বন্ড সুবিধার অপব্যবহার, দুই পোশাক কারখানার ১০২ কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকি

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশের সময়: সোমবার, ২ নভেম্বর, ২০২৬ । ৩:১৮ অপরাহ্ণ

রপ্তানিমুখী দুটি পোশাক কারখানার বিরুদ্ধে বন্ড সুবিধার অপব্যবহার করে শুল্কমুক্তভাবে আমদানি করা কাপড় খোলা বাজারে বিক্রি, কম মূল্যে রপ্তানি দেখানো এবং মূল্য সংযোজন কর (মূসক) ফাঁকির অভিযোগে ১০২ কোটি ৫৭ লাখ টাকার বেশি রাজস্ব ফাঁকি উদঘাটন করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স সেল (সিআইসি)।

অনুসন্ধানে রিয়াজ নিটওয়্যার লিমিটেডের ৯৪ কোটি ৭৩ লাখ ৮৭ হাজার ৭২০ টাকা এবং লিশা টেক্স (প্রা.) লিমিটেডের ৭ কোটি ৮৩ লাখ ২৫ হাজার ৪০৮ টাকার রাজস্ব ফাঁকির প্রমাণ পাওয়া গেছে। দুই প্রতিষ্ঠানের মোট রাজস্ব ফাঁকির পরিমাণ ১০২ কোটি ৫৭ লাখ ১৩ হাজার ১২৮ টাকা।

সোমবার (২ নভেম্বর) এনবিআরের সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স সেল (সিআইসি) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানিয়েছে।

সিআইসির অনুসন্ধানে দেখা গেছে, প্রতিষ্ঠান দুটি রপ্তানির শর্তে বন্ড সুবিধার আওতায় শুল্কমুক্তভাবে কাঁচামাল আমদানি করলেও এর একটি অংশ অবৈধভাবে কারখানা থেকে সরিয়ে খোলা বাজারে বিক্রি করেছে। পাশাপাশি আমদানি, উৎপাদন ও রপ্তানির হিসাবেও বিভিন্ন ধরনের অসংগতি পাওয়া গেছে।

রিয়াজ নিটওয়্যারের ৯৪ কোটি টাকার বেশি রাজস্ব ফাঁকি
সিআইসির অনুসন্ধানে সবচেয়ে বড় অনিয়মের প্রমাণ মিলেছে রিয়াজ নিটওয়্যার লিমিটেডের বিরুদ্ধে। প্রতিষ্ঠানটি ৪১টি ইউটিলাইজেশন ডিক্লারেশনের (ইউডি) আওতায় বন্ড সুবিধায় মোট ২ হাজার ৮৬২ টন ওভেন পলিয়েস্টার কাপড় আমদানি করে। তবে আমদানি করা কাপড়ের প্রায় ৭৮ শতাংশ, অর্থাৎ ২ হাজার ২৩৭ টন কারখানার গুদামে পাওয়া যায়নি। এমনকি এসব কাপড় রপ্তানির হিসাবেও অন্তর্ভুক্ত নেই।

সিআইসির ধারণা, বন্ডেড ওয়্যারহাউস থেকে এসব কাপড় অবৈধভাবে সরিয়ে খোলা বাজারে বিক্রি করা হয়েছে।

অনুসন্ধানে দেখা যায়, প্রতিষ্ঠানটির সুতা ও নিট কাপড়ের হিসাব রপ্তানির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হলেও ওভেন পলিয়েস্টার কাপড়ের ক্ষেত্রে বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে। যেসব ৩১টি ইউডির বিপরীতে কোনো রপ্তানি হয়নি, তার মধ্যে ৩০টিতেই আমদানি করা কাপড়ের পুরোটাই অবৈধভাবে অপসারণ করা হয়েছে। অন্যদিকে আংশিক রপ্তানির ১০টি এন্ট্রিতেও আমদানি করা কাপড়ের প্রায় ৫৩ শতাংশের হিসাব পাওয়া যায়নি।

সরেজমিন পরিদর্শনে পুরো কারখানা প্রাঙ্গণে মাত্র ২৫ হাজার ৫৩৩ দশমিক ৫০ কেজি ওভেন পলিয়েস্টার কাপড় পাওয়া যায়, যা মোট আমদানির মাত্র ০.৮৯ শতাংশ। এ ছাড়া ৬৯ হাজার ৩৮২ কেজি সুতা ও ৮ লাখ ৪৫ হাজার ৩৯৭ পিস তৈরি পোশাকের মজুদ পাওয়া যায়।

প্রতিষ্ঠানটির প্রতিনিধিরা লিখিত বক্তব্যে জানান, গত এক মাসে এ ধরনের কাপড় দিয়ে কোনো পোশাক উৎপাদন বা রপ্তানি করা হয়নি। তবে বিল অব এন্ট্রির তথ্য অনুযায়ী, শুধু সেপ্টেম্বর মাসেই সংশ্লিষ্ট ইউডিগুলোর আওতায় প্রায় ৩৯০ টন কাপড় আমদানি করা হয়েছে। এতে প্রতিষ্ঠানের বক্তব্যের সঙ্গে আমদানি-সংক্রান্ত তথ্যের অসংগতি ধরা পড়ে।

