উপজেলার কাগমারা এলাকার আফজাল ফকিরের ছেলে মো. আজাদ এবং শ্রীফলিয়াটা গ্রামের মো. সহিদ মিয়ার ছেলে মো. শাহজাহান মিয়া। তারা সবাই পলাতক।

যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন- সদর উপজেলার কাঠুয়া যোগনী গ্রামের আব্দুল লতিফ মিয়ার ছেলে মো. সুজন, শ্রীফলিয়াটার মো. রওশন আলীর ছেলে মো. সানোয়ার হোসেন, কাগমারা এলাকার নুরুল ইসলাম নিলু বাবুর ছেলে মো. শফিকুল ইসলাম শফিক এবং ছিটকীবাড়ী গ্রামের মো. নুর বক্সের ছেলে রুজবেল ইমন।

আর সঞ্জিত ঘোষকে বেকসুর খালাস দেওয়া হয়েছে।

Image
সানিয়াত খান বাপ্পা (বাঁ পাশে) এবং তার ভাই জাহিদুর রহমান খান কাকন।

ফারুক হত্যা মামলায় চার ভাই

২০১৩ সালের ২০ ডিসেম্বরের সকালে রফিকুল ইসলাম ফারুককে হত্যা করা হয়। এ হত্যা মামলায় খান পরিবারের চার ভাই- সানিয়াত খান বাপ্পা, আমানুর রহমান খান রানা, সহিদুর রহমান খান মুক্তি ও জাহিদুর রহমান খান কাকনের নাম আসে।

ফারুক হত্যাকাণ্ডে বাপ্পার জড়িত থাকার বিষয়টি বের হয়ে আসার আগেই তিনি ২০১৪ সালে দেশ ত্যাগ করেন। বাপ্পা দেশ ত্যাগের পরপর জাহিদুর রহমান খান কাকনও দেশ ত্যাগ করেন।

সাবেক সংসদ সদস্য আমানুর রহমান খান রানা এবং টাঙ্গাইল পৌরসভার সাবেক মেয়র সহিদুর রহমান খান মুক্তি ফারুক আহমেদ হত্যা মামলায় দীর্ঘ সময় কারাগারে থাকার পর মুক্ত হন।

আমানুর ও সহিদুর আত্মগোপনে রয়েছেন। বাপ্পা বেলজিয়ামে, কাকন মালয়েশিয়ায় এবং রানা ভারতে অবস্থান করছেন।

কাদের সিদ্দিকীর সঙ্গে বিরোধ

দীর্ঘদিন টাঙ্গাইলে আওয়ামী লীগের রাজনীতি দুই ভাগে বিভক্ত ছিল। এক অংশের নেতৃত্বে ছিলেন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শামছুর রহমান খান, অপর অংশের নেতৃত্ব দিতেন কাদের সিদ্দিকী।

১৯৯০ সালে কাদের সিদ্দিকী ভারত থেকে দেশে ফেরার পর খান পরিবার ও সিদ্দিকী পরিবারের দ্বন্দ্ব চরম আকার ধারণ করে।

শামছুর রহমান খানের পক্ষে তার ভাতিজা প্রয়াত আমিনুর রহমান খান বাপ্পি, আমানুর রহমান খান রানা ও সহিদুর রহমান খান মুক্তি একটি বাহিনী গড়ে তোলেন।

তারা শহরের একটি অংশ নিয়ন্ত্রণ করতেন। এ সময় তাদের বিরুদ্ধে অনেক মামলা হয়। এজন্য কারাগারেও যেতে হয়েছে বহুবার।

২০০৩ সালের নভেম্বরে সন্ত্রাসী হামলায় আমিনুর রহমান খান বাপ্পি নিহত হন। তিনি নিহত হওয়ার পর তার অপর দুই ভাই জাহিদুর রহমান খান কাকন ও সানিয়াত খান বাপ্পা ভাইদের বাহিনীর সঙ্গে যুক্ত হন।

২০০৯ এর পর বাড়ে প্রভাব

২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর খান পরিবারের সন্তানদের প্রভাব আরও বেড়ে যায়। ২০১১ সালে সহিদুর রহমান খান মুক্তি টাঙ্গাইল পৌরসভার মেয়র নির্বাচিত হন। ২০১২ সালে আমানুর রহমান খান রানা টাঙ্গাইল-৩ (ঘাটাইল) আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।

