টাঙ্গাইল: আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে জমে উঠেছে টাঙ্গাইলের বৃহৎ নির্বাচনী আসন টাঙ্গাইল-৩ (ঘাটাইল) আসনের নির্বাচনী প্রচারণা। এই নির্বাচনে মনোনয়ন বঞ্চিত বিএনপির ৪ বারের সাবেক সংসদ সদস্য লুৎফর রহমান খান আজাদ স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ায় নির্বাচন ভিন্ন মাত্রা পেয়েছে। তবে মন্ত্রী থাকাকালীন এসডিএস (সোশ্যাল ডেডেলপমেন্ট সংসদ) নামক এনজিওর বিপুল পরিমান জমি আত্মসাতের অভিযোগ সামনে আসায় ভূক্তভোগীদের মিছিল ও প্রতিবাদে বেকায়দায় পড়েছেন বিএনপির বহিষ্কৃত এই নেতা। অন্যদিকে ধানের শীষ প্রতীক পেয়েও আওয়ামী লীগ ও জামায়াতের প্রার্থী বিহীন এ আসনে নিশ্চিত জয়ের সম্ভাবনার মাঝে স্বতন্ত্র প্রার্থী পথের কাঁটা হয়ে ঘাম ঝরাচ্ছে বিএনপির প্রার্থী ছাত্রদলের কেন্দ্রীয কমিটির সাবেক ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক এস এম ওবায়দুল হক নাসিরের।
বিএনপি ও স্বতন্ত্র এ দুই প্রার্থীর বাইরেও এই আসনে প্রতিন্দ্বন্দ্বিতা করছেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী মাওলানা রেজাউল করিম, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ও ১১ দলীয় জোট প্রার্থী সাইফুল্লাহ হায়দার এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী আইনিন নাহার নিপা। প্রত্যেক প্রার্থীই নানান প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভোটারদের মন জয়ের চেষ্টা করছেন।
১৯ পদাতিক ডিভিশন ক্যান্টনমেন্টের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এই আসনের মোট ভোটার ৩ লাখ ৮২ হাজারের অধিক। ১৪টি ইউনিয়ন, ১টি পৌরসভার সমন্বয়ে গঠিত ঘাটাইল আসনে ২০২৪ সালে এ আসনে এমপি হয়েছিলেন আওয়ামী লীগের সাবেক নেতা আমানুর রহমান খান রানা।
২০১৮ সালে এমপি হয়েছিলেন তারই চাচাতো ভাই আতাউর রহমান খান। ২০১৪ সালের ভোটারবিহীন নির্বাচনে বিজয়ী হয়েছিলেন আওয়ামী লীগের প্রার্থী আমানুর রহমান খান রানা। ২০০৮ সালের নির্বাচনে বিজয়ী হয়েছিলেন আওয়ামী লীগের প্রার্থী ডা. মতিউর রহমান।
এসডিএস ও আওয়ামী লীগ ভোটের সমীকরণ
ঘাটাইল শহর ও বিভিন্ন ইউনিয়নে ঘুরে দেখা গেছে, আওয়ামী লীগ নির্বাচনে না থেকেও ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে জয়-পরাজয়ের নিয়ামক এখন আওয়ামী লীগ সমর্থিত ভোটাররা।
