মমতা ‘অস্তে’ আশার উদয়
চুক্তি নেই, আলোচনা আছে, কিন্তু রাজনৈতিক জটিলতায় আটকে আছে তিস্তা ইস্যু। এমন বাস্তবতায় এ ইস্যুটি এখন শুধু দ্বিপক্ষীয় পানি বণ্টন নয়, বরং একটি ত্রিপক্ষীয় ভূরাজনৈতিক সমীকরণে পরিণত হচ্ছে। কারণ ভারতের অবস্থান এখনো দ্বিপক্ষীয় আলোচনাকেন্দ্রিক। তবে চীনের সম্পৃক্ততা বাড়লে আঞ্চলিক কৌশলে নতুন চাপ তৈরি হতে পারে।
বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক প্রভাব কমে গেলে পানি বণ্টন আলোচনায় কেন্দ্রীয় সরকারের নমনীয়তা বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দলের ভরাডুবির পর থেকে তিস্তায় আশার আলো ফুটতে শুরু করেছে। এমন পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশের নতুন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর আজ (বুধবার) সকালে চীনে পৌঁছার কথা রয়েছে।
ড. খলিলের এ সফরকে ঘিরে দক্ষিণ এশিয়ার কূটনৈতিক মহলে নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে। সফরের অন্যতম অনানুষ্ঠানিক ফোকাস হতে পারে তিস্তা নদীর পানি ব্যবস্থাপনা ও উন্নয়ন প্রকল্প। কারণ, তিস্তা চুক্তি দীর্ঘদিন অনিশ্চিত থাকলেও এখন এই ইস্যুতে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে বেইজিংয়ের ভূমিকা।
তবে ঢাকার একটি কূটনৈতিক সূত্র বলছে, ভারত সাধারণত তিস্তা ইস্যুকে দ্বিপক্ষীয় কাঠামোর মধ্যেই রাখতে চায়। কারণ, চীনের সম্পৃক্ততা বাড়লে আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও প্রভাব নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি হতে পারে। তাই পররাষ্ট্রমন্ত্রীর চীন সফরকে ঘিরে তিস্তা ইস্যুতে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত না এলেও, কূটনৈতিক মহল এটিকে একটি ‘সম্ভাব্য টার্নিং পয়েন্ট’ হিসেবে দেখছে। ফলে পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে মমতার পরাজয়ে তিস্তার কাঁটা সরল বলে মনে করছেন অনেকেই। বিশ্লেষকরা বলছেন, মমতার অস্তে আশার উদয় হতে চলেছে তিস্তার মহাপরিকল্পনায়।
যদিও ঢাকা একদিকে ভারতকে দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় রাখতে চায়, অন্যদিকে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে বিকল্প অংশীদার খুঁজছে। তবে দীর্ঘ ১৫ বছরের অচলাবস্থার পর পানি বণ্টন ইস্যুতে নতুন সমীকরণ তৈরি হতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চীন বাংলাদেশের অবকাঠামো, শক্তি ও নদী ব্যবস্থাপনা খাতে গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন অংশীদার হয়ে উঠেছে।
বিশেষ করে তিস্তা মাস্টার প্ল্যানের মতো বড় প্রকল্পে চীনের প্রযুক্তিগত ও আর্থিক সহযোগিতার সম্ভাবনা আগেও আলোচনায় এসেছে। সব মিলিয়ে তিস্তা চুক্তির ভবিষ্যৎ এখন আর শুধু ঢাকা–দিল্লি আলোচনায় সীমাবদ্ধ নেই— এটি ধীরে ধীরে একটি বৃহত্তর আঞ্চলিক ভূরাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত হচ্ছে। তবে তিস্তা ইস্যুতে নতুন রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্ভাবনার দরজা খুললেও, বাস্তব সমাধান এখনো নির্ভর করছে কূটনৈতিক সমঝোতা, প্রযুক্তিগত পরিকল্পনা এবং দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতার ওপর।
এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ও পরিবেশ বিজ্ঞানী ড. মোহাম্মদ আবদুর রব দৈনিক এদিনকে বলেন, “আমরা পারস্পরিক সমতা ও ন্যায়পরায়ণতার ভিত্তিতে পানির শেয়ারিং চাই। কিন্তু তিস্তার পানি বণ্টন বিষয়টি শুধু ভারতের রাজ্য নয় কেন্দ্রীয় সরকারেরও বিষয়। এতদিন কেন্দ্রীয় সরকার নমনীয় হলেও রাজ্য সরকার চায়নি বলে থমকে আছে। এখন সেখানে পরিবর্তন হয়েছে। তবে এখনো যে রাতারাতি কিছু হয়ে যাবে এমনটা আশা করা যায় না। কারণ, এখনো ভারতে যারা ক্ষমতায় আছে তাদের কতাবার্তায় বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে যায় না। তারা এখনো বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মতো ফাঁসির আসামিকে আশ্রয় দিচ্ছে। তাই তিস্তা নিয়ে যেসব ম্যাকানিজম থাকা দরকার বাংলাদেশ সরকারকে সেটা বুঝতে হবে। না হলে হবে বলে মনে হয় না।’’
