ইউরিয়া সার উৎপাদন বন্ধ, হুমকিতে কৃষি

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশিত: বুধবার, ১৫ এপ্রিল, ২০২৬, ১০:২৬ পূর্বাহ্ণ
ইউরিয়া সার উৎপাদন বন্ধ, হুমকিতে কৃষি

দেশজুড়ে প্রাকৃতিক গ্যাসের তীব্র সংকট ও বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতির অস্থিরতায় দেশের কৃষি-অর্থনীতিতে উদ্বেগের কালো ছায়া নেমে এসেছে। জানা গেছে, দেশের বৃহত্তম ছয়টি ইউরিয়া সার কারখানার মধ্যে পাঁচটিরই উৎপাদন কার্যক্রম বর্তমানে বন্ধ রয়েছে। এদিকে ঘনিয়ে আসছে ইউরিয়া সারের চাহিদার সময়। সেই চাহিদা মেটাতে সরকার এরই মধ্যে বিদেশ থেকে ৩ লাখ টন ইউরিয়া সার আমদানির কার্যক্রম শুরু করেছে। আরও ৪ লাখ টন আমদানির আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করলেও অনুকূল সাড়া মেলেনি। এমন পরিস্থিতিকে দেশের কৃষি খাতের জন্য অশনিসংকেত হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।

শিল্প মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ কর্পোরেশনের (বিসিআইসি) অধীনে থাকা পাঁচটি সরকারি সার কারখানা হলো- চট্টগ্রামে অবস্থিত চিটাগং ইউরিয়া ফার্টিলাইজার ফ্যাক্টরি লিমিটেড, জামালপুরের যমুনা ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেড, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ ফার্টিলাইজার অ্যান্ড কেমিক্যাল কোম্পানি লিমিটেড, সিলেটের শাহজালাল ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেড এবং নরসিংদীর ঘোড়াশাল পলাশ ফার্টিলাইজার পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি। এ ছাড়া পিপিপির (পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ) ভিত্তিতে পরিচালিত হয় চট্টগ্রামে অবস্থিত কর্ণফুলী ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেড (কাফকো)। প্রতিষ্ঠানটি যৌথভাবে পরিচালিত হয় বাংলাদেশ, জাপান, ডেনমার্ক ও নেদারল্যান্ডসের মালিকানায়।

বিসিআইসি সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে ঘোড়াশাল সার কারখানা ছাড়া বাকি পাঁচটি বন্ধ রয়েছে গ্যাস সরবরাহের অভাবে। বিসিআইসি কর্মকর্তারা জানান, সরকারি পাঁচটি কারখানার দৈনিক উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ৭ হাজার ১০০ টন। এসব কারখানা পূর্ণ সক্ষমতায় চালাতে প্রতিদিন প্রায় ১৯৭ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস প্রয়োজন হয়। কিন্তু চলমান গ্যাস সংকটের কারণে উৎপাদন চালু রাখা সম্ভব হচ্ছে না। এতে দেশে ইউরিয়া সারের সংকট সৃষ্টির আশঙ্কা করছেন কৃষি সংশ্লিষ্টরা। বিশেষ করে বোরো মৌসুমে সার সরবরাহ নিয়ে কৃষকদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। সময়মতো সার না পেলে ফসল উৎপাদন ব্যাহত হবে- বিশেষ করে ধান ও ভুট্টা চাষে। এই দুটি ফসলে ইউরিয়া সারের চাহিদা বেশি থাকায় এমন আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। এ ছাড়া সার সংকটে খাদ্য নিরাপত্তার ওপরও প্রভাব পড়তে পারে বলে জানান কৃষি বিশেষজ্ঞরা।

বাংলাদেশ ফার্টিলাইজার অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বছরে ইউরিয়া সারের প্রয়োজন প্রায় সাড়ে ২৬ লাখ টন। এর মধ্যে ১০ লাখ টন দেশে উৎপাদন হয়। বাকিটা আমদানি করা হয়। বিসিআইসির তথ্য অনুসারে, বর্তমানে সরকারের কাছে ইউরিয়া সারের যে মজুত আছে, তাতে আগামী জুন পর্যন্ত চাহিদা মেটানো সম্ভব। এদিকে মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে ইউরিয়া ৪ লাখ ৯৩ হাজার টন, টিএসপি ৩ লাখ ৮২ হাজার টন, ডিএপি ৫ লাখ ৯ হাজার টন এবং ৩ লাখ ৪২ হাজার টন এমওপি সার মজুত রয়েছে। এ বিষয়ে কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ বলেছেন, পর্যাপ্ত সার মজুত থাকায় এই মুহূর্তে সংকটের কোনো শঙ্কা নেই। তিনি আরো জানান, সরকারের কাছে আমদানীকৃত সার যতটা মজুত আছে, তাতে মোটামুটি এক বছর চালিয়ে নেওয়া যাবে।

