নভেম্বরের পরের বাংলাদেশ: কৃষির খাতায় জিয়ার হিসাব
৭ নভেম্বর ১৯৭৫ বাংলাদেশের রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ভিন্ন ভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শ থেকে দিবসটিকে ভিন্নভাবে উপস্থাপন করা হয়। সেদিন কে কী করেছিলেন, কে দায়ী, কে নায়ক, কার ভূমিকা কতটুকু, সেদিন কী হলে কী হতে পারত, এসব নিয়ে রাজনৈতিক পক্ষগুলোর নিজস্ব ব্যাখ্যা আছে। সেই ব্যাখ্যা নিয়ে বহু বছর ধরে তর্ক-বিতর্কও চলছে। আমি সেই দিকে যাব না। আজ আমি ৭ নভেম্বরের পরিণতিতে তৈরি হওয়া একটি সুনির্দিষ্ট বাস্তবতার দিকে তাকাতে চাই।
সেদিন জিয়াউর রহমান বেঁচে গিয়েছিলেন। পরে তিনি বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রে আসেন এবং তারও পরে রাষ্ট্র পরিচালনার সুযোগ পান। তিনি সেদিন বেঁচে না থাকলে বাংলাদেশের ইতিহাস কোন দিকে যেত, সেই আলোচনা সম্পূর্ণ হাইপোথেটিক্যাল। বাস্তবতা হলো, তিনি বেঁচে ছিলেন, রাষ্ট্র পরিচালনা করেছেন, আর তাঁর শাসনামলে কৃষি ও খাদ্য উৎপাদন নিয়ে বেশ কিছু নীতি ও কর্মসূচি নেওয়া হয়েছিল।
ছোটবেলায় শুনেছি, তাঁর শাসনামলে নাকি সরকারি কর্মকর্তারা ছুটির দিনে নিজের বাড়ির ছোট পুকুর পরিষ্কার করে মাছ চাষ করতে বাধ্য হতেন। এসব রোমাঞ্চকর গল্পের চেয়ে আমি বরং তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতেই দেখার চেষ্টা করব। ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষের অভিজ্ঞতা পেরিয়ে একটি খাদ্যসংকটাপন্ন দেশকে খাদ্য উৎপাদনে সক্ষম করে তোলার যে দীর্ঘ যাত্রা, সেখানে তাঁর সরকারের ভূমিকা কী ছিল?
দুর্ভিক্ষের অভিজ্ঞতা থেকে খাদ্য উৎপাদনের নতুন বাস্তবতা
১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষ বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি গভীর ক্ষত। তবে দুর্ভিক্ষের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য মনে রাখা দরকার। ওই বছর জাতীয় পর্যায়ে চালের উৎপাদন আগের বছরের তুলনায় কমেনি। বরং আমর্ত্য সেনের গবেষণায় সংকলিত তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭৩ সালে চালের উৎপাদন ছিল প্রায় ১০ দশমিক ৪৬ মিলিয়ন টন, আর ১৯৭৪ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ১১ দশমিক ৭৮ মিলিয়ন টনে। একই গবেষণায় দেখা যায়, ১৯৭৪ সালে মাথাপিছু খাদ্যশস্যের সামগ্রিক প্রাপ্যতাও আগের কয়েক বছরের তুলনায় বেশি ছিল।
তাহলে দুর্ভিক্ষ হলো কেন?
