যানজটমুক্ত ঈদযাত্রার বিকল্প নেই

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশিত: শুক্রবার, ২০ মার্চ, ২০২৬, ৮:৫৫ অপরাহ্ণ
যানজটমুক্ত ঈদযাত্রার বিকল্প নেই

ঈদ মানেই আনন্দ, মিলন আর শিকড়ের টানে ঘরে ফেরার অদম্য আকাঙ্ক্ষা। কিন্তু এই আনন্দযাত্রা যখন পরিণত হয় কয়েক ঘণ্টা বা কখনো কখনো কয়েক দিনের দুর্ভোগে, তখন সেটি আর শুধু একটি পরিবহন সমস্যা থাকে না—এটি হয়ে ওঠে রাষ্ট্রের সক্ষমতা, পরিকল্পনা ও জবাবদিহিতার এক বাস্তব পরীক্ষা। সাম্প্রতিক ঢাকা-টাঙ্গাইল-যমুনা সেতু মহাসড়কের পরিস্থিতি সেই পরীক্ষায় আমাদের সীমাবদ্ধতাকে আবারও সামনে এনে দিয়েছে।

বুধবার দিবাগত রাত থেকে বৃহস্পতিবার দুপুর পর্যন্ত যমুনা সেতুর পূর্বপ্রান্ত থেকে টাঙ্গাইল সদরের আশেকপুর বাইপাস পর্যন্ত প্রায় ২৫ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে থেমে থেমে তীব্র যানজট—এ যেন একটি চিরচেনা দৃশ্যের পুনরাবৃত্তি। মাত্র ৫ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করতে যেখানে দেড় ঘণ্টা লেগে যায়, সেখানে পুরো যাত্রাপথের হিসাব কষা যায় সহজেই। একজন যাত্রীর আশঙ্কা—সেতু পর্যন্ত পৌঁছাতে আরও চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা—কোনো অতিরঞ্জন নয়, বরং একটি নির্মম বাস্তবতা।

এই চিত্র কেবল যানজটের নয়, এটি মানুষের কষ্টের প্রতিচ্ছবি। ঘণ্টার পর ঘণ্টা গাড়িতে বসে থাকা, টয়লেট বা বিশ্রামের কোনো সুযোগ না থাকা, বিশেষ করে নারী ও শিশুদের জন্য চরম ভোগান্তি—এসবই আমাদের ঈদযাত্রার অঘোষিত বাস্তবতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রশ্ন হলো, এত বছর পরও কেন আমরা এই সমস্যার কার্যকর সমাধান করতে পারছি না?

প্রশাসনের ব্যাখ্যায় উঠে এসেছে পরিচিত কিছু কারণ—অতিরিক্ত যানবাহনের চাপ, টোল আদায়ে ধীরগতি, মাঝপথে গাড়ি বিকল হয়ে যাওয়া, নিয়ম ভেঙে পার্শ্ব সড়কে বড় যান চলাচল ইত্যাদি। এগুলো নিঃসন্দেহে বাস্তব কারণ। কিন্তু এই কারণগুলো কি নতুন? মোটেই না। বরং প্রতি বছরই একই সমস্যাগুলো পুনরাবৃত্তি হচ্ছে, যা প্রমাণ করে সমস্যার চেয়ে বড় সংকট হলো এর স্থায়ী সমাধানে ব্যর্থতা।

একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হলো—মাত্র ২৪ ঘণ্টায় ৫১ হাজারের বেশি যানবাহন যমুনা সেতু অতিক্রম করেছে। এই সংখ্যা দেশের সড়ক ব্যবস্থার উপর চাপের একটি স্পষ্ট চিত্র তুলে ধরে। কিন্তু এর সঙ্গে একটি মৌলিক প্রশ্ন জড়িত—এই চাপের পূর্বাভাস কি প্রশাসনের কাছে ছিল না? যদি থাকে, তবে কেন সেই অনুযায়ী প্রস্তুতি নেওয়া হয়নি?

সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রীর বক্তব্যে একটি আশাবাদী চিত্র তুলে ধরা হয়েছে—সরকারের প্রস্তুতি সফল, যাত্রীরা স্বস্তিতে আছে, কোনো বিশৃঙ্খলা বা অতিরিক্ত ভাড়ার অভিযোগ নেই। কিন্তু বাস্তব চিত্র তার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। যখন মানুষ ২৫ কিলোমিটার যানজটে আটকে থাকে, যখন কয়েক ঘণ্টা গাড়িতে বসে থেকে মৌলিক প্রয়োজন মেটাতে পারে না, তখন সেটিকে ‘স্বস্তিদায়ক’ যাত্রা বলা কতটা যুক্তিযুক্ত—এ প্রশ্ন উঠবেই।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ‘ধারণা বনাম বাস্তবতা’। নীতিনির্ধারকরা প্রায়শই সামগ্রিক চিত্রের উপর ভিত্তি করে সফলতার মূল্যায়ন করেন, কিন্তু মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা অনেক সময় ভিন্ন কথা বলে। এই ব্যবধান কমানোই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

