ক্রোধের ছুরিতে নিশ্চিহ্ন পরিবার; চুন খসলেই খুন

সাইফুল ইসলাম
প্রকাশের সময়: রবিবার, ১০ মে, ২০২৬ । ১১:০৬ পূর্বাহ্ণ

শনিবারের দিনটাই শুরু হলো এক অশনিসংকেতে। গাজীপুরের কাপাসিয়ায় এক বাড়িতে পাওয়া গেলে পাঁচ স্বজনের গলাকাটা মরদেহ। স্বজন, পুলিশ ও স্থানীয়দের ভাষ্য, গৃহকর্তা ফোরকান মিয়া ওই ঘটনা ঘটিয়ে হয়েছেন লাপাত্তা। নৃশংস এমন ঘটনার নেপথ্যে কী কারণ, তা নিয়ে এখনো ধোঁয়াশায় সবাই। অবশ্য, মরদেহের পাশে পাওয়া বেশ কিছু আলামতের ভিত্তিতে কেউ কেউ বলছেন, ভয়ংকর ঘটনাটির নেপথ্যে থাকতে পারে অর্থ কিংবা বিয়েবহির্ভূত সম্পর্কের রেশ।

তবে অর্থের হিসাবের গরমিল কিংবা ‘অবাধ্য হওয়ার’ কারণে স্ত্রীর সঙ্গে নিজের সন্তানদের হত্যার ঘটনাকে বিশেষজ্ঞরা দেখছে সামাজিক অস্থিরতার অভিঘাত হিসেবে। সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনার উদাহরণ তুলে ধরে তাদের দাবি, এগুলো শুধু বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা নয়; বরং ভয়ংকর এক সামাজিক অশনিসংকেত। কান্না করায় বাবা হত্যা করছেন কোলের শিশুকে, বাবা কিংবা মা বিয়েবহির্ভূত সম্পর্কে জড়িয়ে খুন করছেন সন্তানদের। কখনো কখনো বাবা-মাও শিকার হচ্ছেন প্রিয় সন্তানের। প্রতিবেশীকে ফাঁসাতে সন্তানকে হত্যার পর টুকরো টুকরো করা হচ্ছে মরদেহ।

সমাজবিজ্ঞানী ও অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, শুধু গাজীপুরের এ ঘটনাই নয়, বেশ কিছু দিন ধরে খুন-হত্যা যেন দুধভাত হয়ে উঠেছে। পান থেকে চুন খসলেই হচ্ছে খুন।

তাদের এমন কথার সমর্থন করে গত কয়েক মাসের কয়েকটি ঘটনা। গত ২০ এপ্রিল নওগাঁর নিয়ামতপুরে একই পরিবারের চারজনকে হত্যা করা হয় গলা কেটে। ওই ঘটনার পর পুলিশ জানিয়েছিল, সম্পত্তি বণ্টনের জটিলতা থেকেই ঘটেছিল ওই চার হত্যার ঘটনা।

বছরের শুরুতেই আরেকটি ভয়াবহ হত্যাকাণ্ড স্তব্ধ করে দেয় দেশকে। কুমিল্লার হোমনা উপজেলার মনিপুর গ্রামে একই পরিবারের তিনজনকে গলা কেটে হত্যা করা হয়। তবে ওই হত্যাকাণ্ডের কারণ এখনো অজানা।

পুলিশ সদর দপ্তরের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, চলতি বছরের গত চার মাসে খুনের ঘটনায় মামলা হয়েছে ১ হাজার ১৪২টি। ২০২৫ সালে সারা দেশে খুন ও নৃশংস হত্যার ঘটনায় মামলা হয়েছে ৩ হাজার ৭৮৬টি, যা ২০২৪ সালে ছিল ৩ হাজার ৪৪২টি ও ২০২৩ সালে হত্যাকাণ্ডের মামলা হয়েছিল ৩ হাজার ২৩টি। চলতি বছরের গত চার মাসের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, প্রতি মাসে দেশে ২৬৫টি হত্যার ঘটনা ঘটছে। সবচেয়ে বেশি খুনের ঘটনা ঘটে ঢাকা রেঞ্জে। গত এপ্রিল মাসে সারা দেশে খুনের ঘটনা ঘটছে ২৮৮টি, মার্চে ৩১৭, ফেব্রুয়ারিতে ২৫০ ও জানুয়ারিতে ২৮৭টি। ঢাকা মহানগরী এলাকায় গত চার মাসে ৭৮টি হত্যাকাণ্ড ঘটে। এর মধ্যে জানুয়ারিতে ২১টি, ফেব্রুয়ারিতে ১৬টি, মার্চে ২৪টি এবং এপ্রিলে ১৭টি খুনের ঘটনায় মামলা হয়েছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, চলতি বছরের চার মাসে খুনের ঘটনায় মামলা হয়েছে ১ হাজার ১৪২টি। এ পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, প্রতি মাসে দেশে ২৬৫টি হত্যার ঘটনা ঘটছে। সবচেয়ে বেশি খুনের ঘটনা ঘটে ঢাকা রেঞ্জে।