জানা গেছে, তিস্তা নদীর পানি বণ্টন চুক্তি ২০১১ সাল থেকে ঝুলে আছে। মূল জটিলতা তৈরি হয়েছে ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সমন্বয় ও রাজ্য সরকারের আপত্তির কারণে। বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি বারবার শুষ্ক মৌসুমে নিজের রাজ্যের পানির প্রয়োজনের কথা উল্লেখ করে চুক্তির বিরোধিতা করে আসছেন। ফলে কেন্দ্রীয় সরকার বারবার উদ্যোগ নিলেও চূড়ান্ত স্বাক্ষর সম্ভব হয়নি। যদিও বাংলাদেশের পক্ষ থেকে দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পানি হিস্যার দাবি অব্যাহত রয়েছে, তবে এখনো কোনো স্থায়ী সমাধান আসেনি।
এর ফলে বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের কৃষি, পরিবেশ ও জীবিকা এই নদীর ওপর সরাসরি নির্ভরশীল হলেও এখনো কোনো স্থায়ী সমাধান আসেনি। ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক জটিলতা, বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের অবস্থান, এই চুক্তির প্রধান বাধা হিসেবে কাজ করেছে। চুক্তিতে উল্লেখ ছিল, ভারত পাবে ৪২.৫ শতাংশ এবং বাংলাদেশ পাবে ৩৭.৫ শতাংশ পানি। তবে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় রাজ্যের স্বার্থের কথা তুলে ধরে এতে তীব্র আপত্তি জানান। এরপর নানা চেষ্টা সত্ত্বেও আলোচনা থমকে যায় এবং চুক্তিটি আর বাস্তবায়নের পথে এগোয়নি। তবে সম্প্রতি ভারতের বিধানসভার নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নতুন আশার সঞ্চার করেছে বাংলাদেশকে। এ নির্বাচনে মমতার দল তৃণমূল কংগ্রেসের ভরাডুবির প্রেক্ষাপটে তিস্তা নদীর পানি বণ্টন নিয়ে নতুন করে আশাবাদ তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশের কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, পশ্চিমবঙ্গে কংগ্রেসের পরাজয়ের কারণে চুক্তির পথে বড় কোনো বাধা আর নেই। তারা বলছেন, কেন্দ্রীয় সরকার আন্তরিক হলে চুক্তিটি সম্পন্ন হওয়া সম্ভব। কারণ, তিস্তা নদীর পানি বণ্টন ও উন্নয়ন ইস্যুতে নতুন করে অগ্রগতির সম্ভাবনার আলোচনা শুরু হয়েছে।
সূত্র জানায়, হিমালয়ের সিকিমের হিমবাহ থেকে উৎপন্ন তিস্তা নদীর দৈর্ঘ্য ৪১৪ কিলোমিটার। এর মধ্যে ৩০৫ কিলোমিটার ভারতের ভেতরে এবং ১১৫ কিলোমিটার বাংলাদেশ দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গ অতিক্রম করে বাংলাদেশে প্রবেশ করা এই নদীর পানির ওপর দুই দেশের কোটি কোটি মানুষের জীবন-জীবিকা নির্ভরশীল। ভারতের প্রায় ৯ লাখ ২২ হাজার হেক্টর এবং বাংলাদেশের ৭ লাখ ৫০ হাজার হেক্টর জমির সেচ এই নদীর পানির ওপর নির্ভর করে। শুষ্ক মৌসুমে ভারতের গজলডোবা বাঁধে পানি আটকে রাখার কারণে নদীতে পানির প্রবাহ কমে যায় এবং কৃষিকাজ ব্যাহত হয়। একই সঙ্গে ওই অঞ্চলের ভূগর্ভস্থ পানির স্তরও নিচে নেমে যায়। আন্তর্জাতিক খাদ্যনীতি গবেষণা ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, এর ফলে বছরে প্রায় ১৫ লাখ টন ধান উৎপাদন কমে যায়। অন্যদিকে বর্ষা মৌসুমে তিস্তার প্রবল স্রোত দুই কূল উপচে পড়ে এবং লাখো মানুষ গৃহহীন হয়ে পড়ে। এতে বছরে প্রায় ১ লাখ কোটি টাকার ক্ষতি হয়।
মূলত ১৯৪৭ সালের দেশভাগের সময় থেকেই তিস্তা নদীর পানি বণ্টন নিয়ে বিরোধ তৈরি হয়। নদীর উৎপত্তি ভারতে হওয়ায় এই ইস্যু জটিল হয়ে ওঠে। সমস্যা সমাধানের জন্য ১৯৭২ সালে ভারত-বাংলাদেশ যৌথ নদী কমিশন গঠন করা হয়। কমিশনের প্রায় প্রতিটি বৈঠকে তিস্তা ইস্যু থাকলেও এখনো চূড়ান্ত সমাধান আসেনি। যদিও ১৯৯৬ সালে গঙ্গা চুক্তি সম্পন্ন হয়েছিল। ১৯৮৩ সালের একটি অস্থায়ী চুক্তি অনুযায়ী ভারত পেত ৩৯ শতাংশ এবং বাংলাদেশ পেত ৩৬ শতাংশ পানি। অবশিষ্ট ২৫ শতাংশ অনির্ধারিত ছিল।
বাংলাদেশ ৫০ শতাংশ পানি দাবি করেছিল, কিন্তু সেই চুক্তি পূর্ণভাবে কার্যকর হয়নি। সর্বশেষ ২০১১ সালে প্রস্তাবিত একটি চুক্তিতে ভারতকে ৪২.৫ শতাংশ ও বাংলাদেশকে ৩৭.৫ শতাংশ পানি দেওয়ার কথা থাকলেও পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তীব্র আপত্তিতে তা থমকে যায়। ওই সময় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ড. মনমোহন সিংয়ের সফরসঙ্গী হিসেবে নাম ঘোষণার পর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বাংলাদেশ সফর বাতিল করেন। তিস্তা চুক্তিতে তার সমর্থন না থাকাই ছিল এই সিদ্ধান্তের কারণ।