এখানেই খাদ্য উৎপাদন ও খাদ্য নিরাপত্তার পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। জাতীয় পর্যায়ে খাদ্য থাকলেই প্রত্যেক মানুষের খাবার কেনার সামর্থ্য থাকে না। বন্যা, কর্মসংস্থান হারানো, কৃষিশ্রমিকের মজুরি কমে যাওয়া, খাদ্যের মূল্যবৃদ্ধি এবং খাদ্য বিতরণব্যবস্থার দুর্বলতা মানুষের খাদ্যপ্রাপ্তির অধিকারকে সংকুচিত করেছিল। অর্থাৎ খাদ্যের মোট পরিমাণের পাশাপাশি মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ও খাদ্যে প্রবেশাধিকারও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
এই অভিজ্ঞতার পর ১৯৭৫-পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের কৃষি ও খাদ্যনীতিতে উৎপাদন বাড়ানো, সেচ সম্প্রসারণ, উন্নত বীজের ব্যবহার, সার সরবরাহ এবং খাদ্যশস্যের উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়গুলো আরও গুরুত্ব পায়।
ষাটের দশকে বাংলাদেশের কৃষির যে ভিত্তি তৈরি হয়েছিল, স্বাধীনতার পর যে পুনর্গঠন শুরু হয়েছিল, কৃষকদের শ্রম, কৃষি গবেষকদের কাজ এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার যে ধারা, সেটাকে জিয়া বেশ বড় ধরনের গতি দিতে পেরেছিলেন। কারণ ৭ নভেম্বর ১৯৭৫ সালে জিয়াউর রহমান সব ষড়যন্ত্র এড়িয়ে বেঁচে গিয়েছিলেন।
তবে ঢালাওভাবে এটাও বলা যাবে না যে, এই যাত্রা জিয়াউর রহমানের সময় থেকেই শুরু হয়েছে। স্বাধীনতার আগে থেকেই কৃষি পুনর্গঠন এবং খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধির চেষ্টা চলছিল। ষাটের দশকে শুরু হওয়া উচ্চফলনশীল জাত ও আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির ব্যবহারও স্বাধীনতার পর অব্যাহত ছিল। কাজেই ১৯৭৫ সালের পরের অগ্রগতি বুঝতে হলে আগের ভিত্তিটিও বিবেচনায় নিতে হবে।
খাদ্য উৎপাদন দ্বিগুণ করার লক্ষ্য
জিয়াউর রহমানের সরকারের কৃষিভাবনার একটি উল্লেখযোগ্য দিক ছিল খাদ্য উৎপাদন দ্বিগুণ করার কর্মসূচি।
১৯৭৭-৭৮ সালের প্রায় ১৩ দশমিক ২ মিলিয়ন টন খাদ্যশস্য উৎপাদনকে ভিত্তি ধরে ১৯৮৪-৮৫ সালের মধ্যে উৎপাদন ২৬ মিলিয়ন টনে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। এই কর্মসূচিতে সেচ ও নিষ্কাশনব্যবস্থার উন্নয়ন, বন্যা নিয়ন্ত্রণ, সার ব্যবহার, উন্নত বীজ, রোগবালাই নিয়ন্ত্রণ এবং কৃষি উৎপাদনে জনগণের অংশগ্রহণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট করা দরকার। ২৬ মিলিয়ন টনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল, কিন্তু জিয়াউর রহমানের জীবদ্দশায় সেই লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয়নি। তাঁর মৃত্যুর পরও কর্মসূচিটির সময়সীমা ছিল। তাই লক্ষ্য নির্ধারণকে অর্জন হিসেবে দেখানোর সুযোগ হয়তো নেই। তবে খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধিকে রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকারে নিয়ে আসা এবং সেচ, বীজ, সার ও কৃষি প্রযুক্তিকে একই পরিকল্পনার মধ্যে বিবেচনা করা তাঁর সরকারের কৃষিনীতি মূল্যায়নের গুরুত্বপূর্ণ জায়গা। তাই দূরদর্শিতার যে ব্যাপারটা জিয়াউর রহমান তাঁর স্বল্প মেয়াদে দেখিয়েছিলেন, সেটা অস্বীকার করার সুযোগ কি আছে?
