তাপদাহে হাঁসফাঁস রংপুর, মাঠ-ঘাট ছেড়ে গাছতলায় মানুষ

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ২ জুন, ২০২৬, ৪:০৪ অপরাহ্ণ
তাপদাহে হাঁসফাঁস রংপুর, মাঠ-ঘাট ছেড়ে গাছতলায় মানুষ

ঈদের আনন্দের রেশ কাটতে না কাটতেই তীব্র তাপদাহে হাঁসফাঁস করছে রংপুর অঞ্চল। প্রখর রোদ, ভ্যাপসা গরম এবং ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাটে দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে জনজীবন। সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন খেটে খাওয়া মানুষ। জীবিকার তাগিদে রাস্তায় নামলেও প্রচণ্ড গরমে কাহিল হয়ে পড়ছেন তারা। মাঠ-ঘাট ছেড়ে অনেককে গাছের ছায়ায় আশ্রয় নিতে দেখা যাচ্ছে।

আজ মঙ্গলবার দুপুর ১২টায় রংপুরে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ৩৫ দশমিক ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস। একই সময়ে বিভাগের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল নীলফামারীর সৈয়দপুরে ৩৬ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস।

তীব্র গরমে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন শ্রমজীবী মানুষ। রিকশাচালক আয়নাল হক বলেছেন, ‘ঈদের পর দুই টাকা বেশি কামাই করমু, তারও উপায় নাই। পেটের দায়ে রিকশা ধরি বাইর হইলেও গরমে হামাক কাহিল করি ফেলাইচে। এত রইদোত কী রিকশা চলা যায়!’

রংপুর শহর ও আশপাশের এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, দুপুরের রোদে রাস্তাঘাট প্রায় ফাঁকা। শহরের বিভিন্ন স্থানে রিকশাচালকদের গাছের নিচে বসে বিশ্রাম নিতে দেখা গেছে। খোলা আকাশের নিচে কাজ করা কৃষি ও দিনমজুর শ্রেণির মানুষ সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন।

বোরো ধান কাটার মৌসুম চললেও প্রচণ্ড গরমে অনেক কৃষিশ্রমিক দুপুর হওয়ার আগেই কাজ গুটিয়ে নিচ্ছেন। নগরীর উত্তম বানিয়াপাড়া এলাকায় ধান মাড়াইয়ের কাজ করতে গিয়ে কিছুক্ষণ পরই গাছতলায় আশ্রয় নেন কয়েকজন শ্রমিক।

তাদের একজন ষাটোর্ধ্ব নয়া মিয়া আলীর সঙ্গে কথা হয়। বলেছেন, ‘এই রইদোত জমিত একদণ্ড থাকা যায় না। গরমোত গাও সিদ্ধ হয়া গেইচে বাহে। না খ্যায়া থাকলেও কাম করার শক্তি নাই।’

তাপদাহের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিদ্যুতের অনিয়মিত সরবরাহ। ফলে শহরজুড়ে বেড়েছে হাতপাখার চাহিদা। ফুটপাতে তালপাখা, বাঁশ, কাপড় ও সুতা দিয়ে তৈরি বিভিন্ন ধরনের হাতপাখা বিক্রি করছেন ব্যবসায়ীরা। কয়েক দিন আগেও ১০ টাকার পাখা বিক্রি হতো, এখন তা ২০ থেকে ২৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

কাচারিবাজার এলাকায় হাতপাখা কিনতে আসা লাইলি বেগম বলেছেন, ‘কদিন ধরে খুব গরম পড়ছে, বেশিরভাগ সময়ই বিদ্যুৎ থাকে না। হাতপাখা ছাড়া উপায় কী?’

রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, বর্তমান আবহাওয়া জনস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। অতিরিক্ত গরমে হিটস্ট্রোক, শ্বাসকষ্ট, চর্মরোগ ও ডায়রিয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়। বিশেষ করে শিশু ও বয়স্করা বেশি ঝুঁকিতে থাকেন। তারা বেশি করে পানি পান, হালকা খাবার গ্রহণ এবং প্রয়োজন ছাড়া রোদে বের না হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।

এদিকে তাপদাহের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে তালশাঁসের চাহিদা। গরমে স্বস্তি পেতে নগরীর সুরভী উদ্যান, কাচারিবাজার, ওরিয়েন্টাল সিনেমা হলের গলিসহ বিভিন্ন স্থানে ভিড় করছেন ক্রেতারা। সেখানে জমে উঠেছে তালের হাট।

খুচরা বিক্রেতা হামিদুল ইসলাম জানিয়েছেন, একটা তালে তিনটা বিচি থাকে, প্রতিটা ১০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এ বছর ব্যবসা খুব ভালো।

পাইকারি ব্যবসায়ীরা জানান, রংপুরে বাণিজ্যিকভাবে তালের চাষ না থাকায় বাগেরহাট থেকে ট্রাকযোগে তাল আনতে হয়। তীব্র গরমের কারণে এবার চাহিদা এতটাই বেড়েছে যে প্রতিদিন অন্তত পাঁচ ট্রাক তাল রংপুরে আসছে।

রংপুর আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, গত দুই দিন ধরে এ অঞ্চলে তাপমাত্রা ৩৬ থেকে ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে ওঠানামা করছে। আপাতত গরম থেকে স্বস্তির কোনো আভাস নেই। ফলে রোদ, ঘাম আর বিদ্যুৎ সংকটের মধ্যে দিন পার করছেন রংপুরের মানুষ। প্রকৃতির এই রুদ্ররূপে সবচেয়ে বেশি বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছেন শ্রমজীবী ও নিম্ন আয়ের মানুষ। মাঠ-ঘাট ছেড়ে তারা এখন ছায়াঘেরা গাছ-তলাতেই খুঁজছেন সামান্য স্বস্তি।