সততা, নেতৃত্ব ও কর্মদক্ষতায় ঘাটাইলের নতুন মডেল ইউএনও আবু সাঈদ

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশিত: বুধবার, ১২ নভেম্বর, ২০২৫, ৬:৪৫ অপরাহ্ণ
সততা, নেতৃত্ব ও কর্মদক্ষতায় ঘাটাইলের নতুন মডেল ইউএনও আবু সাঈদ

ঘাটাইল উপজেলা প্রশাসনের ইতিহাসে এক অনন্য অধ্যায়ের সূচনা হয় ২০২৫ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি। সেদিন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন ৩৬তম বিসিএস (প্রশাসন) ক্যাডারের মেধাবী, কর্মঠ ও মানবিক কর্মকর্তা মো. আবু সাঈদ।

এর পূর্বে ২০২৪ সালের ১৪ নভেম্বর ধনবাড়ী উপজেলা নির্বাহী অফিসার হিসেবে প্রথম দায়িত্ব নেন। প্রথম ইউএনও হিসেবে ধনবাড়িতে একশত দিন দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে তিনি প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী হিসেবে গুরু দায়িত্ব পালন করেন এবং কর্মজীবনে প্রবেশ করেন।

২৪ ফেব্রুয়ারি ঘাটাইলের দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে তার নিরলস পরিশ্রম, বুদ্ধিমত্তা ও দূরদর্শী নেতৃত্বে বদলে গেছে উপজেলার প্রশাসনিক চিত্র। উন্নয়ন, সুশাসন, স্বচ্ছতা ও জনকল্যাণের প্রতিটি ক্ষেত্রে তিনি প্রমাণ করেছেন একজন দক্ষ প্রশাসক চাইলে কীভাবে একটি উপজেলা দেশের মডেল হিসেবে গড়ে তোলা যায়।

যশোর জেলার মনিরামপুর থানার ঢাকুরিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে ১৯৯৭ সালে প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্ন করা মো. আবু সাঈদ ২০০২ সালে বিজ্ঞান বিভাগে এসএসসি এবং ২০০৪ সালে এইচএসসি পাস করেন। পরে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হয়ে উচ্চশিক্ষা অর্জন করেন।

পিতা মৃত আজাহার আলী সরদার ছিলেন একজন সমাজসেবক, মাতা মৃত রওশন আরা বেগম ছিলেন শিক্ষানুরাগী। নয় ভাইবোনের মধ্যে কনিষ্ঠ আবু সাঈদ শৈশব থেকেই মেধাবী ও নেতৃত্বগুণে উজ্জ্বল ছিলেন। বর্তমানে তিনি স্ত্রী ফাতিমা খাতুন ও একমাত্র পুত্র রাফিউন বিন সাঈদকে নিয়ে গড়ে তুলেছেন এক আদর্শ পরিবার।

কর্মজীবনের শুরু তিনি উদ্যোক্তা হিসেবে করেন, পরবর্তীতে ২০১৭ সালে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে সরকারি চাকরিতে প্রবেশ করেন এবং ২০১৮ সালে ৩৬তম বিসিএসের মাধ্যমে প্রশাসন ক্যাডারে যোগ দেন। ঘাটাইলে যোগদানের পর প্রথমেই তিনি নজর দেন পরিবেশ রক্ষায়।

উপজেলার ৪১টি ইটভাটার মধ্যে অধিকাংশেরই ছিল পরিবেশ ছাড়পত্রহীন। মাত্র দুই মাসে তিনি কঠোর অভিযান পরিচালনা করেন, ৩৪ লাখ টাকা জরিমানা আদায় করেন এবং একটি অবৈধ ইটভাটা বন্ধ করেন। ফলে পাহাড় কেটে মাটি বিক্রি ও বায়ুদূষণ বন্ধ হয়েছে।

তিনি যুব সমাজকে অনলাইন জুয়া ও মাদকাসক্তি থেকে বিরত রাখতে সামাজিক সচেতনতা অভিযান চালান। মসজিদ, স্কুল-কলেজ ও চায়ের দোকানগুলোতে সচেতনতা সভা পরিচালনা করে তরুণদের সৎ পথে চলার জন্য উৎসাহিত করেন। অবৈধভাবে পাহাড়ি মাটি কাটার বিরুদ্ধে তিনি কঠোর প্রশাসনিক উদাহরণ স্থাপন করেন। নয়জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড ও জরিমানা দিয়ে প্রমাণ করেছেন পরিবেশ ধ্বংসকারীরা ছাড় পাবেন না। গ্রাম পুলিশ নিয়োগ ও রাত্রীকালীন অভিযান পরিচালনা করে পাহাড়ি মাটি কাটা প্রায় শূন্য পর্যায়ে নামিয়ে এনেছেন।