কৃষি গবেষণা ও প্রযুক্তির প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি
কৃষির উন্নয়ন কেবল কৃষককে বেশি সার দেওয়া কিংবা বেশি জমিতে চাষ করানোর বিষয় নয়। এর সঙ্গে গবেষণা, বীজের মান, রোগবালাই নিয়ন্ত্রণ, মাটির গুণাগুণ এবং পানির বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনা সরাসরি জড়িত।
এই জায়গায় জিয়াউর রহমানের পৃষ্ঠপোষকতায় একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ হলো বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা। ১৯৭৬ সালের ৪ আগস্ট বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট অধ্যাদেশ জারি হয়। এর উদ্দেশ্যের মধ্যে ছিল জমি ও পানির বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনা, উন্নত ফসলের জাত উদ্ভাবন এবং কৃষিপণ্যের রোগবালাই নিয়ন্ত্রণে গবেষণা।
একই সঙ্গে ১৯৭৬ সালে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের কাঠামো সংশোধন করা হয়, যাতে দেশের কৃষি গবেষণা কার্যক্রমের সমন্বয় ও ব্যবস্থাপনা আরও কার্যকর হয়।
১৯৭৭ সালের ১৯ জুলাই বীজ অধ্যাদেশ জারি করা হয়। বিক্রির জন্য নির্দিষ্ট বীজের গুণগত মান নিয়ন্ত্রণ এবং বীজ সরবরাহের ক্ষেত্রে একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো তৈরির জন্য এই আইন গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
সেচব্যবস্থা: কৃষি উৎপাদনের বড় পরিবর্তন
বাংলাদেশের কৃষিতে সেচের গুরুত্ব নিয়ে নতুন করে বলার কিছু নেই। বিশেষ করে শুষ্ক মৌসুমে জমি আবাদযোগ্য রাখতে সেচের বিকল্প নেই।
সত্তরের দশকের শেষ দিকে বাংলাদেশের সেচনীতিতে একটি উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসে। ১৯৭৮-৭৯ সাল থেকে গভীর নলকূপ ও অন্যান্য সেচযন্ত্র ব্যবস্থাপনায় সরকারি মালিকানা ও সমবায়ভিত্তিক পরিচালনার পাশাপাশি বেসরকারি অংশগ্রহণের সুযোগ বাড়ানো শুরু হয়।
১৯৭৯ সালে সেচযন্ত্রের মালিকানা বেসরকারি ব্যক্তি ও কৃষকগোষ্ঠীর হাতে হস্তান্তরের নীতি নেওয়া হয়। এর উদ্দেশ্য ছিল সেচযন্ত্রের ব্যবহার বাড়ানো, রক্ষণাবেক্ষণ উন্নত করা এবং সেচের আওতা সম্প্রসারণ করা।
এই নীতির অর্থনৈতিক গুরুত্ব ছিল। সরকারি ব্যবস্থাপনায় থাকা যন্ত্রপাতি অনেক ক্ষেত্রে পূর্ণ সক্ষমতায় ব্যবহার করা যাচ্ছিল না। আর আমরা আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার না করলেও মনে মনে সবাই জানি, সরকারি কাজে লাল ফিতার ভূমিকা কী। অথচ কৃষির ক্ষেত্রে সময় খুব জরুরি।
হ্যাঁ, সেচের বেসরকারিকরণকে এককভাবে জিয়ার ব্যক্তিগত আবিষ্কার বলা যাবে না। এটি ছিল কৃষি উপকরণ ব্যবস্থাপনায় বৃহত্তর নীতিগত পরিবর্তনের অংশ। এর পরবর্তী বিস্তার আশির দশকের প্রথমার্ধেও অব্যাহত ছিল। এই যে নীতিগত পরিবর্তন এবং তার সুফল পাওয়ার দূরদর্শিতা, সেটাকেও নিশ্চয়ই অস্বীকার করা যাবে না।
এই পরিবর্তনের ফল বোঝার জন্য ১৯৭৮ সালের সেচের আওতা এবং আশির দশকের পরবর্তী সময়ের সেচের আওতা তুলনা করা জরুরি। একটা নীতিমালার সুফল তো পরের দিন হুট করে আসে না। কেউ একজন শুরু করেন, একটা নির্দিষ্ট সময় পর গিয়ে তার প্রভাব দেখা যায়। জিয়া সেই শুরুটা করেছিলেন।
গম উৎপাদনে একটি উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন
বাংলাদেশের খাদ্যাভ্যাস ঐতিহাসিকভাবে চালনির্ভর। কিন্তু খাদ্য নিরাপত্তার ক্ষেত্রে গম উৎপাদনও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল।
১৯৭৪-৭৫ অর্থবছরে বাংলাদেশের গম উৎপাদন ছিল প্রায় ১ লাখ ১৬ হাজার টন। ১৯৮০-৮১ অর্থবছরে তা বেড়ে প্রায় ১০ লাখ ৯৩ হাজার টনে পৌঁছায়। একই সময়ে গমের আবাদি জমি ১ লাখ ৫ হাজার হেক্টর থেকে বেড়ে ৫ লাখ ৯১ হাজার হেক্টর হয়।
অর্থাৎ কয়েক বছরের মধ্যে গম উৎপাদন প্রায় ৯ গুণের বেশি বেড়েছে।
এটি বাংলাদেশের কৃষির একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন। তবে এই উৎপাদন বৃদ্ধির পেছনে আন্তর্জাতিক গবেষণা, মেক্সিকান গমের জাত, সিআইএমএমওয়াইটি-এর প্রযুক্তিগত ভূমিকা এবং কৃষকদের নতুন ফসল গ্রহণের বিষয়গুলোও আছে। গম চাষের সূচনা জিয়ার আমলে হয়নি; ষাটের দশক থেকেই এর ভিত্তি তৈরি হয়েছিল। তবে জিয়ার সরকারের মূল্যায়নের জায়গা হলো, সেই চলমান প্রক্রিয়াকে খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধির বৃহত্তর কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত করা এবং গম উৎপাদনের বিস্তার অব্যাহত রাখা।
খাদ্য উৎপাদনের পরিসংখ্যান কী বলছে?
