দেশের ৪ বন গবেষণা কেন্দ্রের দুরবস্থা, বরাদ্দের অভাবে হচ্ছে না সংস্কার
আধাপাকা ভবনের বারান্দার পিলার ভেঙে গেছে দেড় যুগ আগে। দেয়ালের ফাটলে বিষাক্ত বনপিপড়া আর বিছে বাসা বেঁধেছে। টিনের পুরোনো চাল ভেঙে মুচড়ে একাকার। ফুটোচাল ছুঁয়ে বৃষ্টির পানি পড়ে। জানালা দরজা ভাঙা। মেঝে দেবে গেছে। আসবাবপত্র বলতে ভাঙা চেয়ার আর টেবিল। এমন ভাঙাচোরা আর ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে চলছে বন গবেষণার কাজ। বলছিলাম টাঙ্গাইলের মধুপুর উপজেলার চাড়ালজানি বন গবেষণা কেন্দ্রের কথা। শুধু মধুপুরের চাড়ালজানি নয়, চট্টগ্রামের সাতকানিয়ার কেওচিয়া, মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলের লাউয়াছড়া এবং দিনাজপুরের বিরামপুরের চরকাই বনগবেষণা কেন্দ্রের একই দশা। মাঠপর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা কেন্দ্রের এমন হতশ্রীদশায় বন ও পরিবেশ নিয়ে সফল গবেষণা ও পরীক্ষানিরীক্ষার কাজ হোচট খাচ্ছে।
বনজ সম্পদের বিজ্ঞানভিত্তিক সংরক্ষণ, সম্প্রসারণ, সুব্যবস্থাপনা, প্রযুক্তি উদ্ভাবন, নমুনা সংগ্রহ এবং বনজ সামগ্রীর সুষ্ঠু ব্যবহারের দিকনিদের্শনায় বন গবেষণা কেন্দ্রের গুরুত্ব অপরিসীম। চট্টগ্রাম বন গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধীনে দেশের এ চারটি মাঠ গবেষণাকেন্দ্র স্থাপিত হয় ষাটের দশকে। এসব গবেষণা কেন্দ্রের অধীনে মোট বনভূমির পরিমাণ প্রায় দেড় হাজার একর।
মধুপুর উপজেলার চাড়ালজানি বন গবেষণা কেন্দ্রের ভূমির পরিমাণ ছিল ৪২৫ একর। জনবল সংকটে দেখভাল করতে না পারায় ৩৭২ একর বন বিভাগের নিকট হস্তান্তরিত হয়। বর্তমানে ৫৩ একরে অফিস, কোয়ার্টার ও গবেষণাগার অবস্থিত। প্রায় ১৮ একরে বিরল ও দুষ্প্রাপ্য প্রজাতির বৃক্ষের নার্সারি ও বন বাগান রয়েছে। বজ্রপাতরোধে তাল গাছের চেয়েও বেশি কার্যকরী বুদ্ধ নারিকেল গাছের সফল পরীক্ষা হয়েছে। প্রতি বছরই বিরল প্রজাতির বৃক্ষের চারা বিনা মূল্যে শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিতরণ করা হয়।
অফিস ক্যাম্পাসের আধাপাকা চারটি কোয়ার্টার বসবাসের একদম অনুপযোগী। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে স্টাফরা থাকেন। জনবল সংকটে মাঠ গবেষণা ব্যাহত হচ্ছে। রিসার্চ অফিসার এম আজিজ জানান, সব কটি ভবন তিন দশক আগে ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে গেছে। অফিসে কম্পিউটার নেই। গবেষণালব্ধ ডাটাবেস কাগজে-কলমে রাখা হয়। বরাদ্দের অভাবে গবেষণা বাগান পরিচর্যা ও রক্ষণাবেক্ষণে সমস্যা হচ্ছে। পাহাড়ি টিলায় অবস্থিত ক্যাম্পাসে পানীয় জলের সংকট রয়েছে। জরাজীর্ণ বিদ্যুৎলাইনে দুর্ঘটনার আশঙ্কা থাকে সব সময়। দেড় যুগ ধরে সংস্কার খাতে বরাদ্দ নেই বললেই চলে।
চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলার কেওচিয়া বন গবেষণাগারের স্টেশন অফিসার আনিসুর রহমান জানান, ১ হাজার ৪০ একরের বিশাল গবেষণা বাগান পাহারা, পরিচর্যা, সংরক্ষণে ১৭ জন স্টাফের মধ্যে আছে পাঁচ জন। ক্যাম্পাসের ছয়টি কোয়ার্টারের চারটি পরিত্যক্ত। এলাকাটি ফরেস্ট ক্রাইম জোন। বন অপরাধীদের কবল থেকে বনজ সম্পদ ও বনভূমি রক্ষা দুরূহ হয়ে উঠছে। পাহারাদারের হাতে আগ্নেয়াস্ত্র নেই। লাঠি হাতে সশস্ত্র দুর্বৃত্তদের মোকাবিলা করা কঠিন।
দিনাজপুরের বিরামপুর উপজেলার চরকাই বন গবেষণা কেন্দ্রের মাঠ পরিদর্শক রবিউল ইসলাম জানান, ১৯২ একর বনভূমিতে বিরল প্রজাতির বৃক্ষের নার্সারি ও বন বাগান বিদ্যমান। ১৫ জন স্টাফের মধ্যে আছে মাত্র ছয় জন। সাড়ে পাঁচ দশক আগের ভবনে অফিস করা এবং কোয়ার্টারে বাস করার পরিবেশ নেই। স্টাফরা এখানে মানবেতর জীবনযাপন করেন। শ্রীমঙ্গলের লাউয়াছড়া গবেষণা কেন্দ্রের স্টেশন কর্মকর্তা আবদুল্লাহ আল মাসুদ মজুমদার জানান, অফিসে বিদ্যুৎ নেই। কম্পিউটার নেই। ডিজিটাল যুগে চলে এনালগ পদ্ধতির গবেষণা।
বন গবেষণায় সাড়ে তিন দশক কাজ করেছেন এহিয়ুল ইসলাম। অবসরপ্রাপ্ত এ কর্মকর্তা জানান, পরিবেশ সংরক্ষণে বৃক্ষের বিকল্প নেই। বৃক্ষ, মাটি ও জলবায়ু নিয়ে অবিরাম কাজ করেন গবেষকরা। গবেষণা ছাড়া বিরল ও বিলুপ্তপ্রায় গাছপালা সংরক্ষণ করা যায় না। সেই গবেষণা অফিসের যেমন বেহালদশা, তেমনি স্টাফদের মানবেতর জীবনযাপন সত্যিই দুঃখজনক।
চট্টগ্রাম বন গবেষণা ইনস্টিটিউটের সিলভিকালচার বিভাগের ডিএফও মিজানুল হক দেশের চার বন গবেষণা কেন্দ্রের দুরবস্থার সত্যতা স্বীকার করেন। তিনি জানান, পুরোনো অফিস ও বাসভবন সংস্কার এবং নতুন ভবন তৈরির জন্য আর্থিক বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে। প্রয়োজনীয় লোকবল নিয়োগের কথাও জানানো হয়েছে।






আপনার মতামত লিখুন
Array