আরও দেখা যায়, ৪১টি ইউডির আওতায় আমদানি করা মোট কাপড়ের প্রায় ৮২ শতাংশই ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে অক্টোবরের শুরুর সময়ের মধ্যে আমদানি করা হয়েছে।

অবৈধভাবে অপসারিত কাপড়ের শুল্কায়নযোগ্য মূল্য ১৩৪ কোটি ২৯ লাখ টাকা। এর বিপরীতে প্রতিষ্ঠানটির ৯৪ কোটি ৭৩ লাখ ৮৭ হাজার ৭২০ টাকার শুল্ক-কর ফাঁকি উদঘাটন করেছে সিআইসি।

লিশা টেক্সের বিরুদ্ধে একাধিক অনিয়ম
অন্যদিকে লিশা টেক্স (প্রা.) লিমিটেডের বিরুদ্ধে বন্ড সুবিধায় আমদানি করা প্রায় ১ লাখ ৭৪ হাজার কেজি পলিয়েস্টার কাপড় অবৈধভাবে সরিয়ে খোলা বাজারে বিক্রির প্রমাণ পেয়েছে সিআইসি। শুধু এ খাতেই প্রতিষ্ঠানটি প্রায় ৬ কোটি ৯০ লাখ টাকার শুল্ক-কর ফাঁকি দিয়েছে।

এ ছাড়া প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে অনুমোদনের চেয়ে বেশি পোশাক রপ্তানি করলেও চুক্তিমূল্যের তুলনায় কম রপ্তানিমূল্য দেখানোর অভিযোগ পাওয়া গেছে।

অনুসন্ধানে আরও উঠে এসেছে, প্রতিষ্ঠানটি ইউডির বাইরে স্থানীয় ঋণপত্রের (এলসি) মাধ্যমে কাঁচামাল সংগ্রহ করেছে এবং বাধ্যতামূলক ২০ শতাংশ মূল্য সংযোজনের শর্ত পূরণ করেনি।

মূসক ফাঁকির ক্ষেত্রেও একাধিক অনিয়ম শনাক্ত হয়েছে। চার লাখের বেশি পিস পোশাকের আনুষঙ্গিক কাঁচামাল অনুমোদন ছাড়াই এবং মূসক পরিশোধ না করে স্থানীয় বাজার থেকে কেনা হয়েছে। পাশাপাশি লাইসেন্সবিহীন একটি প্রতিষ্ঠানের কাছে ৩ কোটি ২৩ লাখ টাকার কিট ব্যাগ সরবরাহের মাধ্যমে মূসক ফাঁকি দেওয়া হয়েছে।

এসব অনিয়মের মাধ্যমে লিশা টেক্সের মোট ৭ কোটি ৮৩ লাখ ২৫ হাজার ৪০৮ টাকার রাজস্ব ফাঁকি উদঘাটন করেছে সিআইসি।

সরেজমিন পরিদর্শন ও তথ্য যাচাইয়ে অনিয়ম শনাক্ত
দুই প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে সিআইসির পৃথক দল সরেজমিনে কারখানা পরিদর্শন করে কাঁচামালের মজুদ যাচাই করে। একই সঙ্গে আমদানি, উৎপাদন ও রপ্তানির তথ্য মিলিয়ে দেখা হয়।

রিয়াজ নিটওয়্যার লিমিটেডের ক্ষেত্রে ৫ অক্টোবর ২০২৬ তারিখের আদেশের ভিত্তিতে সরেজমিন পরিদর্শন করা হয়। ২ মার্চ ২০২৫ তারিখে সর্বশেষ নিরীক্ষার পর থেকে ব্যাক-টু-ব্যাক ঋণপত্র ও এফওসির মাধ্যমে আমদানি করা কাঁচামাল, কারখানার মজুদ এবং রপ্তানির তথ্য যাচাই করা হয়। এ সময় বন্ডেড ওয়্যারহাউস, নিটিং, কাটিং, সুইং ও ফিনিশিংসহ পুরো কারখানা প্রাঙ্গণের মজুদ পরীক্ষা করা হয়।

অন্যদিকে, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে লিশা টেক্সের ওয়্যারহাউস থেকে শুরু করে কাটিং, সুইং ও ফিনিশিং সেকশনের মজুদ যাচাই করে সিআইসির দল। এ ছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংক, অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ড, বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর তথ্যের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির আমদানি ও রপ্তানির হিসাব মিলিয়ে দেখা হয়।

সিআইসি জানিয়েছে, বন্ড সুবিধার অপব্যবহার করে রাজস্ব ফাঁকির ঘটনা প্রতিরোধে এ ধরনের অনুসন্ধান ও অভিযান অব্যাহত থাকবে।

সম্পাদক : মোঃ খায়রুল ইসলাম, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : টাঙ্গাইল-ময়মনসিংহ রোড, দেউলাবাড়ী, ঘাটাইল, টাঙ্গাইল-১৯৮০। মোবাইল : +৮৮০১৭৬৪-২৬৬৪৭৫

প্রিন্ট করুন