এবার একটু সামগ্রিক চিত্র দেখা যাক।
অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেসে প্রকাশিত বাংলাদেশের খাদ্য সমস্যাবিষয়ক গবেষণায় সংকলিত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশের খাদ্যশস্য উৎপাদনের বার্ষিক গড় ছিল এ রকম: ১৯৭২-৭৩ থেকে ১৯৭৭-৭৮ সময়কালে ১০ দশমিক ৩৮ মিলিয়ন টন, ১৯৭৭-৭৮ থেকে ১৯৮০-৮১ সময়কালে ১২ দশমিক ২২ মিলিয়ন টন এবং ১৯৮১-৮২ থেকে ১৯৮৪-৮৫ সময়কালে ১৩ দশমিক ৭০ মিলিয়ন টন।
প্রথম দুই সময়কালের তুলনায় খাদ্যশস্য উৎপাদনের বার্ষিক গড় প্রায় ১৭ দশমিক ৭ শতাংশ বেড়েছে। পরবর্তী সময়েও উৎপাদন বৃদ্ধির ধারা অব্যাহত ছিল।
কিন্তু একই গবেষণার মাথাপিছু খাদ্যপ্রাপ্যতার হিসাব দেখলে আরেকটি বিষয় সামনে আসে। মাথাপিছু দৈনিক খাদ্যপ্রাপ্যতা ১৯৭২-৭৩ থেকে ১৯৭৭-৭৮ সময়কালে ছিল শূন্য দশমিক ৯৪৮ পাউন্ড, ১৯৭৭-৭৮ থেকে ১৯৮০-৮১ সময়কালে শূন্য দশমিক ৯৫৮ পাউন্ড এবং ১৯৮১-৮২ থেকে ১৯৮৪-৮৫ সময়কালে ১ দশমিক শূন্য শূন্য ৮ পাউন্ড।
এখানে উৎপাদন বৃদ্ধির তুলনায় মাথাপিছু খাদ্যপ্রাপ্যতার বৃদ্ধি কম মনে হবে। কিন্তু জনসংখ্যা বৃদ্ধির বিষয়টি বিবেচনায় নিলে উৎপাদনের সাফল্যকে আরও ভালোভাবে বোঝা যাবে।
এটাই তথ্যনির্ভর আলোচনার সৌন্দর্য। শুধু উৎপাদন বাড়ার সংখ্যা দেখিয়ে খাদ্যে স্বনির্ভরতার দাবি করা যাবে না। খাদ্য আমদানি, জনসংখ্যা, মাথাপিছু প্রাপ্যতা, খাদ্যের দাম এবং মানুষের ক্রয়ক্ষমতাও দেখতে হবে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ১৯৭৮-৭৯ সালের খরা। ওই সময়ে খাদ্য উৎপাদনে ধাক্কা এসেছিল এবং নতুন করে খাদ্যসংকটের আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল। বিশ্বব্যাংকের ঐতিহাসিক পর্যালোচনায় বলা হয়েছে, ১৯৭৭-৭৮ সালে ভালো ফসল ও সরকারি খাদ্য সংগ্রহের কারণে যে খাদ্য মজুত গড়ে উঠেছিল, তা পরবর্তী খরা পরিস্থিতি মোকাবিলা সহজ করেছিল। এর ফলেই আরেকটি ‘৭৪’ আমরা দেখিনি।
জিয়ার আমলে খাদ্য উৎপাদন বেড়েছিল, কিন্তু বাংলাদেশ তখনো প্রকৃত অর্থে খাদ্য আমদানিনির্ভরতা থেকে বেরিয়ে আসেনি। খাদ্যে স্বনির্ভরতা অর্জনের যাত্রা ছিল দীর্ঘ। জিয়া সেই দীর্ঘ যাত্রার প্রস্তুতি নিতে সচেষ্ট ছিলেন, সেটা স্বীকার করতেই হবে।
কৃষি থেকে উদ্বৃত্ত শ্রমশক্তি: বিদেশে কর্মসংস্থান ও গার্মেন্টস শিল্প
এখানে আমি কৃষির সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনীতির আরেকটি বড় পরিবর্তনের সম্পর্ক দেখতে চাই।
বাংলাদেশের অর্থনীতি দীর্ঘদিন কৃষিনির্ভর ছিল। কৃষির উৎপাদন পদ্ধতি, জমির পরিমাণ, মৌসুমি কর্মসংস্থান এবং প্রযুক্তির পরিবর্তনের সঙ্গে গ্রামীণ শ্রমবাজারেরও পরিবর্তন ঘটছিল।
কৃষিতে উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি অর্থনীতির অন্য খাতে কর্মসংস্থান তৈরির বিষয়টি তাই গুরুত্বপূর্ণ।
