মধ্যবর্তী নির্বাচনে হেরে গেলে ট্রাম্পকে কি ক্ষমতা ছাড়তে হবে?

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশের সময়: সোমবার, ২ নভেম্বর, ২০২৬ । ৭:০৯ অপরাহ্ণ

আগামীকাল ৩ নভেম্বর অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন। চার বছরের প্রেসিডেন্ট মেয়াদের ঠিক মাঝপথে বা দুই বছরের মাথায় এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এই ভোট ঘিরে অনেকের মনেই প্রশ্ন, যদি নির্বাচনে বিরোধী ডেমোক্র্যাটরা জয়ী হন, তাহলে কি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই ক্ষমতা ছাড়তে হবে?

বিজ্ঞাপন

• মধ্যবর্তী নির্বাচন কী?
যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি দুই বছর পরপর কংগ্রেসের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ডোনাল্ড ট্রাম্প চার বছরের জন্য প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন, আর এই চার বছর মেয়াদের মাঝামাঝি সময়ে ভোট হয় বলেই একে বলা হয় ‘মিডটার্ম’ বা মধ্যবর্তী নির্বাচন।

মার্কিন আইনসভা বা কংগ্রেস দুটি কক্ষে বিভক্ত—উচ্চকক্ষ সিনেট এবং নিম্নকক্ষ হাউজ অব রিপ্রেজেন্টেটিভস (প্রতিনিধি পরিষদ)। মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রতিনিধি পরিষদের ৪৩৫টি আসনের সবকটি এবং সিনেটের ১০০টি আসনের মধ্যে ৩৫টি আসনে ভোট গ্রহণ হবে।

বিজ্ঞাপন

সিনেটররা ছয় বছরের জন্য দায়িত্ব পালন করেন। একই দিনে ক্যালিফোর্নিয়া, ফ্লোরিডা, জর্জিয়া ও মিশিগানের মতো গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গরাজ্যগুলোর গভর্নরও বেছে নেবেন ভোটাররা।

• কে জিততে পারে?
বর্তমানে কংগ্রেসের উভয় কক্ষেই সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের দল রিপাবলিকানদের।

বিজ্ঞাপন

তবে সাম্প্রতিক জরিপগুলোতে প্রেসিডেন্টের জনসমর্থন নিম্নমুখী। জরিপভিত্তিক ওয়েবসাইট ‘সিলভার বুলেটিন’-এর তথ্য অনুযায়ী, ট্রাম্প ৫০ শতাংশের কিছু বেশি জনসমর্থন নিয়ে প্রেসিডেন্ট হিসেবে তার দ্বিতীয় মেয়াদ শুরু করেছিলেন। কিন্তু অক্টোবরের শুরুতে তা কমে প্রায় ৩৭ শতাংশে নেমে এসেছে; বিপরীতে ৬১ শতাংশ মানুষ তার প্রতি অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন।

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে ট্রাম্প যখন ইসরায়েলকে সঙ্গে নিয়ে ইরানে সামরিক হামলার সিদ্ধান্ত নেন, তখন তার জনপ্রিয়তার রেটিং ছিল ৪২ শতাংশের ঘরে। তবে হামলার পরপরই তা ৪০ শতাংশের নিচে নেমে যায় এবং বর্তমানে তা ৩৭ শতাংশে ঠেকেছে।

আট বছর আগে, ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদের ঠিক এই সময়ে তার গ্রহণযোগ্যতার রেটিং ছিল ৪৩ শতাংশ। অন্যদিকে জো বাইডেনের মেয়াদের একই সময়ে তা ছিল ৪০ শতাংশ। অবশ্য দুটি ক্ষেত্রেই তৎকালীন প্রেসিডেন্টরা মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ হারালেও সিনেটের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পেরেছিলেন।

ট্রাম্পের এই নিম্নমুখী রেটিংই ডেমোক্র্যাটদের উভয় কক্ষ জয়ের স্বপ্ন দেখাচ্ছে। ফলে তারা এমন সব অঙ্গরাজ্যে নজর দিচ্ছে, যেগুলো বিগত বছরগুলোতে রিপাবলিকানদের দুর্গ হিসেবে পরিচিত ছিল। অতীতে মার্কিন ভোটাররা মধ্যবর্তী নির্বাচনে ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টের দলকে ‘শাস্তি’ দেওয়ার এবং তাদের বিরুদ্ধে ভোট দেওয়ার প্রবণতা দেখিয়েছেন।

• ভোটারদের প্রধান উদ্বেগ ও ২০২৮ সালের সমীকরণ
বিবিসি প্রতিবেদনে বলা হয়, এবারের মধ্যবর্তী নির্বাচনে মার্কিন ভোটারদের বড় অংশ চিন্তিত দেশটির অর্থনীতি নিয়ে। মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি ও নিত্যপণ্যের ঊর্ধ্বগতিই ভোটারের প্রধান দুশ্চিন্তার বিষয়। রিপাবলিকানরা যেখানে অবৈধ অভিবাসনবিরোধী কড়াকড়িকে সফলতা দাবি করছে, সেখানে ডেমোক্র্যাটরা অভিযোগ তুলছে, ট্রাম্পের শুল্ক নীতির কারণেই জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে।