বিএনপি সমর্থিত ধানের শীষের প্রার্থী ওবায়দুল হক নাসির ও স্বতন্ত্র প্রার্থী বিএনপি চেয়ারম্যানের বহিষ্কৃত উপদেষ্টা লুৎফর রহমান খান আজাদের মধ্যেই মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে। ঘাটাইল উপজেলা বিএনপি, অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠন ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী ওবায়দুল হক নাসিরের সাথে থাকলেও দলটির বিগত কমিটির একাংশ স্বতন্ত্র প্রার্থী লুৎফর রহমান আজাদকে সমর্থন দিয়েছেন। বিএনপির বিদ্রোহী অংশের সাথে আওয়ামী লীগের সাবেক এমপি আমানুর রহমান খান রানার সমর্থকরা এক হয়ে ধানের শীষকে হারাতে কাজ করছে বলে অভিযোগ রয়েছে। আমানুর রহমান খান রানা ও লুৎফর রহমান খান আজাদ সম্পর্কে চাচা ও ভাতিজা। এছাড়া ধানের শীষকে হারাতে নিজেদের প্রার্থী না থাকায় জামায়াতে ইসলামীর নেতা-কর্মীরাও এনসিপির জন্য মাঠে দৃশ্যমান থাকলেও গোপনে স্বতন্ত্র প্রার্থী লুৎফর রহমান আজাদের পক্ষে কাজ করছে।
এদিকে বিএনপির বিদ্রোহী অংশ এবং আওয়ামী লীগের খান পরিবারের সমর্থনের মধ্যেও আজাদের এসডিএস (সোশ্যাল ডেভেলাপমেন্ট সংসদ) কেলেঙ্কারি সামনে আসায় ভোটের বৈতরণী পার হতে তাকে বেগ পেতে হচ্ছে। ঘাটাইলের পূর্বদিকে পাহাড়ী অঞ্চলের ভুক্তভোগীরা মিছিল ও প্রতিবাদ তার প্রচারণাকেও ম্লান করে দিচ্ছে।
একাধিক ভুক্তভোগীর অভিযোগ, ২০০১ সাল থেকে লুৎফর রহমান খান আজাদ বিএনপি সরকারের প্রতিমন্ত্রী ছিলেন। ২০০২ সালে এসডিএস এর এমপি ইসমাইল হোসেন সিরাজী প্রতারণার অভিযোগ গ্রেফতার হোন। এসময় প্রতিমন্ত্রী আজাদ প্রভাব বিস্তার করে এসডিএসের গ্রাহকদের সঞ্চয়ের টাকা ফেরত দেওয়ার নাম করে প্রতিষ্ঠানটির সম্পত্তি নিজের নামে লিখে নিয়েছেন। যার কারণে ২০০৮ সালের নির্বাচনে মানুষ তাকে ধানের শীষে ভোট না দিয়ে আওয়ামী লীগের প্রার্থী ডা. মতিউর রহমানকে বিজয়ী করেন। কিছুদিনের মধ্যে ডা. মতিউর রহমান মৃত্যুবরণ করলে ঘাটাইলের এমপি নির্বাচিত হোন আজাদের ভাতিজা আমানুর রহমান খান রানা। ২০১৪ সালে এমপি নির্বাচিত হোন আজাদের আপন চাচাতো ভাই আতাউর রহমান খান।
ভূক্তভুগীরা জানান, একই পরিবার বিএনপি-আওয়ামী লীগে থাকায় সেসময় তারা অভিযোগ করেও প্রতিকার পাননি। ৫ আগস্ট পট পরিবর্তনের পর এখন লুৎফর রহমান আজাদের কাছ থেকে সেই টাকা তারা ফেরত চাচ্ছেন।
গারো বাজারের বাসিন্দা মো. ইউনূস আলী বলেন, বিএনপির সময় আমাদের টাকা ফেরত দেওয়ার কথা বলে এসডিএসের সম্পত্তি নিজের নামে লিখে নিয়েছিলেন আজাদ। বিগত ১৭ বছর উনার ভাতিজাদের দখলে ছিল সেই সম্পত্তি। সেগুলো বিক্রি করে আমাদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার কথা থাকলেও তা দেওয়া হয়নি। এবার ভোটের আগে আমাদের ক্ষতিপূরণের টাকা চাই।