এসএসসি পরীক্ষায় নকল বন্ধে তার নেওয়া পদক্ষেপ সারাদেশে প্রশংসিত হয়েছে। যোগদানের মাত্র দুইদিন পর শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে প্রকাশিত “খোলা চিঠি” আলোড়ন সৃষ্টি করে। প্রতিটি কেন্দ্রে ট্যাগ অফিসার নিযুক্ত, শিক্ষক-অভিভাবকদের সঙ্গে নিয়মিত মতবিনিময় ও কঠোর তদারকির মাধ্যমে এবারের এসএসসি পরীক্ষা সম্পূর্ণ নকলমুক্ত অনুষ্ঠিত হয়। তিনি বিশ্বাস করেন, “সুশাসনের শুরু সচেতন নাগরিক থেকে।”

মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা রোধে তিনি চালু করেন “মোবাইল ট্রাফিক স্কুল” এবং হেলমেটবিহীন ও লাইসেন্সবিহীন চালকদের বিরুদ্ধে ১৫ দিনের অভিযান পরিচালনা করেন। স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের ট্রাফিক সংকেত, সড়ক পারাপারের নিয়ম ও আইন মানার গুরুত্ব শেখানো হয়।

শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শৃঙ্খলা ফেরাতে তিনি নিজে মাঠে নেমেছেন। আকস্মিক পরিদর্শন, অভিভাবক সমাবেশ ও শিক্ষক মিটিংয়ের ফলে উপস্থিতি বেড়েছে, শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে এসেছে। প্রাথমিক শিক্ষায় ঝরে পড়া রোধে ২০টি বিদ্যালয়ে প্লে গ্রাউন্ড নির্মাণের কাজ হাতে নিয়েছেন।

তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে তিনি তৈরি করেছেন ঘাটাইল উপজেলা প্রশাসনের অফিসিয়াল ফেসবুক পেজ, যা অভিযোগ ও সমস্যা জানাতে সর্বোত্তম মাধ্যম হিসেবে কার্যকর। সরকারি প্রকল্পগুলোর গুণগত মান রক্ষায় মাঠ পর্যায়ে মনিটরিং ও অগ্রগতি প্রতিবেদন পর্যালোচনা করেন।

স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠার অংশ হিসেবে বয়স্ক, বিধবা ও প্রতিবন্ধী ভাতাভোগীদের উন্মুক্ত বাছাই কার্যক্রম চালু করেছেন। “সাগরদীঘি বিনোদন কেন্দ্র ও রেস্টহাউস” নির্মাণ প্রকল্প গ্রহণ করেছেন, যা ঘাটাইলকে পর্যটনের নতুন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলবে। রমজান মাসে চালু করা “স্বল্পমূল্যের ডিমের বাজার” অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে।

ট্রাফিক ও সড়ক নিরাপত্তায় চার ধাপে প্রশিক্ষণ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করেছেন। পর্যটন সম্ভাবনার উন্নয়নে রেস্টহাউস, বিনোদন কেন্দ্র ও হ্রদভিত্তিক প্রকল্পের মাধ্যমে ঘাটাইল উত্তর টাঙ্গাইলের পর্যটন হাবে পরিণত হচ্ছে।

অবকাঠামো উন্নয়নেও তিনি অগ্রাধিকারভিত্তিক তালিকা অনুযায়ী রাস্তা পাকাকরণের কাজ করছেন। কৃষিপণ্য পরিবহন সহজ, স্কুল-কলেজে যাতায়াত নিরবচ্ছিন্ন এবং গ্রামীণ অর্থনীতি সচল হচ্ছে।

জনগণের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের জন্য নিয়মিত গণশুনানি চালু করেছেন। ঘাটাইল পৌরসভায় এলইডি লাইট স্থাপন উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন, যা পুরো পৌর এলাকা আলোকিত করবে।

অল্প সময়েই মো. আবু সাঈদ প্রমাণ করেছেন, দক্ষতা, সততা ও মানবিকতার সমন্বয়ে একজন প্রশাসক কীভাবে পুরো উপজেলা পরিবর্তন করতে পারেন। তার নেতৃত্বে ঘাটাইল শৃঙ্খলিত, আধুনিক ও সেবামুখী প্রশাসনিক ইউনিটে পরিণত হয়েছে, যা দেশের অন্যান্য উপজেলায় মডেল হিসেবে উদাহরণ স্থাপন করছে।