মন্ত্রী যে বিষয়টি উল্লেখ করেছেন—গার্মেন্টস শ্রমিকদের হঠাৎ ছুটি এবং তাদের অনিয়ন্ত্রিত যাত্রা—এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা। পিকআপ বা ছোট যানবাহনে অতিরিক্ত যাত্রী বহন, যমুনা সেতুর কাছে এসে এসব যানবাহনের বিকল হয়ে যাওয়া—এসবই যানজটকে দ্রুত কয়েক কিলোমিটার থেকে কয়েক দশ কিলোমিটারে বিস্তৃত করে। অর্থাৎ, একটি ছোট সমস্যা খুব দ্রুত একটি বড় সংকটে রূপ নিচ্ছে।

এখানে পরিকল্পনার একটি বড় ঘাটতি স্পষ্ট। গার্মেন্টস খাত বাংলাদেশের অর্থনীতির একটি প্রধান চালিকাশক্তি। এই খাতের লাখ লাখ শ্রমিক ঈদের সময় একযোগে যাত্রা করবে—এটি কোনো অপ্রত্যাশিত ঘটনা নয়। তাহলে তাদের জন্য আলাদা পরিবহন ব্যবস্থা, ধাপে ধাপে ছুটি, বা বিশেষ ট্রেন-বাস সার্ভিস নিশ্চিত করা হলো না কেন?

ঈদযাত্রার ক্ষেত্রে আমাদের একটি বড় ভুল হলো ‘শেষ মুহূর্তের ব্যবস্থাপনা’। সমস্যাগুলো আমরা আগে থেকেই জানি, কিন্তু সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হয় সংকট তৈরি হওয়ার পর। ফলে প্রতিবারই একই চক্রে ঘুরপাক খেতে হয়।

যানজটমুক্ত ঈদযাত্রা নিশ্চিত করতে হলে প্রথমেই আমাদের সড়কনির্ভরতা কমাতে হবে। রেলপথ ও নৌপথের সম্ভাবনাকে কাজে লাগানো এখন সময়ের দাবি। যমুনা সেতুর উপর এত বিপুল চাপ কমাতে বিকল্প রুট ও পরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়ন অপরিহার্য।

একই সঙ্গে টোল ব্যবস্থাপনায় আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার জরুরি। স্বয়ংক্রিয় টোল সংগ্রহ (ETC) চালু করা গেলে যানবাহনের গতি অনেকাংশে বাড়ানো সম্ভব। কারণ টোল প্লাজায় সামান্য বিলম্বও কয়েক কিলোমিটার দীর্ঘ যানজটের সূচনা করতে পারে।

সড়কে বিকল যানবাহন দ্রুত সরিয়ে নেওয়ার জন্য বিশেষ টিম গঠন করা দরকার, যারা ২৪ ঘণ্টা প্রস্তুত থাকবে। কারণ একটি বাস বিকল হয়ে পড়লে তার প্রভাব কয়েক হাজার যাত্রীর উপর পড়ে। আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রেও কঠোরতা প্রয়োজন। পার্শ্ব সড়ক দিয়ে বড় যান চলাচল, অতিরিক্ত যাত্রী বহন, ফিটনেসবিহীন যানবাহন—এসবের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে কোনো পরিকল্পনাই সফল হবে না।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—সমন্বয়। সড়ক, রেল, নৌপথ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, স্থানীয় প্রশাসন—সবাইকে একটি সমন্বিত কাঠামোর মধ্যে কাজ করতে হবে। বিচ্ছিন্ন উদ্যোগ কখনোই একটি জাতীয় সমস্যার সমাধান দিতে পারে না।

ঈদযাত্রা একটি বার্ষিক ‘ইভেন্ট’ হলেও এর ব্যবস্থাপনা হওয়া উচিত সারা বছরের পরিকল্পনার অংশ হিসেবে। উন্নত দেশগুলো বড় উৎসব বা ছুটির সময় যেভাবে পরিবহন ব্যবস্থাপনা করে, সেখান থেকে আমাদের অনেক কিছু শেখার আছে। সেখানে পূর্বপরিকল্পনা, তথ্য বিশ্লেষণ, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং কঠোর বাস্তবায়নের সমন্বয় দেখা যায়।

পরিশেষে বলা যায়, ঢাকা-টাঙ্গাইল-যমুনা সেতু মহাসড়কের সাম্প্রতিক যানজট কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি একটি বৃহত্তর কাঠামোগত সমস্যার বহিঃপ্রকাশ। সরকারের প্রস্তুতি আংশিকভাবে সফল হতে পারে, কিন্তু যতক্ষণ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের ভোগান্তি কমছে না, ততক্ষণ সেই সফলতা প্রশ্নবিদ্ধ থাকবে।

ঈদের আনন্দ যেন যাত্রাপথেই হারিয়ে না যায়—এটি নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। কারণ যানজটমুক্ত ঈদযাত্রা কোনো বিলাসিতা নয়, এটি একটি মৌলিক অধিকার। আর এই অধিকার নিশ্চিত করার সত্যিই কোনো বিকল্প নেই।

লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।