সম্প্রতি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) নিয়েও উদ্বেগ তীব্র হয়েছে। উভয় দলের শীর্ষ রাজনীতিবিদরা এটিকে নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজনীয়তার বিষয়ে একমত হয়েছেন। এর মাধ্যমে তারা ট্রাম্পের বিরোধিতা করছেন।

যদিও ব্যালট পেপারে ট্রাম্পের নিজের নাম থাকছে না, তবুও তিনি সমর্থক ও ভোটারদের প্রতি তার এযাবৎকালের কর্মকাণ্ডের ওপর ভিত্তি করেই ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

প্রেসিডেন্ট ও বিচার বিভাগের পাশাপাশি কংগ্রেস হলো সরকারের তিনটি শাখার মধ্যে অন্যতম। আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে এর নিয়ন্ত্রণ গুরুত্বপূর্ণ।

প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট উভয়ই বর্তমানে রিপাবলিকান পার্টির দখলে রয়েছে। কিন্তু তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা খুবই সামান্য। প্রতিনিধি পরিষদে তাদের ২১৮টি আসন রয়েছে, যা এটিকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য প্রয়োজনীয় ন্যূনতম সংখ্যা, এবং এর সঙ্গে আছেন একজন স্বতন্ত্র সদস্য যিনি তাদের পক্ষে ভোট দেন।

অপরদিকে সিনেটে তাদের ৫৩টি আসন রয়েছে।

উচ্চকক্ষের নিয়ন্ত্রণ তখনই হাতবদল হবে যদি ডেমোক্র্যাটরা ৫১টি আসন জয় করতে পারে; কারণ উভয় পক্ষ ৫০টি করে আসন পেলে ভাইস প্রেসিডেন্টের (যিনি বর্তমানে একজন রিপাবলিকান) দেওয়া নির্ণায়ক ভোটটি তখন আর কোনো প্রভাব ফেলতে পারবে না।

যদি বিরোধী ডেমোক্র্যাটরা অন্তত একটি কক্ষের নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধার করে, তবে তারা সংসদে নিজেদের আইন উত্থাপন করার ক্ষমতা পাবে।

যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান অনুযায়ী ট্রাম্প আর তৃতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্ট পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবেন না। ফলে এই মধ্যবর্তী নির্বাচনের পরই আন্তর্জাতিক রাজনীতির নজর চলে যাবে ২০২৮ সালের পরবর্তী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের দিকে যেখানে নির্ধারণ হবে রিপাবলিকান পার্টিতে ট্রাম্পের উত্তরসূরি কে হচ্ছেন এবং ডেমোক্র্যাটদের দল থেকেই বা কে প্রার্থী হচ্ছেন।

• নির্বাচনে হেরে গেলে ট্রাম্পকে কি ক্ষমতা ছাড়তে হবে?
সহজ উত্তর হলো—না, ট্রাম্পকে ক্ষমতা ছাড়তে হবে না। মার্কিন সংবিধানে প্রেসিডেন্টের চার বছরের মেয়াদ নির্দিষ্ট করা থাকে। ফলে মধ্যবর্তী নির্বাচনে নিজের দলের পরাজয় হলেও প্রেসিডেন্টকে পদত্যাগ করতে হয় না। তবে এই নির্বাচনের ফলাফল ট্রাম্পের মেয়াদের বাকি সময়টুকু কতটা মসৃণ হবে নাকি বাধার মুখে পড়বে, তা শতভাগ নির্ধারণ করে দেবে।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়, ডেমোক্র্যাটরা যদি প্রতিনিধি পরিষদ বা সিনেট যেকোনো একটিতেও জয়লাভ করে, তবে ট্রাম্পের পক্ষে কংগ্রেসে নতুন কোনো আইন পাস করানো কঠিন হয়ে পড়বে। ফলে তার অভ্যন্তরীণ নীতিগুলো আটকে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

তা ছাড়া, যেকোনো একটি কক্ষের ওপর ডেমোক্র্যাটদের নিয়ন্ত্রণ থাকলে তারা কমিটি গঠন করে ট্রাম্পের ক্ষমতা প্রয়োগের বিভিন্ন দিক নিয়ে তদন্ত করতে পারবে। হোয়াইট হাউজের নতুন বলরুম নির্মাণ, দুর্নীতির অভিযোগ এবং ‘আইস’ (ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট)-এর বিতর্কিত কার্যকলাপ তদন্তের আওতায় আসতে পারে।

ডেমোক্র্যাটিক পার্টির মধ্যেও ট্রাম্পকে অভিশংসন করা হবে কি না, তা নিয়ে বিতর্ক চলছে। অভিশংসনের অর্থ হলো কংগ্রেসে এমন অভিযোগ আনা, যা একটি রাজনৈতিক বিচারের ভিত্তি তৈরি করবে, ফৌজদারি বিচারের নয়।

অন্যদিকে, রিপাবলিকান পার্টি যদি কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারে, তবে ট্রাম্প তার মেয়াদের বাকি সময়টুকু নিজের এজেন্ডাগুলো বাস্তবায়নে পুরোপুরি সফল হতে পারবেন।

সূত্র: বিবিসি, ইউএসভোট ফাউন্ডেশন

সম্পাদক : মোঃ খায়রুল ইসলাম, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : টাঙ্গাইল-ময়মনসিংহ রোড, দেউলাবাড়ী, ঘাটাইল, টাঙ্গাইল-১৯৮০। মোবাইল : +৮৮০১৭৬৪-২৬৬৪৭৫

প্রিন্ট করুন