জানতে চাইলে সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সি ফয়েজ আহমেদ এদিনকে বলেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ক্ষমতায় না থাকলেই চুক্তি হয়ে যাবে— এমন ধারণা সঠিক নয়। তিনি বলেন, বাংলাদেশের পক্ষ থেকে উদ্যোগ নিতে হবে এবং অনুকূল পরিবেশ তৈরি করতে হবে। তার মতে, বর্তমানে দুই দেশের সম্পর্ক খুব ভালো অবস্থায় না থাকলেও আগের তুলনায় কিছুটা উন্নতির দিকে রয়েছে। তিনি মনে করেন, উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদলের সফর বিনিময়ের মাধ্যমে বিষয়টি আলোচনায় আনতে হবে এবং এরপর গুরুত্বের সঙ্গে সমাধানের পথে এগোতে হবে।
এদিকে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম বলেন, পশ্চিমবঙ্গে যে দলই ক্ষমতায় থাকুক, বাংলাদেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে এর প্রভাব পড়বে না। তিনি জানান, বাংলাদেশ নিজের স্বার্থ অক্ষুণ্ণ রেখে গঙ্গা ও তিস্তা চুক্তি নিয়ে আলোচনা চালিয়ে যাবে।
এদিকে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে মমতার দল তৃণমূল কংগ্রেসের ভরাডুবির প্রেক্ষাপটে তিস্তা নদীর পানি বণ্টন নিয়ে নতুন করে আশাবাদ তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশের কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, পশ্চিমবঙ্গে কংগ্রেসের পরাজয়ের কারণে চুক্তির পথে বড় কোনো বাধা আর নেই। তারা বলছেন, কেন্দ্রীয় সরকার আন্তরিক হলে চুক্তিটি সম্পন্ন হওয়া সম্ভব।
তারা বলছেন, যদি পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক সমীকরণে পরিবর্তন স্থায়ী হয়, তাহলে কেন্দ্রীয় সরকারের জন্য আলোচনার পথ সহজ হতে পারে। স্থগিত চুক্তি আবার সক্রিয় হওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে। বাংলাদেশ–ভারত পানি কূটনীতিতে নতুন অধ্যায় শুরু হতে পারে। তবে তারা সতর্ক করছেন—এটি কোনো স্বয়ংক্রিয় সমাধান নয়। কারণ, তিস্তা ইস্যুতে নতুন রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্ভাবনার দরজা খুললেও, বাস্তব সমাধান এখনো নির্ভর করছে কূটনৈতিক সমঝোতা, প্রযুক্তিগত পরিকল্পনা এবং দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতার ওপর।
এমতাবস্থায় তিস্তা চুক্তিটি অনিশ্চিত থাকায় বাংলাদেশ সরকার তিস্তা অববাহিকা ব্যবস্থাপনায় “মাস্টার প্ল্যান’’ নামে একটি বৃহৎ উন্নয়ন পরিকল্পনা এগিয়ে নিচ্ছে। এই পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য হলো, নদীর পানি সংরক্ষণ ও সঠিক বণ্টন, শুষ্ক মৌসুমে সেচ নিশ্চিত করা, বন্যা নিয়ন্ত্রণ, নদীভাঙন রোধ ও কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি করা। এ ছাড়া পরিকল্পনার আওতায় বাঁধ নির্মাণ, খাল পুনঃখনন, রেগুলেটর স্থাপন এবং পানি নিয়ন্ত্রণ অবকাঠামো উন্নয়নের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
এ অবস্থায় বাংলাদেশের নতুন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান তিন দিনের সরকারি সফরে আজ চীন পৌঁছার কথা রয়েছে। তার এ সফরকে ঘিরে দক্ষিণ এশিয়ার কূটনৈতিক মহলে নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে। কারণ, এ সফরে তিস্তা নিয়ে আলোচনার চাপ বৃদ্ধি পেতে পারে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, সফরকালে ড. খলিলুর রহমান ওয়াং ই’র সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করবেন। বৈঠকে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের সামগ্রিক ক্ষেত্র, পারস্পরিক স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয় এবং আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের পরিবর্তিত পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।







আপনার মতামত লিখুন
Array