নির্বাচন বানচাল এবং সার্বভৌমত্ব বিরোধী সুগভীর ষড়যন্ত্র!

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশিত: শুক্রবার, ৩১ অক্টোবর, ২০২৫, ৯:০৭ অপরাহ্ণ
নির্বাচন বানচাল এবং সার্বভৌমত্ব বিরোধী সুগভীর ষড়যন্ত্র!

দেশে দীর্ঘকাল ধরেই মানুষ ভোট দিতে পারেনি। ৫ আগস্ট, ২০২৪ শেখ হাসিনা ও তার ফ্যাসিস্ট সরকার পতনের পর থেকে দেশের মানুষ ভোটের আকাঙ্খা পূরণের অধীর আগ্রহে রয়েছে। ড. মুহাম্মদ ইউনূস ভোট নিয়ে টালবাহানা করে আসছিলেন। নানামুখী চাপে অবশেষে সরকার নির্বাচনের দিকে যেতে বাধ্য হয়েছে। কিন্তু নির্বাচন ও গণতন্ত্র বানচালের ষড়যন্ত্র থামেনি। একের পর এক ষড়যন্ত্র চলছে। সরকারের অংশীদার দুটি রাজনৈতিক দল- জামায়াত এবং নবগঠিত এনসিপি ছাড়াও এই ষড়যন্ত্রে সরাসরি জড়িত রয়েছেন অন্তর্বর্তী সরকারের বেশ কয়েকজন উপদেষ্টা। একাধিক বিদেশি শক্তি, বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও এই ষড়যন্ত্রে ইন্দন যোগাচ্ছে। এমনকি তলে তলে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসেরও এতে নেপথ্য ভূমিকা রয়েছে। জামায়াত-এনসিপির নির্বাচনবিরোধী তৎপরতা, জুলাই সনদে ঐকমত্য কমিশনের জাল-জালিয়াতি, জাতীয় নির্বাচনের আগে গণভোট ইস্যু তৈরি প্রভৃতি এসব ষড়যন্ত্রেরই অংশ, বলছে কূটনৈতিক সূত্রগুলো।

দেশ চলবে মানুষের আশা-আকাঙ্খা অনুযায়ী নয়, স্বৈরতান্ত্রিক কায়দায়। ভোটের আয়োজন করা হবে না। গণতন্ত্রের পরিবর্তে ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অনির্বাচিত সরকার দেশ চালাবে- এটা ছিল শুরুতে তাদের লক্ষ্য। বিএনপি গণতন্ত্র চায়- এ কারণে সরকারের শুরুতে বিএনপিকে মাইনাস করে জামায়াতকে কাছে টেনে নেন ড. ইউনূস। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পরামর্শেই তিনি এই সর্বনাশা পথে গেছেন। পরিস্থিতির চাপে পড়ে দৃশ্যমানভাবে জাতীয় নির্বাচনের প্রক্রিয়ায় যেতে বাধ্য হলেও আদতে আগের অবস্থান ছাড়তে পারেননি। নিজের ক্ষমতায় টিকে থাকার লোভ তো রয়েছেই ড. ইউনূসের, তাছাড়া মার্কিন স্বার্থ এখানে বহুলভাবে জড়িত।

এশিয়ার এ অঞ্চল নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা রয়েছে অনেক আগে থেকে। শীর্ষ নিউজ ডটকম এবং সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজে ইতিপূর্বে একাধিক প্রতিবেদনে এ সম্পর্কে বিস্তারিতভাবে আলোকপাত করা হয়েছে। এ অঞ্চলকে অস্থিতিশীল করা এবং এর মাধ্যমে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করাই দেশটির লক্ষ্য। যুক্তরাষ্ট্রের ‘বার্মা অ্যাক্ট’-এ শুধুমাত্র বার্মা নামক রাষ্ট্রটির কথা উল্লেখ করা হলেও আনঅফিসিয়ালি এই অ্যাক্ট-এর অধীনে রয়েছে বাংলাদেশ এবং ভারতও। অনেক আগে থেকেই যুক্তরাষ্ট্র তাদের এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের চেষ্টা করে আসছিল। ২০০১-০৬ সময়ের বিএনপি সরকারের কাছে সেন্ট মার্টিন চেয়েছে দেশটি। বিএনপি দেয়নি, তাই ওয়ান ইলেভেনের আবির্ভাব ঘটানো হয়েছে। শেখ হাসিনাকে দীর্ঘকাল ক্ষমতায় টিকিয়ে রেখেছে ভারত, এটা দৃশ্যমান। কিন্তু বাস্তবে এর মূল নেপথ্য নায়ক হলো যুক্তরাষ্ট্র। ২০১৪ এবং ২০১৮ দুটো টার্ম পার করেছে শেখ হাসিনা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমঝোতা করেই।

