টাঙ্গাইল মুক্ত করেছিল কাদেরিয়া বাহিনী
১৯৭১ সালের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধ তখন শেষের দিকে। একের পর এক এলাকায় মুক্তিবাহিনীর কাছে পরাজয়বরণ করছে দখলদার পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী। ১১ ডিসেম্বর টাঙ্গাইল থেকেও বিতাড়িত করা হয় তাদের। ভোর থেকে শহরে ঢুকে পড়েন বীর মুক্তিযোদ্ধারা। তাদের নেতৃত্বে ছিলেন কাদেরিয়া বাহিনীর প্রধান বঙ্গবীর আব্দুল কাদের সিদ্দিকী বীরউত্তম। একই দিন শত্রুমুক্ত হয় মুন্সীগঞ্জ ও সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জও।
মিত্রবাহিনীর অবতরণ
১০ ডিসেম্বর বিকেলে টাঙ্গাইল শহরের উত্তরে পৌলি সেতুর কাছে মিত্রবাহিনীর প্রায় ২ হাজার সেনা অবতরণ করেন। এতে মনোবল হারিয়ে ফেলে পাকিস্তানিরা। চতুর্দিকের আক্রমণে দিশেহারা হয়ে তারা ছুটতে থাকে ঢাকার দিকে। সেদিন রাত ১০টার পর আব্দুর রাজ্জাক ভোলা কমান্ডারের নেতৃত্বে বীর মুক্তিযোদ্ধারা টাঙ্গাইল সদর থানায় প্রবেশ করেন। সেখানে উত্তোলন করা হয় স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা।
১১ ডিসেম্বর বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীর নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধারা শহরে ঢোকেন। ‘জয় বাংলা’ স্লোগানে টাঙ্গাইল হানাদার মুক্ত হয়।
ঐতিহাসিক এই দিনে আজ বৃহস্পতিবার শহরের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে কাদেরিয়া বাহিনী নানা কর্মসূচি নিয়েছে। ভোরে মহান মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিস্তম্ভে পুষ্পস্তবক অর্পণ, সকাল সাড়ে ১০টা থেকে ৩টা পর্যন্ত গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী সঙযাত্রা ও লাঠিখেলা, বিকেল সাড়ে ৩টায় আলোচনা সভা হবে। কাদেরিয়া বাহিনীর সর্বাধিনায়ক বঙ্গবীর আব্দুল কাদের সিদ্দিকী বীরউত্তমের সভাপতিত্বে এতে প্রধান অতিথি থাকবেন মহান মুক্তিযুদ্ধে টাঙ্গাইলের কমান্ডার ইন চিফ আবদুল লতিফ সিদ্দিকী।
অন্ধকারেই পালিয়ে যায় পাকিস্তানিরা
১৯৭১ সালের ৪ ডিসেম্বর চূড়ান্ত যুদ্ধে সফলতা অর্জন করেন মুন্সীগঞ্জের বীর মুক্তিযোদ্ধারা। তাদের তীব্র প্রতিরোধ ও মিত্রবাহিনীর বিমানবহরের হামলার মুখে পাকিস্তানি সেনারা মুন্সীগঞ্জের বিভিন্ন এলাকা থেকে পিছু হটে। এক পর্যায়ে শহরের হরগঙ্গা কলেজ ক্যাম্প ও ধলেশ্বরীর উত্তর প্রান্তের চরে অবস্থান নেয়। বিচ্ছিন্নভাবে ধলেশ্বরী নদীসংলগ্ন নয়াগাঁও এলাকায় মর্টারসেল ছুড়তে ছুড়তে মুন্সীগঞ্জ ছাড়তে থাকে। ১০ ডিসেম্বর রাত ৩টার দিকে তীব্র শীতের ঘন অন্ধকারে সুরক্ষিত হরগঙ্গা কলেজ ক্যাম্প থেকে পালিয়ে যায় পাকিস্তানিরা। ১১ ডিসেম্বর ভোরে তা টের পান বীর মুক্তিযোদ্ধারা। এরপরই ‘জয় বাংলা’ স্লোগান নিয়ে নেমে পড়েন মুন্সীগঞ্জবাসী।
বীর মুক্তিযোদ্ধা আনোয়ার হোসেন অনুর ভাষ্য, ৪ ডিসেম্বর মুন্সীগঞ্জ শহরের অদূরে রতনপুর ও আশপাশের এলাকায় পাকিস্তানি সেনার সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধাদের চূড়ান্ত যুদ্ধ হয়। জেলার বিভিন্ন এলাকার সহস্রাধিক মুক্তিযোদ্ধা একাধিক দলে বিভক্ত হয়ে পাকিস্তানি সেনার তিনটি বড় দলের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হন। পাকিস্তানিরা ধলেশ্বরী নদীতে থাকা গানবোট থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের দিকে মর্টারশেলিং করছিল। মুক্তিযোদ্ধারাও পাল্টা গুলি চালাতে থাকেন। এক পর্যায়ে মিত্রবাহিনীর বিমান বহরের হামলায় পাকিস্তানিদের তিনটি গানবোট বিধ্বস্ত হয়। পিছু হটতে শুরু করে তারা।
বীর মুক্তিযোদ্ধা আনোয়ার হোসেন অনু বলেন, ‘১০ ডিসেম্বর দিবাগত রাত দুইটার দিকে আমরা টের পাই, পাক-হানাদাররা পালিয়ে যাচ্ছে। তখন আমার সঙ্গে শতাধিক ট্রেনিংপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। আমরা সদরের রামপাল থেকে তাদের পেছনে পেছনে ধলেশ্বরী নদীর তীর পর্যন্ত যাই। আমাদের কাছে মর্টারগান থাকলেও ছুড়িনি। ছুড়লে পাল্টা হামলায় ব্যাপক ক্ষতি হতে পারত।’ পাকিস্তানিরা নারায়ণগঞ্জের সীমানায় যাওয়ার পর আনন্দ মিছিল নিয়ে তারা শহরের দিকে রওনা হন।
বহু খণ্ড যুদ্ধের পর জয়
বহু খণ্ড যুদ্ধের পর সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জে ১০ ডিসেম্বর শুরু হয় সম্মুখ যুদ্ধ। কুশিয়ারা নদীর উত্তর পারে অবস্থান নেয় পাকিস্তানি হানাদাররা। দক্ষিণ পার থেকে মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনী কুশিয়ারা রেলসেতুর ওপর দিয়ে উত্তর পাড়ের দিকে অগ্রসর হয়। তখন অতর্কিতে ঝাঁপিয়ে পড়ে পাকিস্তানিরা। মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনীর সদস্যরা প্রাণরক্ষায় ঝাঁপ দেন কুশিয়ারায়। পরদিন ১১ ডিসেম্বর বিপুল বিক্রমে হামলা করেন মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনীর সদস্যরা। লড়াইয়ে পর্যুদস্ত হয়ে ফেঞ্চুগঞ্জ ছেড়ে সিলেটের দিকে পালিয়ে যায় পাকিস্তানিরা।






আপনার মতামত লিখুন
Array