১৯৭৬ সালে জনশক্তি উন্নয়ন ও সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো প্রতিষ্ঠিত হয়। এর অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল বিদেশে কর্মসংস্থানের জন্য বাংলাদেশি শ্রমিক নিয়োগ ও প্রেরণের প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা তৈরি করা।
জনশক্তি রপ্তানির পরিসংখ্যানও উল্লেখযোগ্য। বিদেশে কর্মসংস্থানের জন্য যাওয়া শ্রমিকের সংখ্যা ১৯৭৬ সালে ছিল ৬ হাজার ৮৭ জন। ১৯৭৭ সালে তা হয় ১৫ হাজার ৭২৫ জন, ১৯৭৮ সালে ২২ হাজার ৮০৯ জন, ১৯৭৯ সালে ২৪ হাজার ৪৯৫ জন, ১৯৮০ সালে ৩০ হাজার ৭৩ জন এবং ১৯৮১ সালে ৫৫ হাজার ৭৮৭ জন।
ছয় বছরে বিদেশে কর্মসংস্থানের জন্য যাওয়া মানুষের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ১৯৭৬ থেকে ১৯৮১ সালের মধ্যে এই সংখ্যা প্রায় ৯ গুণ হয়েছে।
অন্যদিকে বাংলাদেশের গার্মেন্টস শিল্পের প্রাতিষ্ঠানিক যাত্রাও এই সময়ের ঘটনা।
১৯৭৭ সালের ২৭ ডিসেম্বর দেশ গার্মেন্টস প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৭৮ সালে দক্ষিণ কোরিয়ার দেউ-এর সঙ্গে তাদের প্রযুক্তিগত ও বাণিজ্যিক সহযোগিতার চুক্তি হয়। ১৩০ জন কর্মী ও ব্যবস্থাপনাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে দক্ষিণ কোরিয়ায় প্রশিক্ষণের জন্য পাঠানো হয়েছিল। ১৯৮০ সালের এপ্রিল মাসে দেশ গার্মেন্টসের উৎপাদন শুরু হয়। প্রথম পর্যায়ে সেখানে ৪৫০টি মেশিন ও প্রায় ৫০০ কর্মী কাজ করতেন।
জিয়ার আমলে খাদ্য উৎপাদন বেড়েছিল, কিন্তু বাংলাদেশ তখনো প্রকৃত অর্থে খাদ্য আমদানিনির্ভরতা থেকে বেরিয়ে আসেনি। খাদ্যে স্বনির্ভরতা অর্জনের যাত্রা ছিল দীর্ঘ। জিয়া সেই দীর্ঘ যাত্রার প্রস্তুতি নিতে সচেষ্ট ছিলেন, সেটা স্বীকার করতেই হবে।
এখানে দুটি অর্থনৈতিক পরিবর্তন পাশাপাশি ঘটছিল। একদিকে বিদেশে কর্মসংস্থানের জন্য শ্রমিক পাঠানোর প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা তৈরি হচ্ছিল, অন্যদিকে দেশে রপ্তানিমুখী শিল্পের নতুন ক্ষেত্র তৈরি হচ্ছিল।
যদিও এই দুই পরিবর্তনকে কৃষিতে উদ্বৃত্ত শ্রমের সরাসরি ফল বলা ঠিক হবে না। কারণ বিদেশে কর্মসংস্থান ও গার্মেন্টস শিল্পের বিকাশের পেছনে আন্তর্জাতিক শ্রমবাজার, বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদা, প্রযুক্তি হস্তান্তর, বাণিজ্যিক সুযোগ এবং উদ্যোক্তাদের উদ্যোগও কাজ করেছে।
