টাঙ্গাইলের চলন্ত বাসের চলন্ত হকারের কথা
“হেলপারের ধাক্কায় রানিং গাড়ীতয় পড়ে হাত, পা কাইটা গেছে, গাড়ীর চাকার নিচে যাওয়ার সম্ভাবনাও ছিলো, কোনমুতে বাঁইচা গেছি” কথাটি বলছিলেন চলন্ত বাসগাড়ীর চলন্ত হকার। যিনি চলন্ত গাড়ীতে উঠে যাত্রীদের মাঝে বাদাম,ডালভাজা,চানাচুর,আচার বিক্রি করেন। দূর্ঘটনার শিকার হওয়া দেলদুয়ার উপজেলার মোতালেব পঞ্চাশ বছরের জীবনে প্রায় ৩৫বছরই যাত্রা পথে কিংবা যানবাহনে চানাচুর, পটেটো, বাদাম,ছোলা ও আচার বিক্রি করে সংসার চালাচ্ছেন। ঘরে গৃহিনী আর দুই মেয়ে নিয়ে দারিদ্রতাকে সঙ্গী করেই জীবন পার করছেন। তিনি আরো বলেন“ দিন আনি, দিনেই খরচ করি, এভাবেই চলছে নিরামিষ জীবনযাপন।”
চলন্ত বাসের হকারদের জীবন একটি সংগ্রামী এবং কঠিন পেশা, তাদের সারাদিন রোদ,বৃষ্টি এবং যানজটের মধ্যে বিভিন্ন ধরনের জিনিসপত্র বিক্রি করতে হয়। তারা সাধারণত ছোট খাটো পণ্য যেমন চিপস, বাদাম, চানাচুর, হাতপাখা, ঔষধ, মাস্ক, টুথব্রাশ, আমরা, পেয়ারা, শশা এবং অন্যান্য নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র্র বিক্রি করেন। অনেক সময় তারা যাত্রীদের কাছে পণ্য বিক্রির জন্য নানা প্রচেষ্টা করেন এবং নিজেদের জীবিকা নির্বাহের জন্য সংগ্রাম করেন।
এই পেশাটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ন। চলন্ত বাস থেকে জিনিসপত্র বিক্রি করার সময় বা বাসে ওঠার সময় দূর্ঘটনার শিকার হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তাদের আয় নিশ্চিত এবং তারা তাদের ব্যবসার জন্য সম্পূর্নভাবে অন্যদের উপর নির্ভর করে। হকারদের সামাজিক চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হতে হয়। যাত্রীদের নেতিবাচক আচরণ, যা তাদের কাজকে আরও কঠিন করে তোলে। আবার হকারদের সুন্দর ব্যবহারের কারনে যাত্রীদের কাছে সহজেই পন্য বিক্রি করতে পারে।
টাঙ্গাইল জেলার মির্জাপুর বাসস্ট্যান্ড যমুনা সেতুর গোলচত্তর পর্যন্ত চলন্ত হকাররা নিয়মিত যাত্রীদের কাছে পন্যসামগ্রী বিক্রি করে। এই রোডে উন্নত মানের বাসসহ লোকালবাস নিয়মিত চলাচল করে। মির্জাপুর থেকে যমুনা সেতুর বিভিন্ন স্টপজে যানবাহন থামলে তখন এই হকাররা চলন্ত বাসে উঠে যাত্রীদের মাঝে তাদের পন্যদ্রব্য বিক্রি করেন। এসব পন্যদ্রব্যের দাম ৫ টাকা থেকে শুরু করে ২০ টাকা পর্যন্ত। যে কারণে পণ্যদ্রব্য বিক্রি করার জন্য পর্যাপ্ত ভাংতি টাকা তাদের রাখতে হয়।
চলন্ত হকারদের সাথে কথা বলে জানা যায়, তাদের প্রায় সবারই ১৪০০ থেকে ১৫০০ টাকা প্রতিদিন বিক্রি হলে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা লাভ থাকে। প্রতিদিন বেলা ১০ টার পর থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত বিভিন্ন পরিবহনে এবং বিভিন্ন স্টপজে তাদের আনাগোনা দেখা যায়।
৪২ বছরের মনি চন্দ্র চাকী সংসারের চাহিদাকে ছোট করে অভাবকে জয় করে দিনাতিপাত করেছেন মির্জাপুরের আন্দারা গ্রামে। টাঙ্গাইল শহরের বিশ^াস বেতকার দাস পাড়ার নিতাই চন্দ্র চাকীর ছেলে মনি ২০ বছর ধরে এ পেশায় আছেন। এক ছেলে এক মেয়ে বাবা মনি চন্দ্র চাকী বলেন“ আমাদের আদিনিবাস বিশ^াস বেতকায় অনেক জমিজমা ছিলো। যা ৭জন পিসিকে বিয়ে দিতে গিয়ে তার বাবা জমিগুলো বিক্রি করে দিয়েছিলেন। অভাবের সংসারে বাধ্য ক্ষুদ্র হকার ব্যবসাকে বেঁছে নিতে হয়েছে।
