বিশ্বকাপে শেষবার ইংল্যান্ডকে ‘হাতের গোলে’ হারিয়েছিলেন ম্যারাডোনা

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশিত: সোমবার, ১৩ জুলাই, ২০২৬, ২:৫০ অপরাহ্ণ
বিশ্বকাপে শেষবার ইংল্যান্ডকে ‘হাতের গোলে’ হারিয়েছিলেন ম্যারাডোনা

ম্যারাডোনার ‘হ্যান্ড অফ গড’, ডেভিড বেকহ্যামের বিতর্কিত লাল কার্ড এবং ২০০২ বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের প্রতিশোধ-বিশ্বকাপ ইতিহাসে ইংল্যান্ড ও আর্জেন্টিনার দ্বৈরথ উপহার দিয়েছে অসংখ্য স্মরণীয় মুহূর্ত। সেই ঐতিহাসিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা আবারও ফিরছে বিশ্বমঞ্চে। এবার ফাইনালে ওঠার লড়াইয়ে মুখোমুখি হতে যাচ্ছে দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী, যা ফুটবলপ্রেমীদের মধ্যে নতুন করে উত্তেজনা ও রোমাঞ্চ ছড়িয়ে দিয়েছে।

উত্তর আমেরিকা বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে সুইজারল্যান্ডকে ৩-১ গোলে পরাজিত করে সেমিফাইনাল নিশ্চিত করেছে আর্জেন্টিনা। এরপরই সম্ভাব্য ইংল্যান্ড-আর্জেন্টিনা মহারণ নিয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ‘বিবিসি’। তাদের ভাষায়, ‘আটলান্টায় দেখা হচ্ছে আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ডের।’

যুক্তরাষ্ট্রের কানসাস সিটি স্টেডিয়ামে অতিরিক্ত সময়ের এক স্নায়ুক্ষয়ী লড়াই শেষে সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে জয় নিশ্চিত করে আর্জেন্টিনা। এর মাধ্যমেই সেমিফাইনালের মঞ্চ প্রস্তুত হয়। ম্যাচের প্রথমার্ধের দশম মিনিটে লিওনেল মেসির কর্নার থেকে দুর্দান্ত হেডে গোল করে আর্জেন্টিনাকে এগিয়ে নেন আলেক্সিস মাক আলিস্তার। দ্বিতীয়ার্ধের ২২তম মিনিটে ড্যান এনদোয়ের গোলে সুইজারল্যান্ড সমতায় ফিরলেও অতিরিক্ত সময়ে হুলিয়ান আলভারেস এবং লাউতারো মার্তিনেসের টানা দুই গোলে জয় ছিনিয়ে নেয় আলবিসেলেস্তেরা।

এর আগে নরওয়েকে ২-১ গোলে হারিয়ে সেমিফাইনাল নিশ্চিত করে ইংল্যান্ড। পিছিয়ে পড়া ইংল্যান্ডকে নির্ধারিত সময়ের শেষ মুহূর্তে গোল করে ম্যাচে ফেরান জুড বেলিংহ্যাম এবং অতিরিক্ত সময়ে তার গোলেই জয় নিশ্চিত হয় ইংলিশদের।

দীর্ঘ ২১ বছর পর আন্তর্জাতিক ফুটবলে আবারও মুখোমুখি হচ্ছে ইংল্যান্ড ও আর্জেন্টিনা। সর্বশেষ ২০০৫ সালের নভেম্বরে সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় অনুষ্ঠিত একটি প্রীতি ম্যাচে দেখা হয়েছিল দুই দলের। রোমাঞ্চকর সেই লড়াইয়ে মাইকেল ওয়েনের শেষ মুহূর্তের জোড়া গোলে ৩-২ ব্যবধানে জয় পেয়েছিল ইংল্যান্ড।

বিশ্বকাপের মঞ্চে এই দুই দলের দ্বৈরথ ফিরছে দীর্ঘ ২৪ বছর পর। সবশেষ ২০০২ সালের কোরিয়া-জাপান বিশ্বকাপে একে অপরের মুখোমুখি হয়েছিল তারা।

ইংল্যান্ড ও আর্জেন্টিনার প্রতিদ্বন্দ্বিতা কেবল মাঠের লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ নয়। রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক বৈরিতা এবং বিশ্বকাপের নাটকীয় সব ঘটনা এই দ্বৈরথকে ফুটবল বিশ্বের অন্যতম আইকনিক লড়াইয়ে পরিণত করেছে।