গত এপ্রিলে সারা দেশে খুনের ঘটনা ঘটছে ২৮৮টি, মার্চে ৩১৭, ফেব্রুয়ারিতে ২৫০ ও জানুয়ারিতে ২৮৭টি। ঢাকা মহানগরী এলাকায় গত চার মাসে ৭৮টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে জানুয়ারিতে ২১টি, ফেব্রুয়ারিতে ১৬, মার্চে ২৪ এবং এপ্রিলে ১৭টি খুনের ঘটনায় মামলা হয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এবং সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হকের ভাষ্য, পারিবারিক অশান্তি, পারষ্পরিক অবিশ্বাস এবং নৈতিক অবক্ষয়ের কারণে সামাজিক কাঠামো ভেঙে পড়ছে। ছোটখাটো পারিবারিক ও সামাজিক সহিংসতা সমাজে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি করছে। মনোমালিন্য কেন্দ্র করে পরিবারে একাধিক পক্ষ তৈরি হয়ে যাচ্ছে। এতে করে মানুষের মনে জন্ম নিচ্ছে জিঘাংসা।

তৌহিদুল হক মনে করছেন, পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে নৈতিক শিক্ষার অভাব, ঘটনা ঘটলে দৃশ্যমান বিচারের ঘাটতি ও পারিবারিক শিক্ষা না পাওয়ার প্রতিফলন সমাজে ঘটছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মুহাম্মদ মাহবুব কায়সার মনে করেন, সমাজ-সংস্কৃতির দ্রুত পরিবর্তনের সঙ্গে মানুষের মানসিক প্রস্তুতির এক ধরনের অসামঞ্জস্য তৈরি হয়েছে। তার ভাষায়, প্রযুক্তিগত উন্নয়নের কারণে মানুষ এখন বহির্বিশ্বের সমাজব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে, কিন্তু সেই বাস্তবতার জন্য প্রয়োজনীয় মানসিক ও সামাজিক প্রস্তুতি আমাদের নেই। সমাজবিজ্ঞানের ভাষায় এটিই ‘কালচারাল ল্যাক’।

‘গ্লোবালাইজেশনের প্রভাবে আমাদের সামাজিক মূল্যবোধ ও পারিবারিক বন্ধন ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছে। ফলে সম্পর্কের ভেতরে জমে থাকা রাগ, হতাশা, হীনম্মন্যতা কিংবা দ্বন্দ্ব অনেক সময় ভয়ংকর সহিংসতায় রূপ নিচ্ছে’— যোগ করেন তিনি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এমন পরিস্থিতি মোকাবিলায় শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন পরিবারে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সচেতনতা, সামাজিক বন্ধন শক্তিশালী করা এবং মানবিক মূল্যবোধের পুনর্গঠন। কারণ, একটি পরিবার ধ্বংস হওয়া মানে শুধু কয়েকটি প্রাণ হারানো নয়, একটি সমাজের ভেতর থেকে ধীরে ধীরে মানবিকতার আলো নিভে যাওয়া।

এমন অপরাধীদের মানসিক স্বাস্থ্যর পরীক্ষা-নিরীক্ষা না করে মানসিক অসুস্থ বলা যাবে না। কারণ, মানসিক অসুস্থ উল্লেখ করা হলেই অপরাধীর সাজা কমে যাবে বলে জানান মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. হেলাল উদ্দিন আহমেদ। তিনি আগামীর সময়কে বললেন, এ ধরনের ঘটনা দুই ধাপে হয়ে থাকে। একটি হলো পরিকল্পিতভাবে, আরেকটি হঠাৎ রাগ-ক্ষোভ থেকে। তবে একজন মানুষ এমনিতেই ভয়ংকর ব্যক্তিত্ব হয়ে ওঠে না। যখন অনেক ক্ষোভ একসঙ্গে যুক্ত হয়, তখনই এমন বিভীষিকাময় ঘটনা ঘটায়। এর পেছনে স্কুল, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের দায় রয়েছে। সর্বোপরি শিশুর শৈশব থেকে শুরু করে তার পরিণত বয়সে ব্যক্তিত্ব বিকাশের জায়গায় যদি কোনো অসামঞ্জ্য তৈরি হয়, তখনই মানুষের ভেতরে এ ধরনের হিস্রতা, বীভৎসতা তৈরি হতে পারে।

এ ধরনের ঘটনায় দ্রুত মামলা নেওয়া, সঠিক তদন্ত করা এবং দোষীদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া অতিগুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) নূর মোহাম্মদ। তার মতে, এমন ঘটনায় দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হলে অপরাধীরা কিছুটা হলেও ভয় পাবে।

সম্পাদক : মোঃ খায়রুল ইসলাম, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : টাঙ্গাইল-ময়মনসিংহ রোড, দেউলাবাড়ী, ঘাটাইল, টাঙ্গাইল-১৯৮০। মোবাইল : +৮৮০১৭৬৪-২৬৬৪৭৫

প্রিন্ট করুন