একইভাবে গারোবাজারের বাসিন্দা সাইফুল ইসলাম অভিযোগ করেন, লক্ষীন্দর ইউনিয়ন ২ নং ওয়ার্ডের সলিং বাজারের বিপুল পরিমান এসডিএসের সম্পত্তি নিজের নামে লিখে নিয়েছেন আজাদ। এগুলো প্রতারিত গ্রাহকদের সম্পত্তি। আমাদের গাছ, আদা-রসুন বিক্রির কষ্টের টাকা আজাদ সাহেব নিজের নামে লিখে নিয়েছেন। আমরা আমাদের টাকা ফেরত চাই।
ভোটারদের ভাবনা
ঘাটাইল পৌরসভা, দেউলাবাড়ী ইউনিয়ন, সাগরদিঘী, রসূলপুর, লক্ষীন্দর, দেওপাড়া, দিগড়সহ বিভিন্ন ইউনিয়ন ও এলাকার মানুষদের সাথে কথা বলে এ প্রতিবেদক। বেশিরভাগ ভোটারের অভিযোগ, টাঙ্গাইলের গূরুত্বপূর্ণ বৃহৎ এই নির্বাচনী এলাকায় রয়েছে বৃহত্তর ময়মনসিংহের সবচেয়ে বড় ক্যান্টনমেন্ট। রয়েছে দেশ সেরা ক্যান্টনমেন্ট স্কুল ও কলেজ। কিন্তু উন্নয়নের দিক থেকে উপজেলাটি অনেক পিছিয়ে। বিগত আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারের সময় স্বতন্ত্র কিংবা বিএনপির সমর্থিত এমপি থাকায় এলাকাটির কাঙ্খিত উন্নয়ন হয়নি। সবচেয়ে বেশি অবহেলিত ঘাটাইলের পূর্বদিকে ময়মনসিংহ সংলগ্ন পাহাড়ী এলাকা।
ধলাপাড়া বাজারের চায়ের দোকানে আড্ডা দেওয়া কৃষক আব্দুল খালেক মিয়া বলেন, এবার তো ভোটের একটা পরিবেশ বোঝা যাইতেছে। এর আগে কোন দিক দিয়া ভোট গেছে, ঐটাই বুঝি নাই। এবার যারা পাহাড়ের উন্নয়ন করবো, তাদেরই ভোট দিমু। চোর, মানুষের জমি দখল করে, গরীব মানুষের টাকা যারা মাইরা খায় তাদের ভোট দিমু না।
সাগরগিঘী এলাকার বাসিন্দা তরুণ ভোটার মনিরুজ্জামান রুবেল বলেন, ৫ আগস্ট মানুষ পরিবর্তনের জন্য বিপ্লব করেছে। সারাদেশের মানুষ শিক্ষিত, মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রতি শ্রদ্ধাশীল, আধুনিক ও কর্মমুখী একটি সরকার দেখতে চাচ্ছে। আমরা চাই যারা ক্ষমতায় এসে দেশের মানুষের কল্যাণ ও শক্তিশালী গণতন্ত্রের জন্য কাজ করবে তাদের প্রার্থীকেই ভোট দিবো।
ঘাটাইল পৌরসভার বাসিন্দা মতিউর রহমান বলেন, দীর্ঘদিন হলো ঘাটাইল পৌরসভা হয়েছে কিন্তু এলাকার কোনো উন্নয়ন নেই। এবার এখন পর্যন্ত কোনো প্রার্থী ইশতেহারে পৌরসভার উন্নয়নের জন্য বিশেষভাবে কিছু করবে তা বলেনি। দেখি, এই কয়দিনে যদি কেউ কিছু বলে তাহলে তাকেই ভোট দিবো।
ঘাটাইলের বাসিন্দা ফারুক আহমেদ বলেন, এবার বোঝাই যাচ্ছে কারা ক্ষমতায় যাবে। যারা ক্ষমতায় গিয়ে এলাকার উন্নয়ন করবে, আমরা তাদেরই ভোট দেব।
হামিদপুরের বাসিন্দা সাকিব জানান, ৫ আগস্টের পর থেকে মানুষ পরিবর্তন চায়। এই পরিবর্তন যারা করতে পারবে, দেড় বছরে যারা মানুষকে আশা দিয়েছেন তাদেরকেই আমরা ভোট দেব।
এজে

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশের সময়: বুধবার, ৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ । ১০:৩৯ অপরাহ্ণ