তবে একটা প্রশ্ন তো করাই যায়: কৃষির আধুনিকায়ন কি গ্রামীণ শ্রমের উৎপাদনশীলতা বাড়িয়ে একই সঙ্গে কৃষির বাইরে শ্রম স্থানান্তরের সুযোগ তৈরি করেছিল?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে কৃষি শ্রমশক্তির অংশগ্রহণ, কৃষিতে নিয়োজিত মানুষের সংখ্যা এবং শিল্প ও বিদেশে কর্মসংস্থানের পরিসংখ্যান পাশাপাশি রেখে ব্যাপক বিশ্লেষণ করতে হবে। সেদিকে এখন যাচ্ছি না, তবে প্রশ্নটা তোলা থাকল। আমার মনে হয়, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক রূপান্তরের ইতিহাসে এই প্রশ্নটি যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ।
ভূমিহীন মানুষ, খাসজমি ও কৃষিতে অংশগ্রহণ
বাংলাদেশের কৃষির আরেকটি মৌলিক সমস্যা জমির অসম বণ্টন। দেশের বিপুলসংখ্যক মানুষের নিজের আবাদি জমি ছিল না। কেউ ভূমিহীন কৃষিশ্রমিক, কেউ বর্গাচাষি, আবার কেউ অন্যের জমিতে কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতেন।
জিয়াউর রহমানের আমলে ভূমিহীন ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে জমির সঙ্গে যুক্ত করার উদ্যোগের বিষয়টি তাই আলাদা করে দেখা দরকার।
বিশেষ করে পার্বত্য চট্টগ্রামে ১৯৭৯ সাল থেকে সমতলের ভূমিহীন পরিবারকে পুনর্বাসনের কর্মসূচি নেওয়া হয়েছিল। এর ঘোষিত উদ্দেশ্য ছিল ভূমিহীন মানুষকে জমি ও জীবিকার সুযোগ দেওয়া এবং কৃষি উৎপাদনে যুক্ত করা।
কিন্তু এই কর্মসূচির সঙ্গে সম্ভবত পার্বত্য অঞ্চলের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ভূমির অধিকার, জনসংখ্যাগত পরিবর্তন এবং সংঘাতের ইতিহাস জড়িয়ে আছে। কাজেই কেবল সরকারি পুনর্বাসনের উদ্দেশ্য দেখিয়ে এর সামগ্রিক ফলকে যেমন ইতিবাচক বলা যাবে না, তেমনি উৎপাদনমুখী পুনর্বাসনের বিষয়টি বাদ দিয়েও ইতিহাসের পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন সম্ভব নয়। তখনকার উত্তরবঙ্গের মঙ্গাপীড়িত জনগণের জন্য সেটা বেঁচে থাকার হাতিয়ার ছিল কি না, বা তাদের অন্য কোনোভাবে কৃষিভিত্তিক উৎপাদন কাঠামোতে আনা যেত কি না, সেই তর্ক খুবই হাইপোথেটিক্যাল।
তবে জিয়াউর রহমানের সময়ে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীকে উৎপাদনমুখী কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করা, খাল খননে স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণ, কৃষি সম্প্রসারণ এবং গ্রামীণ উন্নয়ন নিয়ে নানা উদ্যোগ ছিল।
ষাটের দশকে বাংলাদেশের কৃষির যে ভিত্তি তৈরি হয়েছিল, স্বাধীনতার পর যে পুনর্গঠন শুরু হয়েছিল, কৃষকদের শ্রম, কৃষি গবেষকদের কাজ এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার যে ধারা, সেটাকে জিয়া বেশ বড় ধরনের গতি দিতে পেরেছিলেন। কারণ ৭ নভেম্বর ১৯৭৫ সালে জিয়াউর রহমান সব ষড়যন্ত্র এড়িয়ে বেঁচে গিয়েছিলেন।
একটি হাইপোথেটিক্যাল প্রশ্ন রেখে লেখা শেষ করি। যদি জিয়াউর রহমান সেদিন শহীদ না হতেন এবং আরও কিছুদিন দেশ পরিচালনা করতে পারতেন, তাহলে কি বাংলাদেশ অন্য রকম হতে পারত?
• মূর্তজা খান লোদী: কৃষি গবেষক






আপনার মতামত লিখুন