তবে বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা অন্যখানে। তারা জানান, আগামী জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত থাকবে ইউরিয়া সারের মিনি পিক সিজন। সে সময়ে এই সারের চাহিদা থাকে সাড়ে ৬ লাখ টনের মতো। এই চাহিদা মেটাতে এরই মধ্যে জিটুজি (গভর্নমেন্ট টু গভর্নমেন্ট) ভিত্তিতে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে ইউরিয়া আমদানির কার্যক্রম চলমান রয়েছে। সূত্র জানায়, এই পদ্ধতিতে সৌদি আরব থেকে আনা হচ্ছে ২ লাখ টন এবং আমিরাত থেকে ১ লাখ টন ইউরিয়া সার। সে ক্ষেত্রে ঘাটতি থেকে যাচ্ছে আরও সাড়ে ৩ লাখ টন।

সূত্র জানায়, সেই ঘাটতি নিরসনে এবং কৃষিকাজে যেন কোনো ব্যাঘাত না ঘটে, তা আমলে নিয়ে আরও ইউরিয়া সার আনতে তৎপর সরকার। এরই মধ্যে সরকার সেই লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক দরপত্রও আহ্বান করেছে। কিন্তু গত ৯ এপ্রিল প্রথম দফা দরপত্র বাক্স খুলে কোনো দরপত্র পাওয়া যায়নি। অর্থাৎ দরপত্রে অংশগ্রহণ করেনি কোনো কোম্পানি। এমন পরিস্থিতিকে সরকারের জন্য অশনিসংকেত হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞদের অনেকে। কারণ হিসেবে তারা বলছেন, একে তো দেশের বড় ছয়টি কারখানার মধ্যে পাঁচটিই বন্ধ। আবার আন্তর্জাতিক দরপত্রেও সাড়া মিলছে না। যদি এমনটা অব্যাহত থাকে, তবে মিনি পিক সিজনে ইউরিয়ার ঘাটতিতে ব্যাহত হবে কৃষিকাজ, যা দেশের জন্য মঙ্গলজনক নয়। অবশ্য সূত্র জানায়, সময় এখনই শেষ হয়ে যায়নি, আগামী ১৬ এপ্রিল দ্বিতীয় দফায় দরপত্র বাক্স খোলা হবে। সে সময় দরপত্র পাওয়া যাবে বলে আশাবাদী সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

জানা গেছে, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের নির্দেশনা অনুযায়ী বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে জ্বালানি রুট, বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি, নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় আগাম প্রস্তুতি হিসেবে সার কারখানায় গ্যাস সরবরাহ বন্ধ রাখা হয়েছে। বিসিআইসি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সরকারি পাঁচটি কারখানা পূর্ণ সক্ষমতায় চালাতে প্রতিদিন প্রায় ১৯৭ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের প্রয়োজন হয়। বর্তমানে এই সরবরাহ বন্ধ থাকায় দৈনিক প্রায় ৭ হাজার ১০০ টন ইউরিয়া উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।

স্থানীয় উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সামনের আমন মৌসুমে ইউরিয়া সার সরবরাহ নিয়ে কৃষকদের মধ্যে দুশ্চিন্তা তৈরি হয়েছে। এ ক্ষেত্রে কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ অভয় দিলেও শঙ্কা কাটেনি। আন্তর্জাতিক বাজার বিশ্লেষকদের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর বিশ্ববাজারে ইউরিয়া সারের দাম প্রায় ২৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা আমদানিনির্ভর বাংলাদেশের জন্য দীর্ঘ মেয়াদে আর্থিক চাপ সৃষ্টি করতে পারে। বিশেষ করে সেচ মৌসুমের ধকল কাটিয়ে ওঠার আগেই সারের এই উৎপাদন সংকট খাদ্য নিরাপত্তা এবং শস্যের উৎপাদন খরচ বাড়িয়ে দেওয়ার আশঙ্কা তৈরি করেছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলে এবং আন্তর্জাতিক সরবরাহব্যবস্থা বিঘ্নিত হলে দেশের কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থা বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

সংবাদটি rupalibangladesh.comওয়েবসাইটে প্রকাশিত হয়েছে। তথ্যের সঠিকতা ও মালিকানা বিষয়ে কোনো প্রশ্ন থাকলে অনুগ্রহ করে মূল সূত্রের সঙ্গে যোগাযোগ করুন।