টাঙ্গাইলে বিলুপ্তির পথে পাহাড়ি অঞ্চলের বন আলু

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ২১ অক্টোবর, ২০২৫, ১০:১৪ পূর্বাহ্ণ
টাঙ্গাইলে বিলুপ্তির পথে পাহাড়ি অঞ্চলের বন আলু

টাঙ্গাইলের পাহাড়ি গড় অঞ্চলের শাল বনের লাল মাটিতে ছিল হরেক জাতের বন আলু, যা বনবাসীদের বিশাল খাদ্যের ভান্ডার হিসেবে পরিচিত। এ খাদ্যই ছিল এ জনপদের গারো ও কোচ সম্প্রদায়ের খাদ্যের অন্যতম উৎস এবং জীবন-জীবিকার অনন্য উপাদান।

স্বাদ ও পুষ্টিগুণে সমৃদ্ধ এ আলু তোলা যেমন আনন্দের, তেমনি স্থানীয়দের কাছে আদি সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের অংশ মনে করা হত।

তবে প্রাকৃতিক বন ধ্বংসের কারণে বিলীন হয়ে যাচ্ছে এ খাদ্য ভান্ডার। অবশিষ্ট যে বন টিকে আছে, তাতেও আগের মতো হরেক জাতের বন আলু পাওয়া যায় না।

জানা যায়, ইতিহাস ও ঐতিহ্য খ্যাত মধুপুর শালবন ছিল গভীর অরণ্যে ঘেরা। বনের চারপাশে বসবাস করত গারো ও কোচ আদিবাসীরা।

গারো সম্প্রদায়ের খামালরা (কবিরাজ) বনের নানা গাছ ও গাছরায় চিকিৎসা করত। স্থানীয় বসতিরাও ভেষজ চিকিৎসা নিত। অরণ্যচারী আদিবাসীরা বাহারি বুনো খাবার ভক্ষণ করত। বনের বিশাল খাদ্য ভান্ডারে তাদের বাড়তি অন্নের জোগান হতো। খারি, গপ্পার নানা উপকরণ আহরণ হতো বন থেকেই। পুষ্টিগুণে ভরা বন আলু তাদের খাদ্যের অন্যতম।

আদিবাসীরা তাদের ভাষায় বন আলুকে ‘থামান্দি’ বা ‘থাজং’ বলে। থামান্দি আচিক শব্দ, যার অর্থ বন আলু।

প্রাকৃতিক শালবনের মধুপুর, ঘাটাইল, সখিপুর, মির্জাপুর ও কালিহাতীর একাংশে এ আলু পাওয়া যেত। লালমাটির শালবনে প্রাকৃতিকভাবে এসব আলু জন্মায়। এ আলু ছাড়াও বনের অভ্যন্তরে বাহারি রকমের নাম জানা-অজানা অনেক ধরনের আলু পাওয়া যেত। অরণ্যচারী গারোরা বনের চারপাশে বসবাস করায় তারা এর সন্ধান পেত। এক সময় জুম চাষের কারণে এসব আলুর সন্ধান পাওয়া সহজ হয়ে যায়। ওই সময় ছনের ছোট ঘর বা মাচাং তুলে তারা থাকার জায়গা করত। ছাউনিতে বনের ছন ও বন থেকে পাওয়া বাঁশ বা ছোট গাছ দিয়ে সুন্দরভাবে ঘর তৈরি করত। খাবার সংকট হলে বন থেকে অল্প সময় আলু সংগ্রহ করলেই পরিবারের অন্নের জোগান হতো।

মধুপুরের গায়ড়া, পীরগাছা, ধরাটি, মমিনপুর, জলছত্র, গাছাবাড়ি, ভুটিয়া ও চুনিয়াসহ বিভিন্ন গারোপল্লীতে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এ অঞ্চলের গারোরা বন আলুকে তাদের গারো বা আচিক ভাষায় ‘থামান্দি’ বা ‘থাজং’ বলে। তাদের মতে, গারো সম্প্রদায়ের লোকেরা মধুপুর শালবনে প্রথম বন আলুর সন্ধান পান।

বন আলু সংগ্রহ পাহাড়ি অঞ্চলে বসবাসরত গারো ও কোচ সম্প্রদায়ের সংস্কৃতির একটি অংশ। মনের আনন্দে বা স্বাচ্ছন্দ্যে তারা এ আলু সংগ্রহ করত। এসব আলু সিদ্ধ করে খেত। সুস্বাদু ও পুষ্টিগুণে ভরপুর এ আলু তাদের খাদ্য তালিকার গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল। ওয়ানগালা উৎসবে সালজং দেবতা বা শস্য দেবতাকে উৎসর্গ করত বন আলু। অতিথি বা আত্মীয়-স্বজন আপ্যায়নের জন্যও বন আলু প্রধান উপকরণ হিসেবে ব্যবহৃত হতো। এখনো বনে বিভিন্ন জাতের বন আলু সামান্য পাওয়া যায়।

বন এলাকার আদিবাসী গারোদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এক সময় মধুপুরের বন থেকে গাতি আলু, গারো আলু, পান আলু, গইজা আলু, দুধ আলু, শিমুল আলু, কাসাবা, ধানমোচা আলুসহ বিভিন্ন ধরনের বন আলু পাওয়া যেত। এসব আলু তাদের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও প্রিয় খাবারের তালিকায় অন্যতম।

অর্চনা নকরেক (৫০) নামে এক গারো নারী জানান, অতীতে অনেকেই এসব আলু বন থেকে সংগ্রহ করে স্থানীয়ভাবে বিক্রি করত। বন আলু দূরের আত্মীয়-স্বজনদের বাড়িতেও পাঠানো হতো। বন আলুর বংশবিস্তারের জন্য আলু সংগ্রহের পর গাছগুলো আবার মাটিতে পুঁতে দিতেন। গাছ বেড়ে উঠত। শাল-গজাসহ বিভিন্ন প্রজাতির গাছের সঙ্গে লতার মতো জড়িয়ে থাকত। ফাল্গুন-চৈত্র মাসে সবচেয়ে বেশি সংগ্রহ হতো। রোদে শুকিয়ে ঘরে রাখা হতো। প্রাকৃতিক বন কমে যাওয়ায় এখন আগের মতো আলু পাওয়া যায় না।

বৃহত্তর ময়মনসিংহ ডেভেলপমেন্ট কালচারাল ফোরামের সভাপতি অজয় এ মৃ বলেন, প্রাকৃতিক বন উজাড়ের ফলে বন আলু কমে গেছে। সামাজিক বনায়ন ও অন্যান্য প্রকল্পের কারণে বন ও ঝোপঝাড় উজাড় হওয়ায় বন আলু ও জীববৈচিত্র্য কমে যাচ্ছে। আদিবাসীদের বাইরে যারা আলু তোলে, তারা গাছ লাগায় না। ফলে বন আলু কমছে।

তিনি বলেন, সামাজিক বনায়ন বন্ধ করে প্রাকৃতিক বন বৃদ্ধি করতে হবে এবং আলু তোলার পর পুনরায় গাছ লাগিয়ে জনসচেতনতা বাড়াতে হবে।