সর্বশেষ, ‘অকাস’ এবং ‘জিসোমিয়া’ নামে দুটো সামরিক চুক্তির খসড়া বিনিময় হয়েছে ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে শেখ হাসিনার সঙ্গে ওয়ান টু ওয়ান বৈঠকে। চুক্তি দুটোর খসড়ায় সংশোধনী মার্চ, ২০২৩ মাসে এবং এর পরের মাসে চূড়ান্ত চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার কথা পাকাপোক্ত ছিল। কিন্তু ভারতের বাধায় তা হয়ে উঠেনি।

এটা অনেকেরই জানা কথা, ৫ আগস্ট, ২০২৪ এর পরে ড. মুহাম্মদ ইউনূস ক্ষমতার চেয়ারে বসেছেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনে। মার্কিন এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্যই তাকে চেয়ারে বসানো হয়েছে। নেপথ্য পরিকল্পনা ছিল, ড. ইউনূসকে পরবর্তীতে রাষ্ট্রপতি করা হবে। অন্য আরেক বিশেষ ব্যক্তির নেতৃত্বে নতুন সরকার গঠিত হবে। এ কারণে মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন চুপ্পুকে শুরুতে ওই পদে রেখে দেয়া হয়েছে। কিন্তু পরে সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা আর সম্ভব হয়ে উঠেনি। শুরু থেকেই বিএনপির নীতিনির্ধারকরা বুঝতে পেরেছিল তাদেরকে ‘মাইনাস’ করার পাঁয়তারা চলছে। তাই দলের নীতিনির্ধারকরা রাজনীতির কৌশল হিসেবে চুপ্পুকে রাষ্ট্রপতি পদ থেকে আউট করার বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। এক্ষেত্রে তাদের অবস্থান ছিল সংবিধানের বিধানাবলী টিকিয়ে রাখার পক্ষে। যারফলে মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন চুপ্পুকে জোর করে আউট করার পরিকল্পনা ভেস্তে যায়।

এরপরে আসে মানবিক করিডোর ইস্যু। মিয়ানমারের বিদ্রোহী গ্রুপ আরাকান আর্মিকে মানবিক করিডোর দেয়ার তোড়জোড় চলে অনেকটা হঠাৎ করেই। এ ব্যাপারে প্রকাশ্য তৎপরতা চালিয়ে যান জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমান। মানবিক করিডোরের প্রক্রিয়া চলছে এবং প্রাথমিক আলোচনা সম্পন্ন হয়েছে বলেও জানানো হয়। ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার মধ্যে উপদেষ্টা খলিলুর রহমান এও দাবি করেন যে, আরাকান আর্মিকে মানবিক করিডোর দেয়ার ম্যান্ডেট নাকি তার সরকারের রয়েছে। উপদেষ্টার এ বক্তব্যের পর বিতর্ক চরমে ওঠে। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেন, নির্বাচিত সরকার ছাড়া অন্য কারো এ ধরনের সিদ্ধান্ত দেয়ার ক্ষমতা নেই। বস্তুত, এরপর থেকেই মানবিক করিডোর ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্র পিছু হটে। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ড. ইউনূসকে বলা হয়, বিষয়টি আপাততঃ চাপা রাখতে।

মানবিক করিডোরের নেপথ্য উদ্দেশ্য ছিল, মিয়ানমার সরকারের সঙ্গে যুদ্ধ বাধানো। মানবিক করিডোরের অন্তরালে পশ্চিমারা আনঅফিসিয়ালি বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ঘাঁটি স্থাপন করতো। ১ লাখ ৮২ হাজার রোহিঙ্গাকে প্রস্তুত রাখা হয়েছিল। এদের ট্রেনিং ও অস্ত্রশস্ত্র দিয়ে আরাকান আর্মির সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে মিয়ানমার সরকারের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামানো হতো। যুদ্ধ শুরু হলে তা অনির্দিষ্টকাল পর্যন্ত চলতে থাকতো। জাতীয় নির্বাচন বানচাল হয়ে যেতো। কিন্তু সেই পরিকল্পনা ভেস্তে গেছে।