অপর ভাই জাহিদুর রহমান খান কাকন বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতৃত্ব দেন। ছোট ভাই সানিয়াত খান বাপ্পা কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সহসভাপতি হন। পুরো জেলার ব্যবসা-বাণিজ্য, রাজনীতি ও ঠিকাদারী তাদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়।

চার ভাইয়ের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে হত্যা, চাঁদাবাজি, দখল ও সন্ত্রাসসহ বিভিন্ন অভিযোগে মামলা হয়েছে। আমানুর রহমানের বিরুদ্ধে অন্তত পাঁচটি হত্যা মামলাসহ অর্ধশতাধিক মামলা হয়। সহিদুর রহমানের বিরুদ্ধেও পাঁচটি হত্যা মামলাসহ প্রায় ৪০টি মামলা হয়েছে।

জাহিদুরের বিরুদ্ধে তিনটি হত্যাসহ এবং সানিয়াতের বিরুদ্ধে চারটি হত্যাসহ ডজনখানেক মামলা হয়েছে।

এত মামলা হলেও তাদের কখনও সাজা হয়নি। বিভিন্ন সময়ে মামলা প্রত্যাহার, বাদীপক্ষকে চাপ দেওয়া কিংবা সাক্ষীরা আদালতে না যাওয়ার অভিযোগও রয়েছে। ফলে এর আগে এই পরিবারের কোনো সন্তানের কোনো মামলায় সাজা হয়নি।

গত বছর আলোচিত আওয়ামী লীগ নেতা বীর মুক্তিযোদ্ধা ফারুক আহমেদ হত্যা মামলায়ও চার ভাই বেকসুর খালাস পান।

যেভাবে হত্যা করা হয় রফিকুল ইসলাম ফারুককে

টাঙ্গাইল সদর উপজেলার দাইন্যা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও সদর উপজেলা বিএনপির সহসভাপতি রফিকুল ইসলাম ফারুক টাঙ্গাইল শহরের আকুরটাকুর পাড়ায় ভাড়া বাসায় থাকতেন।

২০১৩ সালের ২০ ডিসেম্বর সকাল সাড়ে ৬টার দিকে তিনি হাঁটতে বের হন। শহরের আকুরটাকুর বটতলা বাজার এলাকায় পৌঁছালে একদল সন্ত্রাসী তার ওপর হামলা করে। তাকে গুলি ও কুপিয়ে হত্যা করা হয়।

পরে পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে তার লাশ উদ্ধার করে। পরদিন তার ছোট ভাই লাভলু মিয়া টাঙ্গাইল সদর থানায় হত্যা মামলা করেন। পরে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ মামলাটির তদন্ত শুরু করে।

জবানবন্দিতে বাপ্পার নাম

তদন্ত চলাকালে ২০১৬ সালে এ ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে শাজাহান, সুজন ও সানোয়ার হোসেনকে পুলিশ গ্রেপ্তার করে। তারা হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দেন।

তাদের জবানবন্দির বরাতে তদন্তে উঠে আসে, সানিয়াত খান বাপ্পা ১০ লাখ টাকার বিনিময়ে তাদের দিয়ে এই হত্যাকাণ্ড করিয়েছেন।

এ অভিযোগপত্রে আগের আট আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়। পরে টাঙ্গাইলের প্রথম অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ আদালতে মামলাটির অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে বিচারিক কাজ শুরু হয়। সব স্বাক্ষ্য গ্রহণ শেষে বিচারক রায় ঘোষণা করেন।

রফিকুল ইসলাম ফারুক হত্যা মামলার বাদি তার ছোট ভাই লাভলু মিয়া বলেন, “খুনিরা টাঙ্গাইলের অসংখ্য মায়ের বুক খালি করেছেন। এদের নেতৃত্বে টাঙ্গাইলে শতশত অন্যায় হয়েছে। আজকের আগ পর্যন্ত তাদের বিচার হয়নি। আমরা এই রায়ের দ্রুত বাস্তবায়ন চাই।”

সম্পাদক : মোঃ খায়রুল ইসলাম, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : টাঙ্গাইল-ময়মনসিংহ রোড, দেউলাবাড়ী, ঘাটাইল, টাঙ্গাইল-১৯৮০। মোবাইল : +৮৮০১৭৬৪-২৬৬৪৭৫

প্রিন্ট করুন