মনি চন্দ্র চাকীর বড় ভাই গোপাল চন্দ্র চাকীও মির্জাপুরের আন্দারায় বসবাস করেন। এক ছেলে এক মেয়ে ও স্ত্রী নিয়ে অল্প আয়ের সংসারে বসবাস করছেন। ছেলেটাকে পড়ালেখা করিয়েছেন। ছেলেটা উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করে মির্জাপুর স্কয়ারে চাকরি করে। তিনি বলেন“ আমরা গাড়ীতে উঠে যাত্রা পথে যাত্রীদের মাঝে বাদাম, চানাচুর,শশা ও আমরা বিক্রি করি। দূর পথের যাত্রীরা আমাদের কাছ থেকে সস্তায় খাওয়ার পণ্য কিনে সায়মিক ভাবে ক্ষুধা নিবারন করেন। প্রায় ৪২ বছর ধরে এ পেশায় আমি কাজ করছি, অন্য পেশায় যাওয়ার চিন্তা করিনি। অল্প টাকায় ব্যবসা করে সংসার চালানো যাচ্ছে। এতেই আমি খুশি”।
কালিহাতী গোয়ালিয়াবাড়ী এলাকার পয়তাল্লিশ বছর বয়স্ক আশরাফ আলী কাপড়ের ব্যবসায় লোকসানের পর হকারের জীবন বেঁেছ নিয়েছেন। প্রায় ২২ বছর হলো কঠিন চ্যালেঞ্জের মাঝে কোনরকমে টিকে আছেন। তার দু’চোখে সমস্যা হলেও জীবন সংসারের তাগিয়ে হকার পেশা ছাড়তে পারেন না। তিনি চলন্ত হকার পেশা নিয়ে বলেন, আমরা গাড়ীতে উঠতে গেলে, গাড়ীমুদে উঠপাড় দিবার চায় না, জোর কইরা আমরা উঠি,হেলপাররা ভালো চোখে দেখে না। নানান সমস্যা। ক্ষুদ্র ব্যবসা করে আমরা চলি, আল্লাহপাক চালালে আমরা ভালো চলি। যে দিন আল্লাহপাক ভালো চালায় সেদিন ভালো চলি। শরীর যদি অসুস্থ আমাগো তখন বইয়া থাকতে হয়। আমাগো কোন সঞ্জয় নাই, কামাই করি, খাই।
টাঙ্গাইল শহরের কাগমারা এলাকার মনসের আলীর ছেলে বাদশা মিয়া যানবাহন থেকে যানবাহনের ঘুরে ঘুরে শশা ও আমরা বিক্রি করেছেন। ঘরে তার দুই ছেলে। টাকার অভাবে তারাও ছোটখাটো কাজ করছেন।
উল্লাপাড়ার রফিকুল ইসলাম ও কবির হোসেন টাঙ্গাইল শহরে থেকে অল্প দামে ইমিটেশনের চুঁড়ি, গয়না,ব্রেসলেট বিক্রি করে জীবন পার করছেন। তাদের সারাদিনের প্রায় ২৫০০ টাকা হলে ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা লাভ হচ্ছে।
সিরাজগঞ্জের কবির মিয়া প্রায় ১৮ বছর এই চলন্ত পেশায় জড়িয়ে আছেন। তার বাবা দরিদ্র কৃষক। যে কারনে অল্প বয়সেই সংসারের হাল ধরতে চলন্ত হকারে পেশা বেঁছে নেওয়া।
মির্জাপুরের মানিক পাল গাড়ী চালকের তাদের ব্যাপারে সহনশীল হতে বলেন। “আমরা মানুষ, আমাদের পেট আছে, আমাদের বেঁচে থাকার অধিকার দেন”।
উত্তরবঙ্গের গাড়ী চালক সেলিম বলেন, চলন্ত হকাররা আমাদের ক্ষুধার্ত যাত্রীদের ক্ষুধা নিরাময়ের জন্য সর্বক্ষন সেবা দিয়ে থাকেন। লং জার্নিতে যাত্রীদের খাবারের অভাব তারাই পুরণ করতে পারে।’
দেলদুয়ার উপজেলার ৩০ বছরের রুবেল বলেন, গাড়ীওয়ালা গাড়ীতে উঠপার দিবার চায়না, তবু জোর কইরা উঠি, কি করমু, গরীব মানুষ, পেট ভাতে চলি। দুটি মেয়ে আর স্ত্রী নিয়ে কোনমতে চলি। দোয়া রাখবেন। তিনি আরো বলেন, বাসগাড়ীতে পুরুষ যাত্রীর চেয়ে মহিলা ও শিশু কিশোর যাত্রীরা হকারদের নিকট থেকে বেশী বেশী খাবার পন্য ক্রয় করেন।
গালা ইউনিয়ন আয়নাপুরের আব্দুর রহিম বলেন, আল্লাহ ভালই রাখছে, ডাউল ভাততো খেতে পারি। তিনি গাড়ীতে উঠা নিয়ে বলেন, গাড়ীতে উঠবার নই, ধাক্কা দিয়ে যখন সরায় দেয় তহন খুব খারাপ লাগে। আমরা গরীব মানুষ, আমরা কিছু কইড়া কাইটা খাই।
চলন্ত হকারদের সাথে কথা বলে জানা যায়, অনেক হকার শিক্ষাগতভাবে যোগ্য হওয়া সত্ত্বেও বাদ্য হয়ে এই পেশা বেছে নিতে হয়েছে। এই পেশাকে সমাজে সম্মান দেওয়া হয় না। তাদের মানসিক কষ্টের কারণ হতে হয়। তারা চান না তাদের সন্তানরা এই পেশায় আসুক। তারা পারত পক্ষে এই পেশা ছাড়তে চান, কিন্তু অভাবের কারণে এই পেশা ছাড়তে পারেন না। অল্প পুঁিজতে এই পেশায় ব্যবসা করা যায়। তাদের দাবী আমাদের সামাজিক ভাবে হেয় না করে একটু মূল্যায়ন করলে আমরা সমাজে ভালোভাবে চলতে পারতাম। কারণ আমরাও মানুষ আমরা কাজ করে খেতে চাই।






আপনার মতামত লিখুন
Array