বস্তুত, মানবিক করিডোরের প্রক্রিয়া ভেস্তে যাবার পর থেকেই যুক্তরাষ্ট্র কৌশল পরিবর্তন করে বিএনপির সঙ্গে সমঝোতার পথ ধরে। ঢাকায় নিযুক্ত ভারপ্রাপ্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ট্রেসি অ্যান জ্যাকবসন একাধিকবার যুক্তরাজ্যে যান। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠক করেন। এরপর গত জুনে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস যুক্তরাষ্ট্রে যান। তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠক এবং ফেব্রুয়ারির মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠানের চুক্তি হয়। কিন্তু তা সত্ত্বেও টালবাহানা চলছিলো নির্বাচনের সময় ঘোষণা নিয়ে। অবশেষে গত ৫ আগস্ট জাতির উদ্দেশ্যে দেয়া এক ঘোষণায় ড. ইউনূস ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধে নির্বাচনের সময় ঘোষণা করেন। বিশেষ রকমের চাপে পড়ে এ ঘোষণা দিলেও তিনি এবং তাঁর দেশি-বিদেশি সহযোগীরা নির্বাচনের জন্য মোটেই আন্তরিক নয়, দাবি নির্ভরযোগ্য সূত্রের।

সূত্রমতে, সময় ঘোষণা হলেও নির্বাচন বানচালের নানা ফন্দিফিকির বরাবরই অব্যাহত রয়েছে। সীমান্তে যুদ্ধ বাধানোর ষড়যন্ত্র এখনো অব্যাহত আছে। পশ্চিমারা এ ব্যাপারে অত্যন্ত সক্রিয়। মিয়ানমার সীমান্ত ছাড়াও এমনকি ভারত সীমান্তেও বাংলাদেশের সঙ্গে যুদ্ধ বাধানোর পাঁয়তারা চলছে। পশ্চিমারা এ লক্ষ্যে ভারতের ভেতর থেকে ভাড়াটে লোক দিয়ে কাজ করছে। পাশাপাশি বাংলাদেশের বিভিন্ন বাহিনীর অভ্যন্তরেও সমস্যা তৈরির পাঁয়তারা করছে। যদিও তাদের একাধিক তৎপরতা ইতিমধ্যে ভেস্তে গেছে। তারপরও আশঙ্ক্ষা করা হচ্ছে, যে কোনো সময় বড় ধরনের অঘটনের জন্ম দিতে পারে। প্রধান উপদেষ্টা নিজেই দু’দিন আগে এক বক্তৃতায় এ ধরনের আশঙ্ক্ষা ব্যক্ত করেছেন।

কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে, নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় এলে যুক্তরাষ্ট্রের এতোদিনের এগিয়ে আনা মাস্টারপ্ল্যান ভেস্তে যেতে পারে। তাই তারা আদতে নির্বাচন চায় না। ক্ষমতার সুবিধাভোগী অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টারাও অধিকাংশই একই পথে। জামায়াত-এনসিপি তো আছেই। সরকারের ক্ষমতার অংশীদার এই দল দুটি কোনো ক্রমেই ক্ষমতাচ্যূত হতে রাজি নয়। আর তাই একের পর এক নতুন ইস্যু সামনে আসছে। এতোদিন জামায়াত বলেছে, পিআর ছাড়া নির্বাচনে যাবে না। এখন বলছে, আগে গণভোট তারপরে নির্বাচন। নির্বাচন পিছিয়ে দেয়ার দাবিও জানিয়েছে তারা। অন্যদিকে, নবগঠিত এনসিপিও জামায়াতের সঙ্গে একই সুরে বলছে- ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন সম্ভব নয়।

মূলতঃ এই দল দুটিকে ইন্দন দেয়া হচ্ছে সরকারের ভেতর থেকেই। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও এতে জড়িত। বাংলাদেশে নির্বাচন ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পথে এখন এটিই সবচেয়ে বড় বাধা। ঐকমত্য কমিশনের সুপারিশ তৈরিতে জাল-জালিয়াতিও সংঘটিত হয়েছে একই কারণে। আলোচনা বা সিদ্ধান্তের ‘নোট অব ডিসেন্ট’ বাদ দেয়া, আলোচনা হয়নি এমন বিষয় পরবর্তীতে সুপারিশে সংযুক্ত করাটা জাল-জালিয়াতি ছাড়া কিছুই নয়। দেশ বিরোধী এই চক্রটি নির্বাচন বানচালের জন্য এতোটা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে যে, এমন নির্লজ্জ ও ভয়াবহ জাল-জালিয়াতি করতেও তাদের বিবেকে বাধেনি। নির্বাচন বানচালে এরা সফল হলে দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বই হুমকির মুখে পড়বে। কারণ, নির্বাচনের সঙ্গে জড়িত রয়েছে দেশের নিরাপত্তা, এমনকি সার্বভৌমত্বের প্রশ্নও।