তাদের সবচেয়ে আলোচিত লড়াই ছিল ১৯৮৬ সালের মেক্সিকো বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনাল। গোলরক্ষক পিটার শিলটনকে ফাঁকি দিয়ে হাত দিয়ে গোল করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছিলেন দিয়েগো ম্যারাডোনা, যা ইতিহাসে ‘হ্যান্ড অফ গড’ নামে পরিচিত। এর চার মিনিট পরই তিনি শতাব্দীর সেরা গোলটি করেন। ইংল্যান্ডের হয়ে গ্যারি লিনেকার এক গোল শোধ করলেও আর্জেন্টিনা ২-১ ব্যবধানে জিতে শেষ পর্যন্ত শিরোপা ঘরে তোলে।

১২ বছর পর ১৯৯৮ সালের ফ্রান্স বিশ্বকাপে আবারও দেখা যায় এক চরম নাটকীয়তা। শেষ ষোলোর লড়াইয়ে দিয়েগো সিমিওনেকে লাথি মেরে লাল কার্ড পান ইংল্যান্ডের পোস্টার বয় ডেভিড বেকহ্যাম। ১০ জনের ইংল্যান্ড ২-২ সমতা বজায় রাখলেও টাইব্রেকারে ৪-৩ ব্যবধানে হেরে যায়। হারের সব দায় চাপে ২৩ বছর বয়সী বেকহ্যামের ওপর, দেশজুড়ে তার কুশপুত্তলিকা দাহ করা হয়েছিল। তবে চার বছর পর ২০০২ বিশ্বকাপে বেকহ্যাম তার সেই অপমানের প্রতিশোধ নেন। গ্রুপ পর্বের ম্যাচে পেনাল্টি থেকে গোল করে ১-০ ব্যবধানে ইংল্যান্ডকে জেতান তিনি। সেই হারে আসরের অন্যতম ফেবারিট আর্জেন্টিনা গ্রুপ পর্ব থেকেই ছিটকে যায়।

এরপর দীর্ঘ ২০ বছরের বেশি সময় পার হয়ে গেছে, বিশ্বকাপের গুরুত্বপূর্ণ কোনো ধাপে তাদের আর দেখা হয়নি। এখন ফাইনালের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে একে অপর। ২০২২ কাতার বিশ্বকাপের পর টানা দ্বিতীয় শিরোপার লক্ষ্যে ছুটছে আর্জেন্টিনা। আর মেসির জন্য এটিই শেষ বিশ্বকাপ, তাই টানা দ্বিতীয় এবং ক্যারিয়ারের চতুর্থ ফাইনাল খেলার স্বপ্ন নিয়ে নামবেন এই জাদুকর।

অন্যদিকে ইংল্যান্ড লড়ছে দীর্ঘ ৬০ বছরের আক্ষেপ ঘোচাতে। ১৯৬৬ সালের পর তারা আর বিশ্বকাপ জেতেনি। ২০১৮ সালে সেমিফাইনালে উঠলেও ক্রোয়েশিয়ার কাছে হেরে ফাইনালের স্বপ্ন ভেঙেছিল তাদের।

নকআউট পর্বে দুই দলকেই বেশ কঠিন পথ পাড়ি দিতে হয়েছে। মেক্সিকো ও নরওয়ের বিপক্ষে পিছিয়ে থেকেও জয় পায় ইংল্যান্ড। অন্যদিকে মিশরের বিপক্ষে ২-০ তে পিছিয়ে থেকে অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তন ঘটায় আর্জেন্টিনা এবং সুইজারল্যান্ডকে হারাতে তাদের অতিরিক্ত সময় পর্যন্ত লড়তে হয়।

আর্জেন্টিনা সেমিফাইনাল নিশ্চিত করার পর বিবিসির ধারাভাষ্যকার ক্রিস সাটন উচ্ছ্বসিত হয়ে বলেন, ‘আটলান্টায় ইংল্যান্ড ও আর্জেন্টিনা মুখোমুখি হচ্ছে। কী চমৎকার ও রোমাঞ্চকর এক লড়াই হতে যাচ্ছে এটি!’

৮৬ তে ছিল ম্যারাডোনার হাত, ৯৮ তে বেকহ্যামের লাল কার্ড আর ২০০২ তে বেকহ্যামের পেনাল্টি প্রতিশোধ। দীর্ঘ ২৪ বছর পর এবার আটলান্টায় নতুন এক ইতিহাস লিখতে যাচ্ছে ফুটবল বিশ্বের এই দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী।